দেবতার গ্রাস

কাব্যগ্রন্থ — কথা ও কাহিনী

গ্রামে গ্রামে সেই বার্ত্তা রটি গেল ক্রমেমৈত্র মহাশয় যাবে সাগরসঙ্গমেতীর্থস্নান লাগি। সঙ্গীদল গেল জুটিকত বালবৃদ্ধ নরনারী; নৌকা দুটিপ্রস্তুত হইল ঘাটে।

পুণ্যলােভাতুরমােক্ষদা কহিল আসি “হে দাদাঠাকুর,আমি তব হব সাথী!”-বিধবা যুবতী,দু’খানি করুণ আঁখি মানে না যুকতি,কেবল মিনতি করে,—অনুরােধ তা'রএড়ানাে কঠিন বড়!—“স্থান কোথা আর”মৈত্র কহিলেন তা’রে। “পায়ে ধরি তব”বিধবা কহিল কাঁদি “স্থান করি লবকোনােমতে এক ধারে।” ভিজে গেল মনতবু দ্বিধাভরে তা'রে শুধাল ব্রাহ্মণ“নাবালক ছেলেটির কি করিবে তবে?”উত্তর করিলা নারী-“রাখাল? সে র'বেআপন মাসীর কাছে। তা'র জন্মপরে

বহুদিন ভুগেছিনু সূতিকার জ্বরেবাঁচিব ছিল না আশা; অন্নদা তখনআপন শিশুর সাথে দিয়ে তা'রে স্তনমানুষ করেছে যত্নে,—সেই হ’তে ছেলেমাসীর আদরে আছে মা'র কোল ফেলে।দুরন্ত মানে না কারে, করিলে শাসনমাসী আসি অশ্রুজলে ভরিয়া নয়নকোলে তা’রে টেনে লয়। সে থাকিবে সুখেমা’র চেয়ে আপনার মাসীমার বুকে।

সম্মত হইল বিপ্র। মােক্ষদা সত্বরপ্রস্তুত হইল-বাঁধি জিনিষপত্তর,প্রণমিয়া গুরুজনে,—সখীদলবলেভাসাইয়া বিদায়ের শােকঅশ্রুজলে।ঘাটে আসি দেখে, সেথা আগেভাগে ছুটিরাখাল বসিয়া আছে তরী পরে উঠি'নিশ্চিন্ত নীরবে। “তুই হেথা কেন ওরে?”মা শুধাল,—সে কহিল, “যাইব সাগরে।”“যাইবি সাগরে, আরে, ওরে দস্যু ছেলে,নেমে আয়!”—পুনরায় দৃঢ় চক্ষু মেলে'সে কহিল দুটি কথা—“যাইব সাগরে।”যত তা’র বাহু ধরি টানাটানি করে

রহিল সে তরণী আঁকড়ি। অবশেষেব্রাহ্মণ করুণ স্নেহে কহিলেন হেসে“থাক্ থাক্‌ সঙ্গে যা।” মা রাগিয়া বলে“চল্ তােরে দিয়ে আসি সাগরের জলে।”যেমনি সে কথা গেল আপনার কানেঅমনি মায়ের বক্ষে অনুতাপবাণেবিঁধিয়া কাঁদিয়া উঠে। মুদিয়া নয়ন“নারায়ণ নারায়ণ” করিল স্মরণ।পুত্রে নিল কোলে তুলি,—তা’র সর্ব্বদেহেকরুণ কল্যাণ হস্ত বুলাইল স্নেহে।মৈত্র তা'রে ডাকি ধীরে চুপি চুপি কয়“ছি ছি ছি, এমন কথা বলিবার নয়।”

রাখাল যাইবে সাথে স্থির হ’ল কথা,—অন্নদা লােকের মুখে শুনি সে বারতা,ছুটে আসি বলে “বাছা, কোথা যাবি ওরে?”রাখাল কহিল হাসি “চলিনু সাগরে,আবার ফিরিব মাসী।” পাগলের প্রায়অনুদা কহিল ডাকি “ঠাকুর মশায়,বড় যে দুরন্ত ছেলে রাখাল আমার,—

কে তাহারে সামালিবে? জন্ম হ'তে তা'রমাসী ছেড়ে বেশিক্ষণ থাকেনি কোথাও,কোথা এরে নিয়ে যাবে? ফিরে দিয়ে যাও।'রাখাল কহিল-“মাসী যাইব সাগরেআবার ফিরিব আমি।” বিপ্র স্নেহস্বরেকহিলেন—“যতক্ষণ আমি আছি ভাই,তােমার রাখাল লাগি কোনাে ভয় নাই।এখন শীতের দিন শান্ত নদীনদ,অনেক যাত্রীর মেলা,—পথের বিপদকিছু নাই,—যাতায়াতে মাস দুই কাল,—তােমারে ফিয়ায়ে দিব তােমার রাখাল।”

শুভক্ষণে দুর্গা স্মরি’ নৌকা দিল ছাড়ি।দাঁড়ায়ে রহিল ঘাটে যত কুলনারীঅশ্রুচোখে। হেমন্তের প্রভাত-শিশিরেছল ছল করে গ্রাম চূর্ণী নদীতীরে।

যাত্রীদল ফিরে আসে; সাঙ্গ হ’ল মেলা।তরণী তীরেতে বাঁধা অপরাহ্ণ বেলাজোয়ারের আশে। কৌতূহল অবসান,কাঁদিতেছে রাখালের গৃহগত প্রাণ

মাসীর কোলের লাগি।—জল শুধু জলদেখে দেখে চিত্ত তা'র হয়েছে বিকল।মসৃণ চিক্কণ কৃষ্ণ কুটিল নিষ্ঠুর,লােলুপ লেলিহজিহব সর্পসম ক্রূরখল জল ছলভরা, তুলি লক্ষ ফণাফুঁসিছে গর্জ্জিছে, নিত্য করিছে কামনামৃত্তিকার শিশুদের, লালায়িত মুখ।হে মাটি, হে স্নেহময়ী, অয়ি মৌনমুক,অয়ি স্থির, অয়ি ধ্রুব, অয়ি পুরাতন,সর্ব্ব-উপদ্রবসহা আনন্দভবনশ্যামল কোমলা, যেথা যে কেহই থাকেঅদৃশ্য দুবাহু মেলি টানিছ তাহাকেঅহরহ, অয়ি মুগ্ধে, কি বিপুল টানেদিগন্ত বিস্তৃত তব শান্ত বক্ষপানে।চঞ্চল বালক আসি প্রতি ক্ষণে ক্ষণেঅধীর উৎসুককণ্ঠে শুধায় ব্রাহ্মণে“ঠাকুর, কখন্ আজি আসিবে জোয়ার?”সহসা স্তিমিত জলে আবেগ সঞ্চারদুই কূল চেতাইল আশার সংবাদে।ফিরিল তরীর মুখ; মৃদু আর্ত্তনাদেকাছিতে পড়িল টান,—কলশব্দগীতেসিন্ধুর বিজয়রথ পশিল নদীতে,—

আসিল জোয়ার।—মাঝি দেবতারে স্মরিত্বরিত উত্তরমুখে খুলে দিল তরী।রাখাল শুধায় আসি ব্রাহ্মণের কাছে“দেশে পঁহুছিতে আর কতদিন আছে?”

সূর্য অস্ত না যাইতে, ক্রোশ দুই ছেড়েউত্তর বায়ুর বেগ ক্রমে উঠে বেড়ে।রূপনারাণের মুখে পড়ি বালুচরসঙ্কীর্ণ নদীর পথে বাধিল সমরজোয়ারের স্রোতে আর উত্তরসমীরেউত্তাল উদ্দাম। তরণী ভিড়াও তীরেউচ্চকণ্ঠে বারম্বার কহে যাত্রীদল।কোথা তীর? চারিদিকে ক্ষিপ্তোন্মত্তজলআপনার রুদ্রনৃত্যে দেয় করতালিলক্ষ লক্ষ হাতে। দিগন্তরে যায় দেখাঅতি দূর তীরপ্রান্তে নীল বনরেখা;—অন্য দিকে লুব্ধ ক্ষুব্ধ হিংস্র বারিরাশিপ্রশান্ত সূর্যাস্ত পানে উঠিছে উচ্ছ্বাসিউদ্ধত বিদ্রোহভরে। নাহি মানে হাল,ঘুরে টলমল তরী অশান্ত মাতাল

মূঢ়সম। তীব্র শীতপবনের সনেমিশিয়া ত্রাসের হিম নরনারীগণেকাঁপাইছে থরহরি। কেহ হতবাক,কেহ বা ক্রন্দন করে ছাড়ি ঊর্দ্ধডাক,ডাকি আত্মজনে। মৈত্র শুষ্ক পাংশুমুখেচক্ষু মুদি’ করে জপ। জননীর বুকেরাখাল লুকায়ে মুখ কাঁপিছে নীরবে।তখন বিপন্ন মাঝি ডাকি কহে সবে-“বাবারে দিয়েছে ফাঁকি তােমাদের কেউ,যা মেনেছে দেয় নাই তাই এত ঢেউ,অসময়ে এ তুফান। শুন এই বেলা,করহ মান রক্ষা -করিয়াে না খেলা,ক্রুদ্ধ দেবতার সনে।”—যার যত ছিলঅর্থ বস্ত্র যাহা কিছু জলে ফেলি দিলনা করি বিচার। তবু তখনি পলকেতরীতে উঠিল জল দারুণ ঝলকে।মাঝি কহে পুনর্ব্বার—“দেবতার ধনকে যায় ফিরায়ে ল’য়ে এই বেলা শোন্।”ব্রাহ্মণ সহসা উঠি কহিলা তখনিমােক্ষদারে লক্ষ্য করি—“এই সে রমণীদেবতারে সঁপি দিয়া আপনার ছেলেচুরি করে' নিয়ে যায়।”-“দাও তা’রে ফেলে”

একবাক্যে গর্জ্জি উঠে তরাসে নিষ্ঠুরযাত্রী সবে। কহে নারী “হে দাদাঠাকুররক্ষা কর, রক্ষা কর।” দুই দৃঢ় করেরাখালেরে প্রাণপণে বক্ষে চাপি ধরে।

ভৎসিয়া গর্জ্জিয়া উঠি কহিলা ব্রাহ্মণ“আমি তাের রক্ষাকর্ত্তা? রোষে নিশ্চেতনমা হ'য়ে আপন পুত্র দিলি দেবতারে,শেষকালে আমি রক্ষা করিব তাহারে?শােধ দেবতার ঋণ। সত্য ভঙ্গ করে’এতগুলি প্রাণী তুই ভুবাবি সাগরে?”

মােক্ষদা কহিল “অতি মূর্খ নারী আমি,কি বলেছি রােষবশে,—ওগাে অন্তর্যামীসেই সত্য হ’ল? সে যে মিথ্যা কতদূরতখনি শুনে কি তুমি বােঝনি ঠাকুর?শুধু কি মুখের বাক্য শুনেছ দেবতা?শােননি কি জননীর অন্তরের কথা?”বলিতে বলিতে যত মিলি মাঝি দাঁড়িবল করি রাখালেরে নিল ছিঁড়ি কাড়িমা’র বক্ষ হ'তে। মৈত্র মুদি দুই আঁখিফিরায়ে রহিল মুখ কানে হাত ঢাকি,দন্তে দন্ত চাপি বলে। কে তাঁরে সহসা

মর্ম্মে মর্ম্মে আঘাতিল বিদ্যুতের কশা,দংশিল বৃশ্চিকদংশ।–“মাসী, মাসী, মাসী”বিন্ধিল বহ্নির শলা রুদ্ধ কর্ণে আসিনিরুপায় অনাথের অন্তিমের ডাক।চীৎকারি উঠিল বিপ্র—“রাখ, রাখ, রাখ!”চকিতে হেরিলা চাহি মূর্চ্ছি আছে পড়ে’মােক্ষদা চরণে তাঁর।—মুহূর্ত্তের তরেফুটন্ত তরঙ্গ মাঝে মেলি আর্ত্ত চোখমাসী বলি ফুকারিয়া মিলাল বালকঅনন্ত তিমির-তলে;—শুধু ক্ষীণ মুঠিবারেক ব্যাকুলবলে উৰ্দ্ধপানে উঠিআকাশে আশ্রয় খুঁজি ডুবিল হতাশে।“ফিরায়ে আনিব তােরে” কহি ঊর্ধ্বশ্বাসেব্রাহ্মণ মুহূর্ত্তমাঝে ঝাঁপ দিল জলে।আর উঠিল না। সূর্য গেল অস্তাচলে।—

Comments

Loading comments…