বিসর্জন

কথা

দুইটি কোলের ছেলে গেছে পর-পরবয়স না হোতে হোতে পূরা দু’বছর।এবার ছেলেটি তার জন্মিল যখন—স্বামীরেও হারাল মল্লিকা। বন্ধুজন

বুঝাইল,—পূর্বজন্মে ছিল বহু পাপএ জনমে তাই হেন দারুণ সন্তাপ।শোকানলদগ্ধ নারী একান্ত বিনয়েঅজ্ঞাত জন্মের পাপ শিরে বহি ল’য়েপ্রায়শ্চিত্তে দিল মন। মন্দিরে মন্দিরেযেথা-সেথা গ্রামে গ্রামে পূজা দিয়া ফিরে;ব্রতধ্যান উপবাসে আহ্নিকে তর্পণেকাটে দিন ধূপে দীপে নৈবেদ্য চন্দনেপূজাগৃহে; কেশে বাঁধি রাখিলা মাদুলি।কুড়াইয়া শত ব্রাহ্মণের পদধূলি; —শুনে রামায়ণ কথা, সন্ন্যাসী সাধুরেঘরে আনি আশীর্বাদ করায় শিশুরেবিশ্বমাঝে আপনারে রাখি সর্বনিচেসবার প্রসন্ন দৃষ্টি অভাগী মাগিছেআপন সন্তান লাগি। সূর্য চন্দ্র হতেপশু পক্ষী পতঙ্গ অবধি কোনো মতেকেহ পাছে কোনো অপরাধ লয় মনেপাছে কেহ করে ক্ষোভ, অজানা কারণেপাছে কারো লাগে ব্যথা—সকলের কাছেআকুল বেদনাভরে দীন হয়ে আছে।

যখন বছর দেড় বয়স শিশুর—যকৃতের ঘটিল বিকার; জ্বরাতুরদেহখানি শীর্ণ হয়ে আসে। দেবালয়েমানিল মানৎ মাতা, পদামৃত লয়েকরাইল পান, হরিসংকীর্তন গানেকাঁপিল প্রাঙ্গণ। ব্যাধি শান্তি নাহি মানে।কাঁদিয়া শুধাল নারী—ব্রাহ্মণ ঠাকুর,এত দুঃখে তবু পাপ নাহি হোলো দূর?দিনরাত্রি দেবতার মেনেছি দোহাই,দিয়েছি এত যে পূজা তবু রক্ষা নাই?তবু কি নেবেন তাঁরা আমার বাছারে।এত ক্ষুধা দেবতার? এত ভারে ভারেনৈবেদ্য দিলাম খেতে বেচিয়া গহনা,সর্বস্ব খাওয়ানু তবু ক্ষুধা মিটিল না?ব্রাহ্মণ কহিল—“বাছা এযে ঘোর কলি।অনেক করেছ বটে তবু এও বলিআজকাল তেমন কি ভক্তি আছে কারো।সত্যযুগে যা পারিত তা কি আজ পারো।দানবীর কর্ণ কাছে ধর্ম যবে এসেপুত্রেরে চাহিল খেতে ব্রাহ্মণের বেশেনিজহস্তে সন্তানে কাটিল। তখনি সেশিশুরে ফিরিয়া পেল চক্ষের নিমিষে।

শিবি রাজা শ্যেনরূপী ইন্দ্রের মুখেতেআপন বুকের মাংস কাটি দিল খেতে—পাইল অক্ষয় দেহ। নিষ্ঠা এরে বলে।তেমন কি একালেতে আছে ভূমণ্ডলে।মনে আছে ছেলেবেলা গল্প শুনিয়াছিমার কাছে—তাঁদের গ্রামের কাছাকাছিছিল এক বন্ধ্যা নারী,—না পাইয়া পথপ্রথম গর্ভের ছেলে করিল মানতমা গঙ্গার কাছে; শেষে পুত্রজন্মপরেঅভাগী বিধবা হোলো; গেল সে সাগরে,কহিল সে নিষ্ঠাভরে মা গঙ্গারে ডেকে—মা, তোমারি কোলে আমি দিলাম ছেলেকে—এ মোর প্রথম পুত্র, শেষ পুত্র এইএ জন্মের তরে আর পুত্র আশা নেই।যেমনি জলেতে ফেলা, মাতা ভাগীরথীমকরবাহিনী রূপে হয়ে মূর্তিমতীশিশু লয়ে আপনার পদ্মকরতলেমার কোলে সমর্পিল। নিষ্ঠা এরে বলে।”মল্লিকা ফিরিয়া এল নত শির করে—আপনারে ধিক্কারিল,—এতদিন ধরেবৃথা ব্রত করিলাম, বৃথা দেবার্চনা,নিষ্ঠাহীনা পাপিষ্ঠারে ফল মিলিল না।

ঘরে ফিরে এসে দেখে শিশু অচেতনজ্বরাবেশে। অঙ্গ যেন অগ্নির মতন;ঔষধ গিলাতে যায় যত বারবারপড়ে যায়—কণ্ঠ দিয়া নামিল না আর।দন্তে দন্তে গেল আঁটি। বৈদ্য শির নাড়িধীরে ধীরে চলি গেল রোগী-গৃহ ছাড়ি।সন্ধ্যার আঁধারে শূন্য বিধবার ঘরেএকটি মলিন দীপ শয়ন-শিয়রে,একা শোকাতুরা নারী। শিশু একবারজ্যোতিহীন আঁখি মেলি যেন চারিধারখুঁজিল কাহারে। নারী কাঁদিল কাতর—ও মানিক ওরে সোনা, এই যে মা তোর,এই যে মায়ের কোল, ভয় কিরে বাপ।বক্ষে তারে চাপি ধরি’ তার জ্বর-তাপচাহিল কাড়িয়া নিতে অঙ্গে আপনারপ্রাণপণে। সহসা বাতাসে গৃহদ্বারখুলে গেল; ক্ষীণ দীপ নিবিল তখনি,সহসা বাহির হতে কল কলধ্বনিপশিল গৃহের মাঝে। চমকিয়া নারীদাঁড়ায়ে উঠিল বেগে শয্যাতল ছাড়ি,কহিল, মায়ের ডাক ওই শুনা যায়—ও মোর দুঃখীর ধন, পেয়েছি উপায়—

তোর মার কোল চেয়ে সুশীতল কোলআছে ওরে বাছা। জাগিয়াছে কলরোলঅদূরে জাহ্নবীজলে,—এসেছে জোয়ারপূর্ণিমায়। শিশুর তাপিত দেহভারবক্ষে ল’য়ে মাতা গেল শূন্য ঘাটপানে।কহিল, মা, মার ব্যথা যদি বাজে প্রাণেতবে এ শিশুর তাপ দেগো মা জুড়ায়ে।একমাত্র ধন মোর দিনু তোর পায়েএকমনে। এত বলি সমর্পিল জলেঅচেতন শিশুটিরে ল’য়ে করতলে,চক্ষু মুদি। বহুক্ষণ আঁখি মেলিল না।ধ্যানে নিরখিল বসি, মকরবাহনাজ্যোতির্ময়ী মাতৃমূর্তি ক্ষুদ্র শিশুটিরেকোলে ক’রে এসেছেন, রাখি তার শিরেএকটি পদ্মের দল; হাসিমুখে ছেলেঅনিন্দিত কান্তি ধরি, দেবীকোল ফেলেকার কোলে আসিবারে বাড়ায়েছে কর।কহে দেবী—রে দুঃখিনী এই তুই ধর্তোর ধন তোরে দিনু।—রোমাঞ্চিতকায়নয়ন মেলিয়া কহে—“কই মা।—কোথায়।”পরিপূর্ণ চন্দ্রালোকে বিহ্বলা রজনী;গঙ্গা বহি চলি যায় করি কলধ্বনি।

চীৎকারি উঠিল নার—দিবিনে ফিরায়ে?মর্মরিল বনভূমি দক্ষিণের বায়ে।

Comments

Loading comments…