কামধেনু সংস্কৃতভাষার দৌলতে বাক্ ও অর্থের মধ্যে কোন নিত্য সম্পর্ক নাই; কুলীন ব্রাহ্মণের বহুপত্নীর ন্যায় এক কথার বহু অর্থ। সুবিধামত যে কোন একটার সহিত কথাটা যোজনা করিয়া দেওয়া চলে। তবে উভয়ত্রই অর্থসঙ্গতির অভাব ঘটিলেও তর্ক কচ্কচির অভাব হয় না।
সেবা অর্থে পরের সেবাও বুঝায়, নিজের সেবাও বুঝাইতে পারে । ঠাকুরের সেবা অর্থে ঠাকুর ও পুরোহিতের উভয়ের সেবাই বুঝায়; অর্থাৎ খাওয়া ও খাওয়ান দুই বুঝাইতে পারে এবং কার্য্যতঃ দুইই বুঝাইয়া থাকে।
প্রসন্নর বাড়ী দুর্গা প্রতিমা হইতে আরম্ভ করিয়া পর পর সব ঠাকুরই লোকে ফেলিয়া দিয়া গিয়াছিল তাহা সকলেই জানেন। নিঃসন্তান প্রসন্ন কার্ত্তিকেয়ের সেবা করিয়া ধন্য হইবে, এইজন্য পাড়ার লোকের ঘুম হয় নাই; তাই তাহারা বৎসরের শেষ ঠাকুরখানিও ফেলিতে ভুলে নাই। প্রসন্ন করিবে সুব্রহ্মণ্যের সেবা, আর গ্রামের আচণ্ডাল ব্রাহ্মণ পর্য্যন্ত সকলে সেবা লইবেন, ইহাই যে সেবার নিগূঢ় আধ্যাত্মিক তত্ত্ব, তাহা কাহারও অবিদিত ছিল না। যাহা হউক বলিহারি বোকা গয়লার মেয়েকে! সে সেই সব—প্রথম ঠাকুর ফেলার বেলা একটু যা শিহরিয়া উঠিয়াছিল, তারপর বারবার এ উৎপাতে সে একেবারেই বিচলিত হয় নাই। ফেলা-ঠাকুরের পূজা যেন তাহার কৌলিক প্রথাই হইয়া গিয়াছিল, এবং প্রত্যেক পূজাটাই সে খুব সমারোহের সহিত করিয়াছিল; গ্রামসুদ্ধ লোককে ভূরিভোজনে পরিতুষ্ট করিয়াছিল। হঠাৎ তাহার কষ্টার্জিত পয়সার প্রতি সে কি জন্য এত নির্ম্মম হইয়া উঠিল তাহা বুঝা গেল না; তবে ইহা বেশ বুঝা গেল সে যে ঠিক কত পয়সার মালিক চোরেও তা’র সন্ধান পায় নাই, নতুবা এই ঘোরান উপায়ে তাহার সৎকার করাইতে হইত না।
কিন্তু এত করিয়াও পাড়ার লোকে প্রসন্নকে নিশ্চিন্ত হইতে দিল না। যে সকল ষণ্ডামার্ক যুবকের দল তাহার প্রতিমা পূজার সহায়তা করিয়াছিল—মেরাপ বাঁধিয়া, তালপাতার ঘর করিয়া দিয়া, রন্ধন পরিবেশন ইত্যাদি ভূতের মত, রাত নাই দিন নাই, খাটিয়া ঠাকুর-সেবার সহায়তা করিয়াছিল—তাহারা এখনও প্রসন্নকে ছাড়ে না— বলে, তাহাদের একদিন ভাল করিয়া না সেবা লইলে তাহার সর পূজা পণ্ড, পাঠ পণ্ড, লোক-সেবা পণ্ড; যেহেতু তাহারা না থাকিলে তাহার এত করিত কে?
মোল্লার দৌড় মসজিদ অবধি, অর্থাৎ স্বর্গদ্বার পর্য্যন্ত নয়। অতএব আমি আফিংএর মৌতাতেই থাকি আর সজ্ঞানেই থাকি, আর আমার দ্বারা তাহার পরিত্রাণ সম্ভব হউক আর না হউক, প্রসন্নর মাথা আটকাইলেই আমার কাছে ছুটিয়া আসিবেই আসিবে। তাই দুধ দিবার সময় ব্যতীত অন্য সময়ে তাহাকে আসিতে দেখিলেই আমি বুঝিতাম—প্রসন্নর মাথা আটকাইয়াছে।
ঠিক–দুপুর বেলা প্রসন্ন এক পাল পাড়ার ছেলে লইয়া আমার উঠানে আসিয়া উপস্থিত।— ব্যাপার কি?
প্রসন্ন। আর ব্যাপার কি—আমাকে ত ছিঁড়ে খেলে। দেখ যদি উপায় করতে পার।
প্রসন্ন এই বলিয়া আমার দাওয়ার উপর বসিয়া পড়িল।
১ম যুবা। ব্যাপার আর কি ঠাকুর মহাশয়! মাসী গ্রামসুদ্ধ লোকের সেবা নিল, আর আমাদের সেবা নিতেই যত আপত্তি!
আমি। কেন বাপ-সকল তোমরা কি সেবা নাও নি? তোমরা কি না-খেয়ে প্রসন্নকে অব্যাহতি দিয়েছ?
২য় যুবা। আমরা যা করেছি তা’র কি মূল্য আছে? উঠান চাঁচা থেকে আরম্ভ করে’ ঠাকুর ঘাড়ে করে’ বিসর্জ্জন দেওয়া পর্য্যন্ত, আমরা কি না করেছি? আর তা একবার নয়! গ্রামসুদ্ধ লোকজনের পরিচর্য্যা করা কি মুখের কথা? রাতকে রাত দিনকে দিন জ্ঞান না করে’ আমরা যে বুক দিয়ে এত করলুম তার কি পুরস্কার নেই?
আমি। উঠান চাঁচা থেকে কেন বাপধন, উঠান চষা থেকেই বল না? নাটের গুরু ত তোমরাই। ঠাকুরগুলো পর পর তোমরাই ত ফেলেছিলে?
৩য় যুবা। বলুন দেখি—এই উপায়ে গ্রামসুদ্ধ লোকের মধ্যে কি রকম সাড়া পড়ে’ গেছে! গয়লার বাড়ী গ্রামসুদ্ধ লোকের সমাবেশ এ কি অন্য উপায়ে সম্ভব হ’ত? এ ডেমোক্রেটিক যুগ। আমরা এই নীচের দিক থেকে thin end of the wedge মিষ্টান্নের সঙ্গে প্রবিষ্ট করে' দিলুম। দেখুন এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। আমরা ভিতর থেকে সমাজের পরিবর্ত্তন চাই। বাইরের আমদানী করা Reform আর পরগাছা দুই সমান।
আমি। ডেমোক্রেটিক যুগ না বলে’ মিষ্টান্নের যুগ বল্লে, বোধ হয় আরও ঠিক হ’ত। যেহেতু গ্রামের লোক ডেমোক্রেসী খেতে আসে সি, মিষ্টান্ন খেতেই এসেছিল।
৩য়। আপনি বিষয়টাকে একেবারেই বুঝতে পারচেন না। যার জন্যেই আসুক, এসেছিল তো? আর দেখুন, আমাদের গ্রামের যুবকদলের কি শিক্ষাই না এ হ’তে হয়েছে। প্রথম, গ্রামের কা’কে ক’টি ছাঁদা দিতে হবে, কা’কে কি উপায়ে পরিতুষ্ট করতে হবে, কে ক’টা রসগোল্লা খেতে পারে, কে ক’দিন্তা লুচি খেতে পারে—এ সকল হাঁড়ির খবর পাবার অবসর কি ছাড়া যায়? তারপর, কার্য্যপটুতা লাভের এমন অবসর কোথায়? কা’র পর কি দিতে হয়, কতখানি দিতে হয়, সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙ্গে, কৃতিও অপদস্থ না হয় আবার ভোক্তারাও না বুভুক্ষিত র’য়ে যায়—এ সকল বিষয়ে পটুতা লাভের অন্য উপায় কোথায়?
আমি। বাপু! যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী। গ্রামসুদ্ধ লোক মিষ্টান্ন খেতে এসেছিল। মিষ্টান্ন খেয়ে ঘরে গেছে। তোমাদের পরিবেশনের গুণে হয়ত কেউ কম বা কেউ বেশী পায় নি; কিন্তু তা থেকে মিষ্টান্ন-ভোজন-রূপ উদ্দেশ্য সিদ্ধি ছাড়া যে আর কোনরূপ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে তা আমি মনে করি না।
১ম যুবা। যাই হ’ক। প্রসন্ন মাসি যখন এত করলে, আর আমাদের সেবা নিতেই তা’র যত কষ্ট! এ বড় অন্যায়।
২য় যুবা। আমরা এত পরিশ্রম করলুম তা’র বুঝি দাম নেই?
৩য় যুবা। না-না, আমরা দাম হিসাবে কিছুই চাইছি না! আমরা যে লোকশিক্ষা আর দেশ (আমাদের গ্রামটাই দেশ) সেবার এই ব্যবস্থা করলুম, সেটা কি প্রকাশ্য ভাবে,—পৃথক করে’— পরিস্ফুট করে' স্বীকার করা উচিত নয়?
প্রসন্ন নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়াছিল। আমি বলিলাম-সেবাকার্য্যের সবটাই তোমরা করেছ—এই তো তোমাদের কথা? কিন্তু মনে কর, প্রসন্ন যদি প্রথম খড়-জড়ান মূর্ত্তিটা উনানের ভিতর দিত, তা হ’লে তোমাদের দেশসেবার অবসর কোথা থাকত বাপু? প্রসন্ন যদি তা’র মুখে-রক্ত-ওঠা পয়সা একটিও না ছাড়ত, তা হ’লে শুধু উঠান চেঁচে, সেই উঠানে উপবিষ্ট অতিথির মুখে সবুজ ঘাস আর মাটির ডেলা ভিন্ন কি দিতে বাপু? গয়লার মেয়ের কি সুবুদ্ধিটা তোমরা দিয়েছিলে? তা’র মাথার–ঘাম-পায়ে-ফেলে একটি একটি করে’ রোজকার করা টাকা যদি জলের মত সে ঢেলে না দিত, তবে তোমরা সুধুহাতে অষ্টরম্ভা ছাড়া আর কি কা’কে খাওয়াতে বাপু? আর দেশের লোকের সঙ্গে কি পরিচয়ই হ’ত বাপু হে? অতএব পরিস্ফুট করে’ যদি কিছু স্বীকার করতে হয়, তবে আগে স্বীকার কর — প্রসন্নর হৃদয়, প্রসন্নর অর্থদান, প্রসন্নর ত্যাগ। তারপর পরিবেশন ও পরিচর্য্যার কথা তুলো। সেটা ভাড়াটে রাঁধুনি বামুনের দ্বারাও হ’ত। একজন কেবল পাকা ভাণ্ডারীর ওয়াস্তা বৈ তো নয়? আর হাঁড়ির খবর নিতে যদি সত্য সত্যই ব্যগ্র হ’য়ে থাক, তা হ’লে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত্তে ত সে কাজ করতে পার । তা’র জন্য ত বাবা, এত উঠান চাঁচার দরকার নেই— অত জল বেড়াবেড়ি করবার দরকার নেই।
৩য় যুবা। আপনি বলেন কি? ভাড়াটে লোক দিয়ে দেশসেবা? Horror of horrors!
আমি। কেন বাপধন, এ কি খেলা না মজলিস, যে প্রফেসনালের গায়ে গা ঠেকলে অ্যামেচারের মহাভারত অশুদ্ধ হ’য়ে যাবে? না, খাঁ সাহেব পেশাদার গাইয়ে বলে' নিধুবাবুর আর সে আসরে হাঁ করতে নেই? যদি দেশসেবাই সত্যিকারের অভিপ্রায় হয় ত তা’র ভেতর আবার এ নুতন জাতবিচার, আর এ নূতন ছুঁৎমার্গ কেন?
৩য় যুবা। থেলা বা আমোদ নয় বলেই আমরা ভাড়াটে লোকের নামে খড়্গহস্ত হচ্চি। এ দেশসেবা — দেশের কাজ। যদি মজুরিই নিলুম ত কি হ’ল?
আমি । কাজটা ক্ষুদ্র ও সাময়িক বলেই হয়ত সামলাতে পেরেচ। মনে কর, দেশ বলতে তোমার গ্রামখানি না হ'য়ে যদি সত্যি সত্যিই সমগ্র দেশটাই হত, তাহ'লে কি যাদের ভাড়াটে বলে’ নাক শিটকে উঠছ, তাদের সাহায্য না নিয়ে চলত? ইউরোপের এই যে এত বড় যুদ্ধটা হ’য়ে গেল, অবৈতনিক (ভলাণ্টিয়ার) যোদ্ধা নিয়ে যদি লড়তে হ’ত, তাহ’লে যুদ্ধ ফতে না হ’য়ে, দেশটাই ফতে হ’ত না কি? আর সৈনিকেরা বেতন নিয়ে যুদ্ধ করেছে বলে’ কি তাদের জান দিতে যাওয়াটা দেশহিতৈষণাই নয়? না, সে দেশহিতৈষণা তোমার দেশহিতৈষণার চেয়ে মর্য্যাদার কম বলতে হবে?
ছেলেগুলা মুখ বাঁকাইয়া চলিয়া গেল। আমার কানে যেন আসিল—বুড়া সেকেলে ফসিল (fossil), এ যুগের ধর্ম্ম কি বুঝবে?
প্রসন্ন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল—কে জানে, আমার ভয় করছে। ছেলেগুলো আমার ঘরে আগুন দেবে না ত! এত খরচ হ'ল—না-হয় ও-কটাকে একটা ভোজ দিলেই হ'ত।
Comments
Loading comments…