চন্দ্রাবতীর রামায়ণ
পূর্ব্ববঙ্গ গীতিকা
সাগরের পারে আছে গো কনক ভুবন।তাহাতে রাজত্বি করে গো লঙ্কার রাবণ॥২
বিশ্বকর্ম্মা নির্ম্মাইল গো রাবণের পুরী।বিচিত্র বর্ণনা তাহার গো কহিতে না পারি॥৪যোজন বিস্তার পুরী গো দেখিতে সুন্দর।বড় বড় ঘরগুলি গো পাহাড় পর্ববত॥৬
সাগরের তীরে লঙ্কা গো করে টলমল।হীরামণ মাণিক্যতে গো করে ঝলমল॥৮বড় বড় পুষ্কু’ণী গো বান্ধ্যা চারিধার।সোণায় রূপায় বান্ধ্যাইল ঘাট অতি চমৎকার॥১০
স্বর্গপুরে আছে যথা ইন্দ্রের নন্দন।সেইমতে লঙ্কাপুরে গো অশোকের বন॥১২দিন রাইতে ফুটে ফুল গো অশোকের বনে।লঙ্কায় ফুটিলে গন্ধ গো ছুটে তির্ভুবনে॥১৪
এক দিনে ফুটি ফুল গো বচ্ছরে না বাসি।তা দিয়ে সাজান করে গো যতেক রাক্ষসী॥১৬বারমাস ফলে বৃক্ষে গো অমৃত রসাল।পাক্না ফলের ভরে গো ভাইঙ্গা পড়ে ডাল॥১৮
রাতিতে প্রদীপ জ্বালে গো না নিভে দিবসেনিশিদিন কাটে সবে গো গীত-বাদ্য-রসে॥২০পক্ষী যদি উড়ে যায় গো যায় দুই সারে।চন্দ্র সূর্য্য গো দূর হইতে নমস্কার করে॥২২বড় বড় ঘরগুলি গো পাহাড় পর্ব্বত।তাহাতে বসতি করে গো রাক্ষসেরা যত॥২৪সোণায় ছাইয়া ঘর গো রূপায় দিছে বেড়া।জমিনে থাকিয়া ঠেকে গো আসমানেতে চূড়া॥২৬
রাবণের কেলিগৃহ গো তাহার মাঝখানে।চান্দেরে বেড়িয়া যেন গো শোভে তারাগণে॥২৮হাজার-দুয়ারী ঘর গো আবে ঝিলিমিলি।সোণার কপাট মধ্যে গো রূপার দিছে খিলি॥৩০হীরামণ মাণিক্য দিয়া গো করেছে সাজন।এমন সুন্দর ঘর গো নাহি তির্ভুবন।৩২
রূপেতে রূপসী যত গো রাক্ষস-কামিনী।পারিজাত ফুলে তারা গো বিনাইয়া বান্ধে বেণী॥৩৪মণি-মাণিক্যেতে কেউ গো চাঁচর কেশ বান্ধে।বায়ু মুরভিত হয় গো শ্রীঅঙ্গের গন্ধে॥৩৬হীরামণ-মাণিক্য গো অঙ্গে পায় লাজ।দণ্ডে দণ্ডে ধরে তারা গো নব রঙ্গের সাজ॥৩৮সোণার পালঙ্কে তারা গো শুইয়া নিদ্রা যায়।দেবের অমৃত তারা গো সুখে বৈস্যা খায়॥৪০
বিচিত্র সুবর্ণ লঙ্কা গো নির্ম্মাইল বিশাই।এমন বিচিত্র পুরী গো তির্ভুবনে নাই॥৪২বড়ই দুরন্ত রাজা গো দেবে নাই ডরে।অমর হইয়াছে দুষ্ট গো বিরিঞ্চির বরে॥৪৪ইন্দ্র আদি দেবতাগণ গো রাবণে করে ডর।কেবল তাহার বৈরী গো নর আর বান্দর॥৪৬ধামায় মাপিয়া তারা গো ভুলে রত্নধন।এমন বৈভব কারো গো নাই তির্ভুবন॥৪৮বিত্ত-বৈভব তার গো বর্ণনা না যায়।হীরামণ-মাণিক্য তারা গো তলইয়ে শুকায়॥৫০একদিন রাবণ রাজা গো পাত্র মিত্র লইয়া।যুক্তি করে দশানন গো লঙ্কাতে বসিয়া॥৫২
স্বর্গ জিনিতে রাজা গো করিলেক মন।লইয়া রাক্ষস-সৈন্য গো করিল গমন॥২বড়ই দুরন্ত সেই গো রাক্ষসের সেনা।স্বর্গের দুয়ারে যাইয়া গো দিল সবে হানা॥৪
দেবরাজে বার্ত্তা গিয়া গো জানাইল চরে।আইল রাবণ রাজা গো স্বর্গ জিনিবারে॥৬ইন্দ্রাদি দেবতা সবে গো চিন্তিত হইল।রাইক্ষসের রোলে স্বর্গ গো কাঁপিয়া উঠিল॥৮
একে ত রাবণ রাজা গো সাক্ষাৎ শমন।যার সম বীর নাহি গো এহি তির্ভুবন॥১০কাটিলে না কাটে মুণ্ডু গো আগুনে না পুড়ে।এমনি হইয়াছে দুষ্টু গো বিরিঞ্চির বরে॥১২স্বৰ্গ ছাইড়া পলাইল গো যত দেবগণ।ইন্দ্র যমে লইল রাজা গো করিয়া বন্ধন॥১৪পারিজাত বৃক্ষ ছিল গো ইন্দ্রের নন্দনে।ডালে মূলে উপাড়িয়া গো লইলা রাবণে॥১৬ঐরাবত হস্তী লইলা গো উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়া।কাইড়া লইয়া পুষ্পক রথ গো শূন্যে দিল উড়া॥১৮মণিমুক্তা লইলা কত গো না যায় গণন।ঝাইড়া মুইছ্যা লইলা রাজা গো ভাণ্ডারের ধন॥২০দেবকন্যাগণে লইল গো রাজা রথেতে তুলিয়া।হরষিতে চলে রাজা গো জয়লক্ষ্মী লইয়া॥২২ইন্দ্রাদি দেবতাগণে বন্দী করি গো লয়।স্বর্গপুরী শ্মশান হইল গো চন্দ্রাবতী কয়॥২৪
পরে ত চলিল রাজা মরত ভুবন।মর্ত্ত্যেতে আছিল শুন গো যত রাজাগণ॥২বিনাযুদ্ধে সকলে গো মাগিল পরিহার।পাতালপুরে চলে রাজা গো করি মার্ মার্॥৪
পাতালে বাসুকী আদি গো যত নাগগণ।বিনাযুদ্ধে আসি সবে গো লইলা শরণ॥৬পরে ত চলিল রাজা গো গহন কাননে।যথায় তপস্যা করে গো যত মুনিগণে॥৮রাজকর চায় রাজা গো ঘূর্ণিত লোচন।জটাচুলে ধরিয়া সবে গো করে বিরম্মন॥১০কপীন সম্বল তারা গো ফল মুলাহারী।রাবণের পায়ে পড়িয়া গো যায় গড়াগড়ি॥১২দয়ামায়া নাহি গো দুষ্ট রাবণের মনে।নানামতে বিরম্মনা গো করে মুনিগণে॥১৪
কুশাগ্রে চিরিয়া বুক গো রক্ত সবে দিল।মুনির রক্ত কর লইয়া গো কৌটায় ভরিল॥১৬লঙ্কায় চলিল রাজা গো হরষিত মন।মন্দোদরী রাণীর আগে গো দিল দরশন॥১৮রক্ত-কটরা খুলি গো রাণীর হাতে দিল।চিন্তিত হইয়া রাণী গো রাবণে পুছিল॥২০
“কিবা ধন আনিয়াছ গো কটরায় ভরিয়া।”রাণীরে কহিলা রাজা গো সান্ত্বনা করিয়া॥২২
“সতত আমার বৈরী গো যত দেবগণ।অমর হইয়াছে সবে গো অমৃত কারণ॥২৪ইন্দ্র যমে আনিয়াছি গো লঙ্কায় বান্ধিয়া।সবারে মারিব গো এই বিষ খাওয়াইয়া॥২৬যত্ন করি এই কৌটা গো তুল্যা রাখ ঘরে।”এত বলি রাবণ রাজা গো চলিলা বাহিরে॥২৮
রাজ্য করে রাবণ রাজা গো পাত্র মিত্র লইয়া।সীতার জনম-কথা গো শুন মন দিয়া॥২চন্দ্র হইতে জ্যোতি রাজা গো করিয়া হরণ।মটুকে রাখিল করি রাজা গো শীর্ষের আভরণ॥৪সূর্য্য হইতে কাড়ি লইল গো সহস্র কিরণ।কুড়ি চক্ষে ভরি রাখে গো জ্বলন্ত অনল॥৬দেবতা তেত্রিশ কোটি গো আইল লঙ্কাপুরে।করযোড়ে দণ্ডাইল গো রাবণের ডরে॥৮কেহ ঝাড়ুদার কেহ গো বাগানের মালী।দেবের উপরে রাক্ষস গো করে ঠাকুরালী॥১০কুবের হইল আসি গো রাজার ভাণ্ডারী।একাদশ রুদ্র হইল গো শিয়রের পরী॥১২দ্বাদশ আদিত্য হইল গো শিরে ছত্রধর।দেবতা হইয়া পবন গো ঢুলায় চামর॥১৪বরুণ আসিয়া রাজার গো চরণ পাখালে।লঙ্কাপুরে পারা দেয় গো শমন কোটালে॥১৬অশ্বশালে থাকি ইন্দ্র গো কাটে ঘোড়ার ঘাস।চন্দ্র সূর্য্য আলো দেয় গো বার তিথি মাস॥১৮
গন্ধর্ব্বপুরেতে যত গো গন্ধর্ব্ব-কুমারী।বলেতে আনিয়া রাজা গো আনে নিজ পুরী॥২০সাত শত দেবকন্যা গো রাজা রথেতে তুলিয়া।শূন্যরথে করি আনে গো লঙ্কায় হরিয়া॥২২
বলে ছলে পড়ি কেহ গো পাপিষ্ঠে ভজিল।ঝাঁপাইয়া সাগরজলে গো কেউ বা মরিল॥২৪
অশোক কাননে রাজা গো হরষিত মতি।দেবকন্যা সঙ্গে কেলি গো করে দিবারাতি॥২৬হীরা মণি মুক্তা আদি গো যত আভরণে।আপনি মদন রতি সাজায় রাবণে॥২৮
চেড়ী গিয়া বার্ত্তা কয় গো মন্দোদরী আগে।“এতকাল রাণী তুমি গো আছিল সোহাগে॥৩০দেবকন্যা সহিত রাজা গো অশোক কাননে।কেলি করে নিরন্তর গো হরষিত মনে॥”৩২
এহি কথা শুনিলেন গো মন্দোদরী রাণী।অভিমানে দরদরি গো চক্ষে বহে পানি॥৩৪বহুবল্লভ মন্দোদরী গো জানিয়া রাবণে।কটরায় আছিল বিষ গো পড়িলেক মনে॥৩৬“যে বিষ খাইয়া মরে গো দেবতা অমর।আমি কেন নাহি খাই গো সেই কাল জর॥”৩৮
এতেক ভাবিয়া রাণী গো কি কাম করিল।কৌটায় আছিল বিষ গো মুখে তুলি দিল॥২দৈবের নিবন্ধ কভু গো না যায় খণ্ডানি।বিষ খাইয়া গর্ভবতী গো হইলেন রাণী॥৪
একমাস দুইমাস গো তিনমাস গেল।দশমাস দশদিনে গো পূর্ণিত হইল॥৬
বিষেতে অবশ অঙ্গ গো বদন হইল কালা।ভূমিতে শুইল রাণী গো কাল বিষের জ্বালা॥৮দিন যায় রাত্রি আসে গো শনির বারবেলা।এমন কালে রাণী এক গো ডিম্ব প্রসবিলা॥১০চরে গিয়া বার্ত্তা তবে গো জানায় রাবণে।ডিম্ব প্রসবিলাইন রাণী গো অতি অল্পক্ষণে॥১২এহি কথা রাবণ রাজা গো যখনি শুনিল।গণক আনিতে রাজা গো চর পাঠাইল॥১৪
পাঞ্জি পুঁথি লইয়া গণক গো আইল রাজার পুরে।খড়ি পাতি গণক তবে গো লাগে গণিবারে॥১৬
“অবধান কর আজি গো রাক্ষসের নাথ।সুবর্ণ লঙ্কার শিরে গো হইল বজ্রাঘাত॥১৮এই ডিম্বে কন্যা এক গো লভিল জনম।তা’ হইতে রাক্ষস-বংশ গো হইবে নিধন॥২০আর এক কথা শুন গো রাক্ষসের পতি।কন্যার লাগিয়া বংশে গো না জ্বলিবে বাতি॥২২দৈবের নির্ব্বন্ধ কভু খণ্ডান না যায়।আপনি মরিবে রাজা গো এই কন্যার দায়॥২৪রাক্ষসের রক্ষা নাই গো গণিলাম সার।সুবর্ণের লঙ্কাপুরী হৈল ছারখার॥”২৬
এহি কথা রাবণ রাজা গো শুনিল যখন।কুড়ি চক্ষে অগ্নি ছুটে গো জ্বলন্ত নয়ন॥২৮কেহ বলে ‘কাট ডিম্ব’ গো কেহ বলে ‘ভাঙ্গ।’‘অনলে পুড়াইয়া’ কেউ গো বলে ‘কর সাঙ্গ॥’৩০
এই কথা অন্তঃপুরে গো শুনিলেন রাণী।অন্তরে জ্বলিল যেন গো জ্বলন্ত আগুনী॥৩২
কান্দিল মায়ের পরাণ গো এহি কথা শুনি।দরদর করি রাণীর চক্ষে বহে পানি॥৩৪বনের পশুপক্ষী যারা গো সন্তানে রাখে বুকে।তারাও ঝুরিয়া মরে গো পুত্র-কন্যার শোকে॥৩৬কান্দিয়া রাবণে রাণী গো জানাইল বারতা।“নষ্ট করিও না ডিম্ব গো রাখ মোর কথা॥৩৮না ভাইঙ্গ না পুইর ডিম্ব গো আমার মাথা খাও।যদি নাই রাখ ডিম্ব গো সায়রে ভাসাও॥”৪০
রাণীর কথায় রাবণ গো কি কাম করিল।পঞ্চজন কারিগর গো ডাকিয়া আনিল॥৪২বানাইল কৌটা এক গো সন্ধান করিয়া।তাহাতে ভরিল ডিম্ব গো যতন করিয়া॥৪৪সোণার কটরা মধ্যে গো রূপার খিল দিয়া।সায়রে ভাসাইলা ডিম্ব গো ভবানী স্মরিয়া॥৪৬ঘনাইয়া আইল সন্ধ্যা গো রবি বসে পাটে।এমন সময় লাগ্ল ডিম্ব গো জনক ঋষির ঘাটে॥৪৮
মিথিলা নগরে ছিল গো মাধব জালিয়া।জাল বায় মাছ ধরে গো ঘাটে দেয় খেয়া॥২নগরের মাঝে মাধব গো সবার দীনহীন।হাটের চাউল ঘাটের পানি গো দুঃখে যায় দিন॥৪
পিন্ধনে কাপড় নাই গো পেটে নাই ভাত।রাত্রদিন ভাবে সতা গো শিরে দিয়া হাত॥৬
এক সুখ কপালে তার গো লিখিলা বিধাতা।আছিলা ঘরের নারী গো সতী পতিব্রতা॥৮সতা নামে নাম তার গো জনম-দুঃখিনী।স্বামীর সুখেতে সুখী গো দুঃখেতে দুঃখিনী॥১০জাল বাইয়া আইসে মাধব গো কাদা ভরা পায়।ধুয়াইয়া মুছাইয়া সতা গো ঘরে লইয়া যায়॥১২দারুণ গরমে মাধব গো ছটফট করে।তালের পাখা লইয়া সতা গো অঙ্গে বাতাস করে॥১৪মাঘ মাসেতে দুঃখ গো শীতের রজনী।আপন অঞ্চলে পাতে গো স্বামীর বিছানী॥১৬ক্ষুদকণা য’হা থাকে গো খাওয়ায় স্বামীরে।পাতের প্রসাদ সতা গো খায় ভক্তিভরে॥১৮
পাতালতার ঘরখানি গো ভাঙ্গা বেড়া তায়।স্বামী বুকে লইয়া সতা গো সুখে নিদ্রা যায়॥২০এমন যে দুঃখ তবু গো কপালের না দোষে।স্বামী লইয়া থাকে সতা গো মনের সন্তোষে॥২২উবাসে কাবাসে দিন গো গত হইয়া যায়।দারুণ বিধাতা গো মুখ তুলিয়া না চায়॥২৪ছেঁড়া পাটের শাড়ী গো কোমরেতে বেড়ি’।মাছের ঝাঁপি মাথায় সতা গো ফিরে বাড়ী বাড়ী॥২৬মলিন বয়ান গো সতার ঘামে ভিজে কেশ।হাসিমুখে কহে কথা গো নাহি ভাবে ক্লেশ॥২৮
একদিন মাধব গো কোমরে বান্ধি ডোলা।জাল বাইতে যায় গো মাধব তিন-সন্ধ্যাবেলা॥৩০
বাইতে বাইতে গো জাল রজনী আইল।মাছ নাহি পায় গো মাধব চিন্তিত হইল॥৩২দৈবের নির্ব্বন্ধ কথা গো শুন মন দিয়া।আরবার গো জাল ফেলে মনসা স্মরিয়া॥৩৪তাড়াতাড়ি করি মাধব গো টানে জালের দড়ি।জালেতে ঠেকিয়া উঠে গো সোণার কটরি॥৩৬চন্দ্রাবতী কহে “মাধব গো ঘরে ফিইরা যাও।পোহাইল দুঃখের নিশি গো সুখে বৈস্যা খাও॥”৩৮
বাড়ীতে আসিয়া মাধব গো তিন ডাক দিল।শীঘ্রগতি হইয়া সতা গো ঘরের বাহির হৈল॥৪০আজি বুঝি গো দোনা মাছ পাইলেন পতি।শীঘ্র ক’রে জ্বালে সতা গো আন্ধাইর ঘরে বাতি॥৪২
মাধব কহে বিধি কিবা গো লিখিল কপালে।কাণা কড়ির মৎস্য আজগো না পড়িল জালে॥৪৪কাণে কাণে কয় গো মাধব শুনে বা না শুনে।কি জানি পাড়ার লোক গো গোপন কথা জানে॥৪৬আস্তে ব্যস্তে কৌটা মাধব গো দিল সতার হাতে।সুবর্ণ কটরা সতা গো তুইল্যা লইল মাথে॥৪৮কাঠালের পিড়িতে গো সতা আসন পাতিল।যতন করিয়া গো তথি কটরা রাখিল॥৫০
জয়াদি জোকার দিয়া গো মঙ্গল জানায়।পঞ্চ সিন্দুরের ফোটা গো দিল কৌটার গায়॥৫২ধান্য দুর্ব্বা আলপনা গো কৈল বিধিমতে।আম্র শাখে রাখে ঘট গো জল ভরি তা’তে। ৫৪
পঞ্চ গাছি সইলতা দিয়া গো জ্বালে ঘৃতের বাতি।ধূপ ধূনা জ্বালাইয়া গো করিল আরতি॥৫৬সাষ্টাঙ্গে ভূমিতে পড়ি গো করিল প্রণাম।সতার গৃহেতে হইল গো লক্ষ্মী অধিষ্ঠান॥৫৮
পোহাইল দুঃখের নিশি গো আইল সুখ ভোর।আজ হইতে হইল সতার গো সকল দুঃখ দূর॥৬০গোয়ালেতে বন্ধ্যা গাভী গো কামধেনু হইল।সরু শস্য ধানে চাউলে গো উভরা ভরিল॥৬২ক্ষেতে যদি গো বীজ ফেলে দোনা শস্য ফলে।এখন হইতে মাধব আর গো নাহি যায় জালে॥৬৪মাছের ডুলি মাথায় সতা গো না যায় বাড়ী বাড়ী।‘রাম-লক্ষ্মণ-শাঁখা’ পরে গো মাধবের নারী॥৬৬‘গঙ্গাজল-শাড়ী’ পরে গো পিন্ধন বাহার।কোমরে বেড়িয়া পরে গো পাটের পসার॥৬৮কাঞ্চন সরা বাটায় গো সুখে পান গুয়া খায়।ফুলের মাচায় শুইয়া গো সুখে নিদ্রা যায়॥৭০
পাড়াপড়শীরা সবে গো করে কাণাকাণি।এই না আছিল সতা গো জনম-দুঃখিনী।৭২সতা বলে “পাড়াপড়শী গো থাক আশার আশে।কপালে থাকিলে গো সুখ একদিন আসে॥”৭৪
একদিন রাত্রে গো সতা দেখিল স্বপন।সে বড় আশ্চর্য্য কথা গো শুন সখীগণ॥২
আড়াই প্রহর রাত্রি গো সতা শুইয়া নিদ্রা যায়।চান্দের আলোক গো তার যুরে আঙ্গিনায়॥৪কৌটা হইতে গো এক কন্যা বাহির হইয়া।মা মা বলি ধরে গো সতার গলা জড়াইয়া॥৬আশ্চর্য্য রূপসী কন্যা গো যেন পুষ্পডালা।উজলা করিল গো গৃহ সাক্ষাৎ কমলা॥৮ধরিয়া সতার গলা গো কহে ধীরে ধীরে।“আমারে লইয়া যাও গো জনক রাজার ঘরে॥১০বাপ মোর জনক রাজা গো রাণী মোর মাও।কালি প্রাতে মোরে লইয়া গো রাণীর কাছে যাও॥”১২
ভোর না হইতে গো সতা সকালে উঠিয়া।সুবর্ণ কটরা লইল গো অঞ্চলে বান্ধিয়া॥১৪গত নিশির স্বপ্নের কথা গো রাণীরে কহিল।অঞ্চল খুলিয়া কৌটা গো রাণীর হাতে দিল॥১৬
রাণী বলে “কিবা দিব গো ইহার বদলে।”গজমোতি হার এক পরায় সতার গলে॥১৮ধামায় মাপিয়া দিলা গো রত্নাদি কাঞ্চন।সতা বলে “এ সকলে কোন প্রয়োজন॥২০তোমার রাজ্যেতে বসি গো জন্ম-কাঙ্গালিনী।আছয়ে মিনতি এক গো শুন রাজরাণী॥২২
স্বপ্ন যদি সত্য হয় গো কন্যা জন্মে ইতে।আমার নামেতে গো কন্যার নাম রাইখ্যো সীতে॥”২৪এত বলি সতা তবে গো বিদায় হইল।সুবর্ণ কটরা রাণী গো যতনে রাখিল॥২৬
শুভদিনে শুভক্ষণ গো পূর্ণিত হইল।ডিম্ব ফুটিয়া গো শিশু ভূমিষ্ঠ হইল॥২৮
সর্ব্বসুলক্ষণা কন্যা গো লক্ষ্মীস্বরূপিণী।মিথিলা নগর যুড়ি গো উঠে জয়ধ্বনি॥৩০জয়াদি জোকার দেয় গো কুলবালাগণ।দেবের মন্দিরে গো বাদ্য বাজে ঘনে ঘন॥৩২স্বর্গে মর্ত্ত্যে জয় জয় গো সুর নরগণে।হইল লক্ষ্মীর জন্ম গো মিথিলা ভবনে॥৩৪সতার নামেতে গো কন্যার নাম রাখে সীতা।চন্দ্রাবতী কহে গো কন্যা ভুবন-বন্দিতা॥৩৬
পুণ্যকথা এক চিত্তে শুন গো দিয়া মন।যে রূপে জন্মিলা গো প্রভু রাম নারায়ণ॥২এক অংশ নারায়ণ গো চারি রূপ ধরি।জন্ম লইলেন আসি গো অযোধ্যা নগরী॥৪রাজ্য করে দশরথ গো অযোধ্যা নগরে।প্রজাগণে পালে রাজা গো পুত্র সমাদরে॥৬
অপুত্রক ছিলা রাজা গো দুঃখযুক্ত হিয়া।একে একে করিলেন গো তিনখানি বিয়া॥৮কৌশল্যা কৈকেয়ী আর গো সুমিত্রা ঠাকুরাণী।রাজার আছিল এই গো তিনজন রাণী॥১০বশিষ্ঠেরে লইয়া রাজা গো করয়ে মন্ত্রণ।পুত্রের লাগিয়া করে গো যজ্ঞ আরম্ভণ॥১২
নানাদেশ হইতে গো ডাকি আনে মুনিগণে।যজ্ঞ করে দশরথ রাজা গো পুত্রের কারণে॥১৪
যতেক যজ্ঞের ফল গো হইল নিষ্ফল।আটকুরা রাজার ভাগ্যে গো না ফলিল ফল॥১৬
একদিন দশরথ গো বড় দুঃখ মন।যোড়মন্দির ঘরে যাইয়া করিল শয়ন॥১৮কপাটেতে খিল দিয়া গো অনাহারে রয়।মনদুঃখে হইল রাজার গো জীবন সংশয়॥২০একদিন দুইদিন গো তিনদিন গেল।মন্দিরের কপাট রাজা গো মুক্ত না করিল॥২২দৈবের নির্ব্বন্ধ কথা গো শুন দিয়া মন।আচম্বিতে আইল তথা গো মুনি একজন॥২৪অতিদীর্ঘ জটাভার গো পড়ে ভূমিতলে।ললাটে চন্দন তিলা গো তারা যেন জ্বলে॥২৬হস্তেতে তালের যষ্টি গো কান্ধে বাঘছাল।মুনিরে দেখিয়া গো ভয় লাগে দ্বারপাল॥২৮দুয়ারে খাড়াইয়া মুনি গো তিন ডাক মাইল।মুনির বচনে রাজা গো দুয়ার খুলিল॥৩০পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া দিল গো বসিতে আসনে।তাতে না বসিয়া মুনি গো বসে কুশাসনে॥৩২
রাজারে জিজ্ঞাসে মুনি গো কিসের কারণ।এহি মতে অনশনে গো ত্যজিছ জীবন॥৩৪দুঃখের কথা কয় রাজা গো মুনির চরণে।সান্ত্বনা করেন মুনি গো মধুর বচনে॥৩৬অকাল অমৃত ফল গো খুলি ঝুলা হইতে।আস্তে ব্যস্তে দেয় মুনি গো দশরথের হাতে॥৩৮
এই ফল দেও নিয়া গো কৌশল্যা রাণীরে।এই ফলে পাবে গো পুত্র দেবতার বরে॥৪০
ফল লইয়া দশরথ গো অতি ধীরে ধীরে।শীঘ্রগতি চলে রাজা গো কৌশল্যার মন্দিরে॥৪২ফল লইয়া দিল রাজা গো কৌশল্যার হাতে।রাজারে দেখিয়া রাণী গো উঠে চমকিতে॥৪৪মুনির বৃত্তান্ত রাজা গো বলে সমুদয়।* * * * ॥৪৬ফল পাইয়া কৌশল্যা গো আনন্দিত হিয়া।সোণার কাটরা মাঝে গো রাখিল তুলিয়া॥৪৮সরলা কৌশল্যা দেবী গো কি কাম করিলা।মুনির দেওয়া ফল রাণী গো তিন ভাগ কৈল॥৫০এক ভাগ নিজে খাইল রাণী গো আর দুই ভাগ লইয়া।সুমিত্রা কৈকেয়ীর ঘরে দিল গো পাঠাইয়া॥৫২
কিছুকাল পর শুন গো দৈবের ঘটন।গর্ভবতী হইল ক্রমে গো রাণী তিন জন॥৫৪অযোধ্যা নগরে উঠে গো জয়াদি জোকার।শুনি নাগরিয়া লোকে গো লাগে চমৎকার॥৫৬ঢাক ঢোল বাজে রঙ্গে গো নাচে প্রজাগণ।ভাণ্ডার খুলিয়া সবে গো করে ধন বিতরণ॥৫৮ব্রাহ্মণেরে দিলা রাজা গো ধনরত্ন দান।দুগ্ধবতী গাভী দিলা গো সহিত রাউখ্যাল॥৬০
এক দুই তিন করি গো পঞ্চমাস গেল।গর্ভের লক্ষণ গো ক্রমে প্রকাশ হইল॥৬২জ্যেঠি খুড়ি মিলি সবে গো সাধ খাওয়াইল।জয়রবে অযোধ্যাপুরী গো ভরিয়া উঠিল॥৬৪অলস হইল গো তনু মুখে হাই উঠে।সোণার পালঙ্ক ছাড়ি গো ভূমে পড়ি লুটে॥৬৬
পোড়া মাটি খায় গো ঘুমে ঢুলে দু’নয়ন।চন্দ্রাবতী কয় গো এই গর্ভের লক্ষণ॥৬৮
দশমাস দশদিন গো পূর্ণিত হইল।সর্ব্ব সুলক্ষণ শিশু গো ভূমিষ্ঠ হইল॥৭০সুবর্ণ কাটরীতে গো ধাই নাড়ী ছেদ করে।জয়াদি জোকার পড়ে গো কৌশল্যার মন্দিরে॥৭২দূতে গিয়া বার্ত্তা কইল গো দশরথের আগে।হিরামণ মাণিক্যি দিয়া গো রাজা পুত্রমুখ দেখে॥৭৪সুগন্ধি চন্দন যত ছিটায় গো রাজপথে।শিশু দেখ্তে রাজগণ গো আইল শূন্য রথে॥৭৬নেতের পতাকা উড়ে গো প্রতি ঘরে ঘরে।বলিদান বাদ্যভাণ্ড গো দেবের মন্দিরে॥৭৮আম্ৰশাখে পূর্ণ কুম্ভ গো তীর্থজলে ভরি।হুলাহুলি কুলাকুলি গো দেয় কুলনারী॥৮০যতেক নাটুয়াগণ করে গো নাচগান।আনন্দেতে তুলপার গো করে পুরীখান॥৮২
মঙ্গল চণ্ডিকা পূজে গো দেবী সুবচনী।বনদুর্গা পূজা করে গো ডরাই ডাকুনী॥৮৪শীতলা-ষষ্ঠীর পূজা গো করে বিধিমতে।মনসাদেবীরে পূজে গো নেতার সহিতে॥৮৬ষাটিহারা দিন দেখি গো নামাকরণ কৈল।গণিয়া বাছিয়া নাম গো পুরবাসী থৈল॥৮৮
কৌশল্যা রাখিল নাম গো কাঙ্গালের ধন।দশরথ নাম রাখে গো অযোধ্যা-ভূষণ॥৯০
রাজ্যবাসী নাম রাখে গো রাম রঘুবর।পুরনারী নাম রাখে গো শ্যামল সুন্দর॥৯২ধ্যানেতে জানিয়া গো বশিষ্ঠ তপোধন।নাম রাখে গো রামচন্দ্র কমল-লোচন॥৯৪
করকোষ্ঠী হেতু গো রাজা গণকে ডাকিল।পুঞ্জি পুঁথি হাতে লৈয়া গো গণক আইল॥৯৬খড়ি পাতি সাত পাঁচ গো ঘর যে আঁকিয়া।গণক কোষ্ঠীর ফল গো কহিল ভাবিয়া॥৯৮“জোর ভুরো দীপ্ত আঁখি গো সূর্য্য সম জ্বলে।রাজটীকা আছে গো ঐ শিশুর কপালে॥১০০আগুনে না পুড়িবে গো শিশু জলে নৈব তল।ধনুকধারী হবে শিশু গো বলে মহাবল॥১০২ইন্দ্রতুল্য পরাক্রান্ত গো রাজ্য অধিকারী।মরিবে ইহার বাণে গো ত্রিজগতের বৈরী॥”১০৪সপ্তম ঘরেতে গণক গো শূন্য যদি দিল।গোপন ঘরের কথা গো গোপনে রাখিল॥১০৬
গোপন ঘরের কথা গো রাখিল গোপনে।কপালের দোষে রাম গো যাইবেন বনে॥১০৮ফলিবে সে ব্রহ্মশাপ গো পুত্রের কারণ।এই পুত্র লাগি গো রাজা ত্যজিবে জীবন॥১১০এইরূপ জন্মিলেন গো রাম রঘুপতি।কৌশল্যা মায়ের পদে গো ভনে চন্দ্রাবতী॥১১২
সাত পাঁচ সখী বইসা গো জোড়-মন্দির ঘরে।এক সখী কহে কথা গো জিজ্ঞাসে সীতারে॥২তুমি যে গেছ্লা গো সীতা এই বনবাসে।কোন্ কোন্ দুঃখ পাইয়াছিলা গো কোন্ কোন্ মাসে॥৪
“আমার দুঃখের কথা গো কহিতে কাহিনী।কহিতে কহিতে উঠে গো জ্বলন্ত আগুনী॥৬জনম-দুঃখিনী সীতা গো দুঃখে গেল কাল।রামের মতন পতি পাইয়া গো দুঃখেরি কপাল॥৮এক ত দিনের কথা গো শুন সখীগণ।চাইর বইন আছি গো মোরা মিথিলা ভুবন॥১০আনন্দে কাটয়ে দিন গো শৈশবের বেলা।মায়ের কোলেতে থাকি গো করি খেলাধূলা॥১২বাপের আছিল পণ গো আচরিত কথা।যে ভাঙ্গিবে শিবের ধনু গো তারে দিব সীতা॥১৪
কত রাজা আইল গো গেল সীমা-সংখ্যা নাই।ধনুক ভাঙ্গিতে পারে গো সাধ্য কারো নাই॥১৬একদিন রাত্রে আমি গো দেখিলাম স্বপন।শিয়রে বসিয়া প্রভো গো কমল-লোচন॥১৮‘উঠ উঠ জানকী গো কত নিদ্রা যাও।আমি রামচন্দ্রে ডাকি গো আঁখি মেইল্যা চাও॥২০
বহুদূর দেশ হইতে গো আইলাম মিথিলা ভবন।ভাঙ্গিব শিবের ধনু গো করিয়াছি পণ॥’২২
রজনী প্রভাত হইল গো ভাঙ্গিল স্বপন।নয়নে লাগিয়া রৈল গো শ্যামল বরণ॥২৪দুর্ব্বাদল শ্যাম তনু গো সঙ্গেতে লক্ষ্মণ।আজি বুঝি সত্য হইল গো নিশার স্বপন॥২৬সঙ্গেতে আসিলা তার গো বিশ্বামিত্র মুনি।যজ্ঞস্থলে গেলা প্রভু গো রাম রঘুমণি॥২৮মিথিলার লোকে দেখে গো বলে অতঃপর।যেই জন দেখে বলে গো সীতার যোগ্য বর॥৩০চন্দ্র সূর্য্য দুই ভাই গো নর-বেশ ধরি।পণে উদ্ধারিতে বাপে গো আইল বুঝি পুরী॥৩২আজানু-লম্বিত বাহু গো মুনির ইঙ্গিতে।ভাঙ্গিল শিবের ধনু গো যেন অলক্ষিতে॥৩৪
জয় জয় শব্দ হইল গো মিথিলা ভবন।নৃত্যগীত করে যত গো সহচরীগণ॥৩৬মন্দ বর ধন্ধ লাগে গো কেউ বলে কালী।কেউ বলে মেঘের গায়ে গো শোভিছে বিজলী॥৩৮হাস্য পরিহাসে দেখ গো রজনী পোহায়।সীতারে লইয়া প্রভো গো অযোধ্যাতে যায়॥৪০আর ত দিনের কথা গো শুন মন দিয়া।এই মতে প্রভোর সঙ্গে গো অভাগিনীর বিয়া॥৪২
অযোধ্যা নগরে আছি গো হরষিত মন।শুইয়া প্রভুর কোলে গো দেখিলাম স্বপন॥৪৪সিংহাসনে বসি প্রভু গো কমল-লোচন।তার পাছে দাণ্ডাইল গো ভাই তিনজন॥৪৬
চামর ঢুলায় কেউ গো শিরে ছত্র ধরে।যথাবিধি তিন ভাই গো পদসেবা করে॥৪৮এর মধ্যে আর দিন গো দেখিলাম স্বপন।রামচন্দ্র রাজা হবে গো অযোধ্যা ভুবন॥৫০
স্বপন সফল হইল গো কালি অধিবাস।মন্থরা কুমন্ত্র দিয়া গো ঘটায় সর্ব্বনাশ॥৫২রামচন্দ্র রাজা হবে গো পইরা তিলক ছটা।বিমাতা কৈকেয়ী তারে গো পইরায় বাকল জটা॥৫৪শরতের চান্দ যেন গো মেঘেতে ডুবিল।সোণার অযোধ্যা পুরী গো অন্ধকার হইল॥”৫৬
“বৈশাখ মাসেতে দিন রে অরন্য প্রবেশ।শিরে জটা প্রভু রামের গো সন্ন্যাসীর বেশ॥২জৈষ্ঠ মাসেতে দিন রে রবির বড় জ্বালা।হাটিয়া যাইতে প্রভুর গে। বদন হৈল কালা॥৪পাষাণে ঠেকিল পদ গো রক্ত পড়ে ধারে।দুঃখিত হইয়া প্রভো গো সীতার অঙ্গে বাতাস করে॥৬পদ্মপত্রে জল আনে গো ঠাকুর লক্ষ্মণ।কতক্ষণ প্রভুর কোলে গো ছিলাম অচেতন॥৮ঘুরিতে ঘুরিতে আইলাম গো আমরা তিনজন।গোদাবরী নদীর কূল গো পঞ্চবটী বন॥১০এইখানে রঘুনাথে গো কহিলা লক্ষ্মণে।কুটির বান্ধিয়া গো বাস করি এইখানে॥১২লতাপাতা দিয়া গো কুটির বান্ধিল লক্ষ্মণ।কুটির-মধ্যে মোরা গো থাকি দুইজন॥১৪
বৃক্ষতলে দাণ্ডাইল গো দেবর লক্ষ্মণ।ধনুহাতে দিবা নিশি গো রহে জাগরণ॥১৬দেবরের গুণ আমি গো না পারি কহিতে।অরণ্য ভাঙ্গিয়া গো ফল তুলি দেয় হাতে॥১৮রসাল বনের ফল গো পাতার কুটির পাইয়া।অযোধ্যার রাজ্যপাট গো গেলাম ভুলিয়া॥২০লক্ষ্মণ কানন হইতে গো আনি দেয় ফল।পদ্মপত্রে আনি আমি গো তমসার জল॥২২চরণ ধুয়াইয়া প্রভুর গো তৃণ শয্যা পাতি।মনের আনন্দে কাটি গো বনবাসের রাতি॥২৪
কি করিবে রাজ্যসুখ গো রাজসিংহাসনে।শত রাজ্যপাট আমার গো প্রভুর চরণে॥২৬ভোরেতে উঠিয়া মালা গো গাঁথি বনফুলে।
আনন্দে পরাই মালা গো প্রভু রামের গলে॥২৮
“পোহাইল সুখের নিশি গো আমি অভাগিনী।বঞ্চিয়া প্রভুর সাথে গো সুখের রজনী॥২গগনেতে হইল বেলা গো দণ্ড তিন চারি।সে দিনের দুঃখ কথা গো কহিতে না পারি॥৪কুটিরের বাইরে বসি গো আমরা দুইজন।তরুতলে বসিয়াছেন গো দেবর লক্ষ্মণ॥৬বসিতে বসিতে মোর গো ঘুমে ঢুলে আঁখি।অলস নয়নে গো প্রভুর চান্দমুখ দেখি॥৮ঊরু উপাধান গো প্রভু পাতিল তখন।অঞ্চল পাতিয়া গো আমি করিলাম শয়ন॥১০এমন সময়ে এক গো সোনার হরিণী।কুক্ষণে নজর পড়ে গো মুই অভাগিনী॥১২মেঘের অঙ্গেতে যেমন গো বিজলীর ঝলা।চলিছে সোণার মৃগ গো বন করি উজলা॥১৪প্রভুরে কহিলাম আমি গো যুড়ি দুই পাণি।এত যে হইবে গো নাহি জানি অভাগিনী॥১৬
‘এমন সুন্দর মৃগ গো কভু দেখি নাই।সোনার হরিণ ধরি গো দেহ ত গোঁসাই॥১৮শুক্না লতায় বান্ধি গো কুটিরের দ্বারে।যাবৎ না মানে পোষ গো রাখিব ইহারে॥২০অযোধ্যাতে যাব মোরা গো এই মৃগ লইয়া।বনের চিহ্ন রাখ গো প্রভু ইহারে ধরিয়া॥’২২
হাতে ধনু উঠিলেন গো কমল-লোচন।নাগপাশ অস্ত্র লইয়া গো করিয়া যতন॥২৪
‘হরিণ ধরিতে আমি গো চলিলাম বনে।সীতারে রাখিও লক্ষ্মণ অতি সাবধানে॥’২৬
এত বলি প্রভু রাম গো করিলা গমন।কতক্ষণ পরে শুনি গো প্রভুর ক্রন্দন॥২৮‘কোথারে লক্ষ্মণ ভাই গো শীঘ্র কইর্যা আইস।রাক্ষসের হাতে মোর প্রাণ হইল নাশ॥’৩০
শুইয়াছিলাম আমি গো বসিলাম উঠিয়া।আর বার কহে প্রভু গো লক্ষ্মণে ডাকিয়া॥৩২‘শুন শুন দেবর গো আমার মাথা খাও।প্রভুরে রক্ষিতে তুমি শীঘ্র কইরা যাও॥’৩৪
হাতেতে ধনুর শর গো চলিলা লক্ষ্মণ।চিন্তায় আকুল প্রাণ গো পবন-গমন॥৩৬একাকিনী বনমধ্যে গো আমি অভাগিনী।ভুজঙ্গ চলিল যেমন গো এড়াইয়া মণি॥৩৮এত দুঃখ ছিল সীতার গো যদি জানিতাম।মৃগ ধরিবারে প্রভুর গো সঙ্গে যাইতাম॥”৪০
“শিবশঙ্কর নাম গো লইয়া আচম্বিতে।দণ্ডাইল যোগী এক গো আসিয়া দ্বারেতে॥২দণ্ড-কমণ্ডলুধারী গো অঙ্গে মাখা ছাই।দুয়ারে আসিয়া বলে গো ‘ভিক্ষা কিছু চাই॥’৪‘কি ভিক্ষা দিব গো আমি শুনহ গোসাঞ।শূন্যগৃহে একাকিনী গো প্রভু সঙ্গে নাই॥৬আজি যদি থাকতাম আমি গো অযোধ্যা ভবনে।ধামায় মাপিয়া গো দিতাম রত্নাদি কাঞ্চনে॥’৮
যোগী বলে ‘ধনে মোর গো নাহি প্রয়োজন।ঘরে আছে বনের ফল গো তাই কর দান॥১০ক্ষুধায় অবশ অঙ্গ গো আইলাম তব দ্বারে।অতিথে না দিলে ভিক্ষা গো যাই তবে ফিরে॥’১২
একটি বনের ফল গো অঞ্চলে বান্ধিয়া।কুটিরের বাহির হইলাম গো ভাবিয়া চিন্তিয়া॥১৪আমি কি গো জানি সখি কালসর্পবেশে।এমনি করিয়া সীতায় গো ছলিবে রাক্ষসে॥১৬প্রণাম করিনু আমি গো পড়িয়া ভূতলে।উড়িয়া গরুড় পক্ষী গো সৰ্প যেমন গেলে॥১৮রথেতে তুলিল মোরে গো দুষ্ট লঙ্কাপতি।দেবগণে ডাকি কহি গো দুঃখের ভারতী॥২০অঙ্গের আভরণ খুলি গো মারিনু রাক্ষসে।পর্ব্বতে মারিলে ঢিল গো কিবা যায় আসে॥২২কতক্ষণ পরে গো আমি হইলাম অচেতন।এখনো স্মরিলে কথা গো হারাই চেতন॥২৪
জাগিয়া দেখিনু আমি গো আছি লঙ্কাপুরী।আমারে বেড়িয়া পাশে গো বসি যত চেড়ী॥২৬অশোক-কাননে গো বাস আমি অভাগিনী।সেইদিন সাজিলাম গো যৌবনে যোগিনী॥২৮বস্ত্র অলঙ্কার ত্যজি গো নিদ্রা ও আহার।রাক্ষসের গৃহে থাকি গো করি অনাহার॥৩০
কান্দিয়া নয়ন গলে গো মৈলান হইল কেশ।দিবানিশি জাগে প্রভুর গো সন্ন্যাসীর বেশ॥৩২পাগলিনী হইল সীতা গো নাহি কিছু জ্ঞান।প্রভুরে দেখিতে শুধু গো রাখিলাম প্রাণ॥৩৪মরণে বাসনা নাই গো চরণ পাইবার আশে।সীতার চক্ষের জলে গো অশোক-বন ভাসে॥”৩৬
“আষাঢ় মাসেতে দিন রে ঘন বরিষণ।তৰ্জ্জিয়া গৰ্জ্জিয়া আসে গো যত দেয়াগণ॥২মেঘে তত নাইকো পানি সীতার চক্ষে যত জল।কান্দিয়া ভিজাই আমি গো অশোকের তল॥৪বিষ খাই জলে ডুবি গো বুঝিতে না পারি।সান্ত্বনা করিয়া রাখে গো সরমা সুন্দরী॥৬
শ্রাবণ মাসেতে আমি গো দেখিনু স্বপন।হইল প্রভুর সঙ্গে গো সুগ্রীব-মিলন॥৮
ভাদ্রে স্বপন দেখি গো দিবসে জাগিয়া।অশোকের ডালে পক্ষী গো বসিল উড়িয়া॥১০পক্ষী নয় পক্ষী নয় গো প্রভু রামের চর।বীর হনুমান বৈসে গো ডালের উপর॥১২কত ভাবে মতে গো সীতারে বুঝায়।প্রাণ ত বুঝে না গো সীতার হইল বড় দায়॥১৪রামের অঙ্গুরী বীর গো দেখাইল মোরে।অঙ্গুরী দেখিতে সীতার গো অশ্রু পড়ে ধারে॥১৬পাইল রামচন্দ্র গো সীতার বারতা।তারপর শুন গো সীতা উদ্ধারের কথা॥১৮
আশ্বিন মাসেতে সীতা গো দেখিলা স্বপন।বনেতে করেন প্রভু গো অকাল-বোধন॥২০রাবণ বধিতে প্রভু গো পুজেন অম্বিকায়।সীতার দুঃখের দিন গো এইরূপে যায়॥২২
কার্ত্তিক মাসেতে দিন রে ছোট হইল বেলা।কান্দিয়া কাটাই দিন গো বসিয়া একেলা॥২৪নয়নের জলে মোর গো নদী বইয়া যায়।সুখের বারতা আইস্যা গো সরম। জানায়॥২৬কান্দিতে কান্দিতে সাঁতার গো অস্থিচর্ম্ম-সারএত দুঃখ ছিল বিধি গো কপালে আমার॥২৮
অগ্রহায়ণ মাসেতে শুনি গো বৃক্ষ আর পাথরে।দুরন্ত সাগর, আসি গো, বান্ধিল বানরে॥৩০
পৌষ মাসেতে দিন রে পৌষ অন্ধকার।বানর-কটকে ঘিরে গো লঙ্কার চারিধার॥৩২
মাঘ মাসেতে আমি গো দেখিনু স্বপন।রণে মরে ইন্দ্রজিত গো রাবণ-নন্দন॥৩৪স্বপন সফল হইল গো লঙ্কা ছারখার।সাগরের কূলে শুনি গো রাক্ষসের হাহাকার॥৩৬ফাল্গুন মাসেতে আমি গো দেখিনু স্বপনে।সবংশে মরিল রাবণ গো শ্রীরামের বাণে॥৩৮স্বপন সফল হইল গো দুঃখের দিন যায়।বানর-কটক শুনি গো রামগুণ গায়॥৪০
চৈত্র মাসেতে সীতার গো দুঃখ হইল দূর।পোহাইল দুঃখের নিশি গো আইল সুখ ভোর॥৪২অন্ধেতে পাইল যেমন গো নয়নের মণি।তেমতি দুঃখিনী সীতা গো পাইল রঘুমণি॥”৪৪
সীতার বারমাসী কথা গো দুঃখের ভারতী।বারমাসের দুঃখের কথা গো ভনে চন্দ্রাবতী॥৪৬
সুখ-বসন্তের কথা গো শুন সখীগণ।রতন-মন্দিরে বসি গো কৌশল্যা-নন্দন॥২উপরে চান্দোর টাঙ্গায় গো নীচে শীতল পাটি।রামসীতা বসিলেন গো হাতে পাশার কাটি॥৪আবের পাখায় বাতাস গো করে সখীগণ।কৌতুকে করেন রাম গো প্রেম-আলাপন॥৬
গুয়া পান খায় কেহ গো হাসে খলখলি।চান্দেরে ঘেরিয়া যেন গো তারার মণ্ডলী॥৮সুবর্ণের গুটিতে গো ঘর সাজাইয়া।রামচন্দ্র খেলে পাশ। গো সীতারে লইয়া॥১০লক্ষ্মীর সহিত পাশা গো খেলে নারায়ণে।ইন্দ্র যেন খেলে পাশা গো শচীরাণী সনে॥১২মদনের সহিত পাশা গো খেলে যেন রতি।হরের সহিত কিংবা গো খেলায় পার্ব্বতী॥১৪হাসিয়া কহিছে তবে গো সহচরীগণ।“এক কথা শুন রাম গো কমল-লোচন॥১৬হার-জিত হবে যেই গো আগে কর পণ।হারিলে জিতিলে কিবা গো দিবে কোন্ জন॥”১৮
শ্রীরাম বলেন “পাশায় গো আমি যদি হারি।হস্ত হইতে দিব খুলে গো রতন-অঙ্গুরী॥২০
জানকী হারিলে বল গো দিবে কিবা পণ।”সখীগণ বলে “দিবে গো প্রেম-আলিঙ্গন॥”২২
লাজে অধোমুখী গো সীতা পড়িলেন ঢলি।পত্রের ভারেতে যথা গো চম্পকের কলি॥২৪পড়িল পাশার দান গো খেলিতে খেলিতে।হারিলেন রামচন্দ্র গো সীতাদেবী জিতে॥২৬
হাসিতে হাসিতে তবে গো যত সহচরী।সীতারে বেড়িল গো রামে দিয়া টিটকারী॥২৮জোর করি শ্রীরামের গো অঙ্গুরী খসাইয়া।সীতার অঙ্গুলে সখী গো দিল পরাইয়া॥৩০“পুরুষ হইয়া হারে গো রমণীর সনে।”তিরস্কার করে রামে গো মিষ্ট আলাপনে॥৩২
ছয় তিন কাঁচাগুঁটি গো পাকা যে হইল।এইবার সীতাদেবী গো পণেতে হারিল॥৩৪হাসিয়া শ্রীরাম ক’ন গো সহচরীগণে।“প্রতিজ্ঞা-পালন কথা গো আছে কিনা মনে॥”৩৬আড়িকুলা করি তবে গো যতেক সঙ্গিনী।শ্রীরামের কুলে দিলা গে। জনক-নন্দিনী॥৩৮চুম্বন করিয়া সীতায় গো বলেন রঘুবর।“যাহা ইচ্ছা মনোমত গো বাছি লও বর॥”৪০
চন্দ্রা কহে পোহাইল গো সুখের রজনী।সাবধানে মাগ বর গো জনক-নন্দিনী॥৪২ধীরে ধীরে ক’ন সীতা গো রামের গোচরে।“মনের বাসনা প্রভু গো কহি যে তোমারে॥৪৪বহুদিন হইতে মোর গো আশা ছিল মনে।আর বার বেড়াইব গো পুণ্য তপোবনে॥৪৬
তমসা নদীর কথা গো সদা পড়ে মনে।রাজহংসী খেলা করে গো কমল-কাননে॥৪৮তমালের ডালে নাচে গো ময়ূরাময়ূরী।সোনার হরিণী ছিল গো মোর সহচরী॥৫০প্রতি নিশি স্বপ্ন দেখি গো মুনিকন্যাগণে।তোমার সঙ্গেতে যেন গো বেড়াই বনে বনে॥”৫২
চুম্বন করিয়া রাম গো কহেন সীতারে।“আজ নিশি কর বাস গো রতন-মন্দিরে॥৫৪কালি প্রাতে আশা তব করিব পূরণ।লক্ষ্মণ সহিতে তোমা গো পাঠাইব বন॥”৫৬চন্দ্রা কহে দৈবদুঃখ গো না যায় খণ্ডানি।কি বর মাগিলে গো হায় জনক-নন্দিনী॥৫৮
শয়ন-মন্দিরে একা গো সীতা ঠাকুরাণী।সোণার পালঙ্কোপরি গো ফুলের বিছানী॥২চারিদিকে শোভে তার গো সুগন্ধি কমল।সুবর্ণ-ভৃঙ্গার ভরা গো সরযুর জল॥৪নানাজাতি ফল আছে গো সুগন্ধে রসিয়া।যাহা চায় তাহা দেয় গো সখীরা আনিয়া॥৬ঘন ঘন হাই উঠে গো নয়ন চঞ্চল।অল্প অবশ অঙ্গ গো মুখে উঠে জল॥৮
উপকথা সীতারে গো শুনায় আলাপিনী।হেন কালে আস্ল তথায় গো কুকুয়া ননদিনী॥১০
কুকুয়া বলিছে “বধূ গো মম বাক্য ধর।কিরূপে বঞ্চিলা তুমি গো রাবণের ঘর॥১২
দেখি নাই রাক্ষসে গো শুনিতে কাঁপে হিয়া।দশমুণ্ড রাবণ রাজা গো দেখাও আঁকিয়া॥”১৪
মুর্চ্ছিতা হইল সীতা গো রাবণ-নাম শুনি।কেহ বা বাতাস দেয় গো কেহ মুখে পানি॥১৬সখীগণ কুকুয়ারে গো করিল বারণ।“অনুচিত কথা তুমি গো বল কি কারণ॥১৮রাজার আদেশ নাই গো বলিতে কুকথা।তবে কেন ঠাকুরাণীর গো মনে দিলে ব্যথা॥”২০প্রবোধ না মানে গো কুকুয়া ননদিনী।বার বার সীতারে গো বলয়ে সেই বাণী॥২২
সীতা বলে “আমি তারে গো না দেখি কখন।কিরূপে আঁকিব আমি গো পাপিষ্ঠ রাবণ॥”২৪যত করি বুঝান সীতা গো কুকুয়া না ছাড়ে।হাসিমুখে সীতারে গো সুধায় বারে বারে॥২৬
বিষলতার বিষফল গো বিষগাছের গোটা।অন্তরে বিষের হাসি গো বাধাইল লেঠা॥২৮সীতা বলে “দেখিয়াছি গো ছায়ার আকারে।হরিয়া যখন দুষ্ট গো লয়ে যায় মোরে॥৩০সাগর-জলেতে পরে গো রাক্ষসের ছায়া।দশ মুণ্ড কুড়ি হাত গো রাক্ষসের কায়া॥”৩২
বসি ছিল কুকুয়া গো শুইল পালঙ্কেতে।আবার সীতারে কয় গো রাবণ আঁকিতে॥৩৪এড়াতে না পারে সীতা গো পাখার উপর।আঁকিলেন দশমুণ্ড গো রাজা লঙ্কেশ্বর॥৩৬
শ্রমেতে কাতর সীতা গো নিদ্রায় ঢালল।কুকুয়া তালের পাখা গো বুকে তুলি দিল॥৩৮
কালসাপিনী কুকুয়া গো কালকূটে ভরা।সীতার মুখ দেখতে নারে গো এম্নি কপালপোড়া॥২কুরূপা কুৎসিতা সে যে গো ক্রুর ও মুখরা।শিখায়ে পালিয়ে বড় গো কইরাছে মন্থরা॥৪
কৈকেয়ীর কন্যা সে যে গো ছোট ভরতের।রাজার ঘরে বিয়া হইয়া গো কপালের ফের॥৬শ্বশুর শাশুড়ী তার গো দুই চক্ষের বালি।পাড়ার লোকেরা ডাকে গো নিন্দুক কুন্দলী॥৮
বাতাসে করিয়া ভর গো পাতয়ে কুন্দল।ঔষধ খাওয়াইয়া কর্ছে গো স্বামীরে পাগল॥১০দেবর ভাসুরে খেদায় গো দিয়া বেড়াবাড়ি।পরের কলঙ্ক গাইয়া গো ফিরে বাড়ী বাড়ী॥১২পরের কলঙ্ক কথায় গো কুকুয়। দশমুখ।স্বামি-স্ত্রীতে কোন্দল বাধায় গো দেখিতে কৌতুক॥১৪
সধবা হইয়া কুকুয়া গো কার্য্য-দোষে রাঁড়ী।দশ বচ্ছর ধইর্যা কেবল আছে বাপের বাড়ী॥১৬রাম-সীতার সুখ তার গো পরাণে না সয়।অন্তরে বিষের ধার গো হেসে কথা কয়॥১৮
বসে আছেন রামচন্দ্র গো রত্ন-সিংহাসনে।উপনীত হইল গিয়া গো শ্রীরামের স্থানে॥২০কালনাগিনী যেমন গো ছাড়িয়া নিশ্বাস।দণ্ডাইল কুকুয়া গো শ্রীরামের পাশ॥২২
নয়নে আগুনি তার গো ঘন শ্বাস বহে।তৰ্জ্জিয়। গৰ্জ্জিয়া তবে গো শ্রীরামেরে কহে॥২৪
“শুন শুন দাদা ওগো কহি যে তোমারে।বলিতে পাপের কথা গো বাক্য নাহি সরে॥সীতা ধ্যান সীতা জ্ঞান দাদা গো সীতা চিন্তামণি।প্রাণের চাইতে অধিক তোমার গো জনক-নন্দিনী॥বিশ্বাস না কর কথা গো না শুনিলে কাণে।অসতী নিলাজ সীতা গো ভজিল রাবণে॥কি কব সীতার কথা গো কইতে লাগে ভয়।পড়িলে তোমার কোপে গো জীবন সংশয়।রূপসী দেখিয়া দাদা গো আপনি মজিলে।রঘুবংশে কালি দিতে গো সাঁতারে আনিলে॥এক নয় দুই নয় গো পূর্ণ দশ মাস।আছিল তোমার সীতা গো রাবণের পাশ॥বলিলে রাবণের কথা গো সীতার চক্ষে বহে ধারা।মুখ ফিরাইয়া কান্দে দাদা গো তোমার নয়ন-তারা॥সংসার না বুঝ দাদা গো তুমি ত সরল।অমৃত ভাবিয়া দাদা গো পিইলে গরল॥জানিয়া পুষ্পের মালা গো দাদা পরিলে গলায়।সময় পাইয়া কালনাগিনী গো দংশিল তোমায়॥চণ্ডালে ছুঁইলে ফুল গো না লাগে পূজায়।কুকুরের উচ্ছিষ্ট অন্ন গো লোকে নাহি খায়॥৪৪বিশ্বাস না কর দাদা গো দেখহ আসিয়া।তোমার সীতা নিদ্রা যায় গো রাবণ বুকে লইয়া॥”৪৬
হরিণী মারিতে যেমন গো বাঘিনী ধায় রড়ে।শীঘ্রগতি পশে দুইয়ে সাঁতার মন্দিরে॥৪৮
পঞ্চমাসের গর্ভ সীতা গো অলসে ঘুমায়।অঙ্গুলি হেলাইয়া কুকুয়া গো রামেরে দেখায়॥৫০
শিরেতে হানিল বাজ গো বাক্য নাহি সরে।চলিয়া গেলেন রাম গো আপন মন্দিরে॥৫২বিষবাণ বিন্ধিল গো শ্রীরামের পরাণে।সর্ব্বনাশের কথা সীতা গো কিছুই না জানে॥৫৪
বনেতে আগুনি জ্বলে গো সায়রে ছোটে বান।উন্মত্ত পাগল প্রায় গো বসিলেন রাম॥৫৬রাঙ্গা জবা আঁখি রামের গো শিরে রক্ত উঠে।নাসিকায় অগ্নিশ্বাস ব্রহ্মরন্ধ্র ফুটে॥৫৮যে আগুন জ্বালাইল আজ গো কুকুয়া ননদিনী।সে আগুনে পুড়িবে সীতা গো সহিত রঘুমণি॥৬০পুড়িবে অযোধ্যাপুরী গো কিছু দিন পরে।লক্ষ্মীশূন্য হইয়া রাজ্য গো যাবে ছারখারে॥৬২পরের কথা কাণে লইলে গো নিজের সর্ব্বনাশ।চন্দ্রাবতী কহে রামের গো বুদ্ধি হইল নাশ॥৬৪
Comments
Loading comments…