বিবাহ

কথা

প্রহরখানেক রাত হয়েছে শুধু,ঘন ঘন বেজে ওঠে শাঁখ।বর-কন্যা যেন ছবির মতআঁচল বাঁধা দাঁড়িয়ে আঁখি-নত,জানলা খুলে পুরাঙ্গনা যতদেখচে চেয়ে ঘােমটা করি ফাঁক।বর্ষারাতে মেঘের গুরু গুরুতারি সঙ্গে বাজে বিয়ের শাঁখ।

ঈশান কোনে থম্‌কে আছে হাওয়া,মেঘে মেঘে আকাশ আছে যেরি।সভাকক্ষে হাজার দীপালােকেমণিমালায় ঝিলিক্ হানে চোখে;সভার মাঝে হঠাৎ এল ও কে!বাহির দ্বারে বেজে উঠল ভেরী।চমকে ওঠে সভার যত লােকে,উঠে দাঁড়ায় বর-কনেরে ঘেরি।

টোপর পরা মেত্রি-রাজকুমারেকহে তখন মাড়ােয়ারের দূত-“যুদ্ধ বাধে বিদ্রোহীদের সনে,রাম সিংহ রাণা চলেন রণে,তােমরা এস তাঁরি নিমন্ত্রণেযে যে আছ মর্ত্তিয়া রাজপুত।”জয় রাণ। রামসিঙের জয়-গর্জ্জি উঠে মাড়ােয়ায়ের দূত।

জয় রাণা রামসিঙের জয়-মেত্রিপতি উৰ্দ্ধস্বরে কয়।কনের বক্ষ কেঁপে ওঠে ডরে,দুটি চক্ষু ছল-ছল করে,বরযাত্রী হাঁকে সমস্বরেজয়রে রাণা রামসিঙের জয়।

“সময় নাহি মেত্রি রাজকুমার”মহারাণার দূত উচ্চে কয়।

বৃথা কেন উঠে হুলুধ্বনিবৃথা কেন বেজে ওঠে শাঁখ।বাঁধা আচল খুলে ফেলে বর,মুখের পানে চাহে পরম্পর,কহে -“প্রিয়ে নিলেম অবসর,এসেছে ঐ মৃত্যুসভার ডাক।”বৃথা এখন ওঠে হুলুধ্বনি,বৃথা এখন বেজে ওঠে শাঁখ।

বরের বেশে টোপর পরি শিরেঘােড়ায় চড়ি ছুটে রাজকুমার।মলিনমুখে নম্র নতশিরেকন্যা গেল অন্তঃপুরে ফিরে,হাজার বাতি নিবল ধীরে ধীরেরাজার সভা হল অন্ধকার।গলায় মালা টোপর-পরা শিরেঘােড়ায় চড়ি ছুটে রাজকুমার।

মাতা কেঁদে কহেন—বধূ-বেশখুলিয়া ফেল্‌ হায় রে হতভাগী!

শান্তভাষে কন্যা কহে মায়ে-কেঁদনা মা ধরি তােমার পায়ে!বধূসজ্জা থাক্ মা আমার গায়েমেত্রি-পুরে যাইব তাঁর লাগি।শুনে মাতা কপালে কর হানিকেঁদে কহেন—হায় রে হতভাগী!

গ্রহবিপ্র আশীর্ব্বাদ করিধানদূর্ব্বা দিল তাহার মাথে।চড়ে কন্যা চতুর্দ্দোলা পরে,পুরনারী হুলুধ্বনি করে,রঙীন বেশে কিঙ্করী কিঙ্করেসারি সারি চলে বালার সাথে।মাতা আসি চুমো খেলেন মুখে,পিতা আসি হস্ত দিলেন মাথে।

নিশীথ রাতে আকাশ আলাে করিকে এল রে মেত্রিপুর দ্বারে।“থামাও বাঁশি” কহে “থামাও বাঁশি-চতুর্দ্দোলা নামাও রে দাস দাসী,মিলেছি আজ মেত্রি-পুরবাসীমেত্রিপতির চিতা রচিবারে।

মেত্রিরাজা যুদ্ধে হত আজিদুঃসময়ে কারা এলে দ্বারে!”

"বাজাও বাঁশি ওরে বাজাও বাঁশি"চতুর্দ্দোলা হতে বধূ বলে।এবার লগ্ন নাহি হবে পার,আঁচলের গাঁঠ খুলবে নাক আর,শেষমন্ত্র পড়িব এইবারশ্মশান সভায় দীপ্ত চিতানলে।বাজাও বাঁশি ওরে বাজাও বাঁশিচতুর্দ্দোলা হতে বধু বলে।

বরের বেশে মােতির মালা গলেমেত্রিপতি চিতার পরে শুয়ে।দোলা হতে নামল আসি নারী,আঁচল বাঁধি’ রক্তবাসে তাঁরিশিয়র পরে বৈসে রাজকুমারীবরের মাথা কোলের পরে থুয়ে।নিশীথ রাতে বরসজ্জা পরামেত্রিপতি চিতার পরে শুয়ে।

ঘন ঘন করি হুলুধ্বনিদলে দলে আসে পুরাঙ্গনা।পুরুত কহে- ধন্য সুচরিতা,গাহিছে ভাট—ধন্য মৃত্যুজিতা,—

ধূধূ করে জ্বলে উঠল চিতা,—কন্যা বসে আছেন যোগাসনা।জয়ধ্বনি উঠে শ্মশান মাঝে,হুলুধ্বনি করে পুরাঙ্গনা।

Comments

Loading comments…