চিত্রাঙ্গদা
কাব্যগ্রন্থ
চিত্রাঙ্গদাতুমি পঞ্চশর?
মদনআমি সেই মনসিজ,নিখিলের নরনারী হিয়া টেনে আনিবেদনা বন্ধনে।
চিত্রাঙ্গদাকি বেদনা কি বন্ধনজানে তাহা দাসী। প্রণমি তোমার পদেপ্রভু, তুমি কোন্ দেব?
চক্ষের নিমেষে। শুধু ক্ষণেকের তরেচাহিল আমার মুখপানে,—রােষদৃষ্টিপলকে মিলায়ে গেল; গুপ্ত কৌতুকেরমৃদুহাস্যরেখা নাচিল অধরপ্রান্তে,বুঝি সে বালক-মূর্তি হেরিয়া আমার।শিখে’ পুরুষের বিদ্যা, পরে’ পুরুষেরবেশ, পুরুষের সাথে থেকে, এতদিনভুলে ছিনু যাহা, সেই মুখে চেয়ে, সেইআপনাতে-আপনি-অটলমূর্তি হেরি,সেই মুহূর্তেই জানিলাম মনে, নারীআমি। সেই মুহূর্তেই প্রথম দেখিনুসম্মুখে পুরুষ মাের।
মদন
সে শিক্ষা আমারিসুলক্ষণে! আমিই চেতন করে' দিইএকদিন জীবনের শুভ পুণ্যক্ষণেনারীরে হইতে নারী, পুরুষে পুরুষ।কি ঘটিল পরে?
চিত্রাঙ্গদা
সভয় বিস্ময়কণ্ঠেশুধানু “কে তুমি?” শুনিনু উত্তর “আমিপার্থ, কুরুবংশধর।”
রহিনু দাঁড়ায়েচিত্রপ্রায়, ভুলে’ গেনু প্রণাম করিতে।এই পার্থ? আজন্মের বিস্ময় আমার?শুনেছিনু বটে, সত্য পালনের তরেদ্বাদশ বৎসর বনে বনে ব্রহ্মচর্য্যপালিছে অৰ্জ্জুন। এই সেই পার্থবীর!বাল্য-দুরাশায় কতদিন করিয়াছিমনে, পার্থকীর্ত্তি করিব নিস্প্রভ আমিনিজ ভুজবলে; সাধিব অব্যর্থ লক্ষ্য;পুরুষের ছদ্মবেশে মাগিব সংগ্রামতাঁর সাথে, বীরত্বের দিব পরিচয়।হারে মুগ্ধে, কোথায় চলিয়া গেল সেইস্পর্দ্ধা তাের! যে ভূমিতে আছেন দাঁড়ায়েসে ভূমির তৃণদল হইতাম যদি,শৌর্য্যবীর্য্য যাহা কিছু ধূলায় মিলায়েদিয়ে, লভিতাম দুর্লভ মরণ, সেইচরণের তলে!-
কি ভাবিতেছিনু, মনেনাই। দেখিনু চাহিয়া, ধীরে চলি’ গেলাবীর বন-অন্তরালে। উঠিনু চমকি;সেইক্ষণে জন্মিল চেতনা; আপনারেদিলাম ধিক্কার শতবার। ছি ছি মূঢ়ে,
না করিলি সম্ভাষণ, না শুধালি কথা,না চাহিলি ক্ষমা ভিক্ষা,—বর্ব্বরের মতরহিলি দাঁড়ায়ে—হেলা করি’ চলি’ গেলাবীর। বাঁচিতাম, সে মুহূর্তে মরিতামযদি।—
পরদিন প্রাতে দূরে ফেলে দিনুপুরুষের বেশ। পরিলাম রক্তাম্বর,কঙ্কণ কিঙ্কিণী কাঞ্চি। অনভ্যস্ত সাজলজ্জায় জড়ায়ে অঙ্গ রহিল একান্তসসঙ্কোচে।
গােপনে গেলাম সেই বনে।অরণ্যের শিবালয়ে দেখিলাম তাঁরে।—
মদন
বলে' যাও বালা। মাের কাছে করিয়াে নালাজ। আমি মনসিজ; মানসেরসকল রহস্য জানি।
চিত্রাঙ্গদা
মনে নাই ভালাে,তা’র পরে কি কহিনু আমি, কি উত্তরশুনিলাম। আর শুধায়াে না, ভগবন্!মাথায় পড়িল ভেঙে লজ্জা বজ্ররূপেতবু মােরে পারিল না শতধা করিতে-
নারী হ'য়ে এমনি পুরুষপ্রাণ মাের!নাহি জানি কেমনে এলেম ঘরে ফিরে'দুঃস্বপ্নবিহ্বলসম। শেষ কথা তাঁরকর্ণে মাের বাজিতে লাগিল তপ্ত শূল-“ব্রহ্মচারীব্রতধারী আমি। পতিযােগ্যনহি বরাঙ্গনে।”
পুরুষের ব্রহ্মচর্য্য!ধিক্ মােরে, তাও আমি নারিনু টলাতে।তুমি জান, মীনকেতু, কত ঋষি মুনিকরিয়াছে বিসৰ্জ্জন নারীপদতলেচিরার্জ্জিত তপস্যার ফল। ক্ষত্রিয়েরব্রহ্মচর্য্য!–গৃহে গিয়ে ভাঙিয়ে ফেলিনুধনুঃশর যাহা কিছু ছিল; -কিণাঙ্কিতএ কঠিন করতল—ছিল যা’ গর্ব্বেরধন এতকাল—লাঞ্ছনা করিনু তা'রেনিষ্ফল আক্রোশভরে। এতদিন পরেবুঝিলাম, নারী হ'য়ে পুরুষের মনযদি জিনিতে পারি বৃথা বিদ্যা যত।অবলার কোমল মৃণাল বাহুদুটিএ বাহুর চেয়ে ধরে শতগুণ বল।ধন্য সেই মুগ্ধ মূর্খ ক্ষীণ-তনুলতাপরাবলম্বিতা, লজ্জাভয়ে লীনাঙ্গিনী
সামান্য ললনা, যার ত্রস্ত নেত্রপাতেমানে পরাভব বীর্য্যবল, তপস্যারতেজ!—হে অনঙ্গদেব, সব দম্ভ মােরএকদণ্ডে লয়েছ ছিনিয়া—সব বিদ্যাসব বল করেছ তােমার পদানত।এখন তােমার বিদ্যা শিখাও আমায়,দাও মােরে অবলার বল, নিরস্ত্রেরঅস্ত্র যত।
মদন
আমি হ’ব সহায় তােমার।অয়ি শুভে, বিশ্বজয়ী অর্জ্জুনে করিয়াজয়, বন্দী করি’ আনিব সম্মুখে তব।রাজ্ঞী হ’য়ে দিয়ে তা'রে দণ্ড পুরস্কারযথা ইচ্ছা! বিদ্রোহীরে করিয়াে শাসন।
চিত্রাঙ্গদা
সময় থাকিত যদি একাকিনী আমিতিলে তিলে হৃদয় তাঁহার করিতামঅধিকার, নাহি চাহিতাম দেবতারসহায়তা। সঙ্গীরূপে থাকিতাম সাথে,রণক্ষেত্রে হতেম সারথি, মৃগয়াতেরহিতাম অনুচর, শিবিরের দ্বারেজাগিতাম রাত্রির প্রহরী, ভৃত্যরূপে
করিতাম সেবা, ক্ষত্রিয়ের আর্ত্তত্রাণ-মহাব্রতে হইতাম সহায় তাঁহার।একদিন কৌতূহলে দেখিতেন চাহি,ভাবিতেন মনে মনে “এ কোন্ বালক,পূর্ব্বজনমের কোন্ চিরদাস, সঙ্গলইয়াছে এ জনমে সুকৃতির মত।”ক্রমে খুলিতাম তাঁর হৃদয়ের দ্বার,চিরস্থান লভিতাম সেথা। জানি আমিএ প্রেম আমার শুধু ক্রন্দনের নহে;যে নারী নির্ব্বাক্ ধৈর্য্যে চিরমর্ম্মব্যথানিশীথনয়নজলে করয়ে পালন,দিবালােকে ঢেকে রাখে ম্লান হাসিতলে,আজন্মবিধবা, আমি সে রমণী নহি;আমার কামনা কভু না নিস্ফল হবে!আপনারে একবার দেখাইতে পারিযদি, নিশ্চয় সে দিবে ধরা। হায় বিধি,সেদিন কি দেখেছিল! সরমে কুঞ্চিতএক শঙ্কিত কম্পিত নারী, আত্মহারাপ্রলাপবাদিনী। কিন্তু আমি যথার্থ কিতাই? যেমন সহস্র নারী পথে গৃহেচারিদিকে, শুধু ক্রন্দনের অধিকারী,তা'র চেয়ে বেশি নই আমি? কিন্তু হায়
আপনার পরিচয় দেওয়া, বহু ধৈর্য্যেবহুদিনে ঘটে, চিরজীবনের কাজ,জন্মজন্মান্তের ব্রত। তাই আসিয়াছিদ্বারে তােমাদের, করেছি কঠোর তপ।হে ভুবনজয়ী দেব, হে মহাসুন্দরঋতুরাজ, শুধু এক দিবসের তরেঘুচাইয়া দাও, জন্মদাতা বিধাতারবিনাদোষে অভিশাপ, নারীর কুরূপ।কর মােরে অপূর্ব্ব সুন্দরী। দাও মােরেসেই এক দিন—তা’র পরে চির দিনরহিল আমার হাতে।—যখন প্রথমতা'রে দেখিলাম, যেন মুহূর্তের মাঝেঅনন্ত বসন্ত পশিল হৃদয়ে। বড়ইচ্ছা হয়েছিল, সে যৌবন-সমীরণেসমস্ত শরীর যদি দেখিতে দেখিতেঅপূর্ব্ব পুলকভরে উঠে প্রস্ফুটিয়ালক্ষীর চরণশায়ী পদ্মের মতন।হে বসন্ত, হে বসন্তসখে! সে বাসনাপূরাও আমার শুধু দিনেকের তরে!
মদন
তথাস্তু!
বসন্ত
তথাস্তু। শুধু একদিন নহে,এক বর্ষ ধরি’ বসন্তের পুষ্পশােভাঘেরিয়া তােমার তনু রহিবে বিকশি'।
কাহারে হেরিনু? সে কি সত্য, কিম্বা মায়া?নিবিড় নির্জ্জন বনে নির্ম্মল সরসী;—এমনি নিভৃত নিরালয়, মনে হয়নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে সেথা বনলক্ষীগণস্নান করে’ যায়; গভীর পূর্ণিমারাত্রে,সেই সুপ্ত সরসীর স্নিগ্ধ শস্পতটেশয়ন করেন সুখে নিঃশঙ্ক বিশ্রামেঙ্খলিত অঞ্চলে।
সেথা বনঅন্তরালেঅপরাহ্ন বেলা, ভাবিতেছিলাম কতআশৈশব জীবনের কথা; সংসারেরমূঢ় খেলা দুঃখ সুখ উলটি পালটি;জীবনের অসন্তোষ; অসম্পূর্ণ আশাঅনন্ত দারিদ্র এই মর্ত্ত্য মানবের।হেন কালে ঘনতরু অন্ধকার হ'তেধীরে ধীরে বাহিরিয়া, কে আসি দাঁড়াল,
সরােবর-সােপানের শ্বেত শিলাপটে।কি অপূর্ব্ব রূপ! কোমল চরণতলেধরাতল কেমনে নিশ্চল হ'য়ে ছিল?ঊষার কনক মেঘ, দেখিতে দেখিতেযেমন মিলায়ে যায়, পূর্ব্ব পর্ব্বতেরশুভ্র শিরে অকলঙ্ক নগ্ন শােভা করি’বিকাশিত, তেমনি বসনখানি তা'রঅঙ্গের লাবণ্যে মিলাতে চাহিতেছিলমহাসুখে। নামি’ ধীরে সরােবরতীরেকৌতূহলে দেখিল সে নিজ মুখচ্ছায়া;উঠিল চমকি’। ক্ষণপরে মৃদু হাসি’হেলাইয়া বাম বাহুখানি, হেলাভরেএলাইয়া দিল কেশপাশ; মুক্তকেশপড়িল বিহ্বল হয়ে চরণের কাছে।অঞ্চল খসায়ে দিয়ে হেরিল আপনঅনিন্দিত বাহুখানি—পরশের রসেকোমল কাতর, প্রেমের করুণামাখা।নিরখিলা নত করি’ শির, পরিস্ফুটদেহতটে যৌবনের উন্মুখ বিকাশ।দেখিলা চাহিয়া নব গৌরতনুতলেআরক্তিম আলজ্জ আভাস; সরােবরেপা দুখানি ডুবাইয়া দেখিলা আপন
চরণের আভা।—বিস্ময়ের নাই সীমা।সেই যেন প্রথম দেখিল আপনারে।শ্বেত শতদল যেন কোরক বয়সযাপিল নয়ন মুদি’,—যেদিন প্রভাতেপ্রথম লভিল পূর্ণ শােভা, সেইদিনহেলাইয়া গ্রীবা, নীল সরােবরজলেপ্রথম হেরিল আপনারে, সারাদিনরহিল চাহিয়া সবিস্ময়ে। ক্ষণপরে,কি জানি কি দুখে, হাসি মিলাইল মুখে,ম্লান হ’ল দুটি আঁখি; বাঁধিয়া তুলিলকেশপাশ; অঞ্চলে ঢাকিল দেহখানি;নিশ্বাস ফেলিয়া, ধীরে ধীরে চলে' গেল;সােনার সায়াহ্ন যথা ম্লান মুখ করি’আঁধার রজনীপানে ধায় মৃদুপদে।
ভাবিলাম মনে, ধরণী দেখায়ে দিলঐশ্বর্য্য আপন। কামনার সম্পূর্ণতাক্ষণতরে দেখা দিয়ে গেল।—ভাবিলামকত যুদ্ধ, কত হিংসা, কত আড়ম্বর,পুরুষের পৌরুষগৌরব, বীরত্বেরনিত্য কীর্ত্তিতৃষা, শান্ত হ'য়ে লুটাইয়া
পড়ে ভূমে, ওই পূর্ণ সৌন্দর্য্যের কাছে;পশুরাজ সিংহ যথা সিংহবাহিনীরভুবনবাঞ্ছিত অরুণ-চরণতলে।আর একবার যদি -কে দুয়ার ঠেলে!
( দ্বার খুলিয়া )
এ কি! সেই মূর্তি! শান্ত হও হে হৃদয়কোনাে ভয় নাই মােরে বরাননে! আমিক্ষত্রকুলজাত, ভয়ভীত দুর্ব্বলেরভয়হারী।
চিত্রাঙ্গদা
আর্য্য, তুমি অতিথি আমার।এ মন্দির আমার আশ্রম। নাহি জানিকেমনে করিব অভ্যর্থনা, কি সৎকারেতােমারে তুষিব আমি।
অর্জ্জুন
অতিথিসৎকারতব দরশনে, হে সুন্দরি! শিষ্টবাক্যসমূহ সৌভাগ্য মাের। যদি নাহি লহঅপরাধ, প্রশ্ন এক শুধাইতে চাহি,চিত্ত মাের কুতূহলী।
চিত্রাঙ্গদা
শুধাও নির্ভয়ে।
অর্জ্জুন
শুচিস্মিতে, কোন্ সুকঠোর ব্রত লাগি'হেন রূপরাশি জনহীন দেবালয়েহেলায় দিতেছ বিসর্জ্জন, হতভাগ্যমর্ত্ত্যজনে করিয়া বঞ্চিত।
চিত্রাঙ্গদা
গুপ্ত এককামনা সাধনাতরে, এক মনে করিশিবপূজা।
অর্জ্জুন
হায়, কারে করিছে কামনাজগতের কামনার ধন।—সুদর্শনে,উদয়শিখর হ’তে অস্তাচলভূমিভ্রমণ করেছি আমি; সপ্তদ্বীপ মাঝেযেখানে যা কিছু আছে দুর্লভ সুন্দর,অচিন্ত্য মহান, সকলি দেখেছি চোখে;কি চাও, কাহারে চাও, যদি বল মোরেমাের কাছে পাইবে বারতা।
চিত্রাঙ্গদা
ত্রিভুবনেপরিচিত তিনি, আমি যারে চাহি।
অর্জ্জুন
নর কে আছে ধরায়! কার যশােরাশিঅমরকাঙিক্ষত তব মনোেরাজ্যমাঝেকরিয়াছে অধিকার দুর্লভ আসন।কহ নাম তা'র, শুনিয়া কৃতার্থ হই।
চিত্রাঙ্গদা
জন্ম তাঁর সর্ব্বশ্রেষ্ঠ নরপতিকূলে,সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বীর।
অর্জ্জুন
মিথ্যা খ্যাতি বেড়ে ওঠেমুখে মুখে কথায় কথায়; ক্ষণস্থায়ীবাষ্প যথা ঊষারে ছলনা করে’ ঢাকেযতক্ষণ সূর্য নাহি ওঠে। হে সরলে,মিথ্যারে কোরাে না উপাসনা, এ দুর্লভসৌন্দর্যসম্পদে। কহ শুনি সর্ব্বশ্রেষ্ঠকোন্ বীর, ধরণীর সর্ব্বশ্রেষ্ঠ কুলে।
চিত্রাঙ্গদা
পরকীর্ত্তি-অসহিষ্ণু কে তুমি সন্যাসি!কে না জানে এ ভুবনে কুরুবংশ সর্বব-রাজবংশচূড়া।
অর্জ্জুন
কুরুবংশ!
চিত্রাঙ্গদা
সেই বংশেকে আছে অক্ষয়যশ বীরেন্দ্রকেশরীনাম শুনিয়াছ?
অর্জ্জুন
বল, শুনি তব মুখে।
চিত্রাঙ্গদা
অর্জ্জুন, গাণ্ডীবধনু, ভুবনবিজয়ী।সে অক্ষয় নাম, সমস্ত জগৎ হ'তেকরিয়া লুণ্ঠন, লুকায়ে রেখেছি যত্নেকুমারী-হৃদয় পূর্ণ করি। ব্রহ্মচারি,কেন এ অধৈর্য তব?
তবে মিথ্যা এ কিমিথ্যা সে অৰ্জ্জুন নাম? কহ এই বেলামিথ্যা যদি হয় তবে হৃদয় ভাঙিয়াছেড়ে দিই তা'রে, বেড়াক সে উড়ে উড়েমুখে মুখে বাতাসে বাতাসে, তা'র স্থাননহে নারীর অন্তরাসনে।
অর্জ্জুন
বরাঙ্গনে,সে অৰ্জ্জুন, সে পাণ্ডব, সে গাণ্ডীবধনু,সেই ভাগ্যবান চরণে শরণাগত।নাম তা'র, খ্যাতি তা'র, বীর্য তা’র, মিথ্যাহােক সত্য হােক, যে দেবদুর্লভ লোকেকরেছ তাহারে স্থান দান, সেথা হ'তেআর তা'রে কোরাে না বিচ্যুত, ক্ষীণপুণ্যহৃতস্বর্গ হতভাগ্যসম।
চিত্রাঙ্গদা
তুমি পার্থ?আমি পার্থ, দেবি, তােমার হৃদয়দ্বারেপ্রেমার্ত্ত অতিথি।
চিত্রাঙ্গদা
শুনেছিনু ব্রহ্মচর্য্যপালিছে অৰ্জ্জুন দ্বাদশবরষব্যাপী।সেই বীর কামিনীরে করিছে কামনাব্রত ভঙ্গ করি’! হে সন্ন্যাসি, তুমি পার্থ?
অর্জ্জুন
তুমি ভাঙিয়াছ ব্রত মাের। চন্দ্র উঠি'যেমন নিমেষে ভেঙে দেয় নিশীথেরযােগনিদ্রা-অন্ধকার।
চিত্রাঙ্গদা
ধিক্, পার্থ, ধিক্!কে আমি, কি আছে মোর, কি দেখেছ তুমি,কি জান আমারে। কার লাগি আপনারেহতেছ বিস্মৃত। মুহূর্ত্তেকে সত্য ভঙ্গকরি’, অৰ্জ্জুনেরে করিতেছ অনৰ্জ্জুনকার তরে? মাের তরে নহে। এই দুটিনীলােৎপল নয়নের তরে; এই দুটিনবনীনিন্দিত বাহুপাশে সব্যসাচীঅর্জ্জুন দিয়াছে ধরা দুই হস্তে ছিন্নকরে' ফেলে’ সত্যের বন্ধন। কোথা গেলপ্রেমের মর্যাদা? কোথায় রহিল পড়ে'নারীর সম্মান? হায়, আমারে করিলঅতিক্রম আমার এ তুচ্ছ দেহখানা,মৃত্যুহীন অন্তরের এই ছদ্মবেশক্ষণস্থায়ী। এতক্ষণে পারিনু জানিতেমিথ্যা খ্যাতি, বীরত্ব তােমার।
অর্জ্জুন
খ্যাতি মিথ্যা,বীর্য্য মিথ্যা আজ বুঝিয়াছি। আজ মােরেসপ্তলােক স্বপ্ন মনে হয়।শুধু একাপূর্ণ তুমি সর্ব্ব তুমি, বিশ্বের ঐশ্বর্য্যতুমি, এক নারী সকল দৈন্যের তুমিমহা অবসান, সকল কর্মের তুমিবিশ্রামরূপিণী। কেন জানি অকস্মাৎতােমারে হেরিয়া—বুঝিতে পেরেছি আমিকি আনন্দকিরণেতে প্রথম প্রত্যুষেঅন্ধকার মহার্ণবে সৃষ্টিশতদলদিগ্বিদিকে উঠেছিল উন্মােষিত হ'য়েএক মুহূর্তের মাঝে। আর সকলেরপলে পলে তিলে তিলে তবে জানা যায়বহুদিনে;—তােমাপানে যেমনি চেয়েছিঅমনি সমস্ত তব পেয়েছি দেখিতেতবু পাই নাই শেষ। -কৈলাসশিখরেএকদা মৃগয়াশ্রান্ত তৃষিত তাপিতগিয়েছিনু দ্বিপ্রহরে কুসুমবিচিত্রমানসের তীরে। যেমনি দেখিনু চেয়েসেই সুর-সরসীর সলিলের পানেঅমনি পড়িল চোখে অনন্ত অতল।
স্বচ্ছ জল, যত নিম্নে চাই। মধ্যাহ্নেররবিরশ্মিরেখাগুলি স্বর্ণনলিনীরসুবর্ণ মৃণাল সাথে মিশি’ নেমে গেছেঅগাধ অসীমে কাঁপিতেছে; আঁকিবাঁকিজলের হিল্লোলে, লক্ষকোটি অগ্নিময়ীনাগিনীর মত। মনে হ’ল ভগবানসূর্য্যদেব সহস্র অঙ্গুলি নির্দ্দেশিয়াদিলেন দেখায়ে, জন্মশ্রান্ত কর্ম্মক্লান্তমর্ত্ত্যজনে, কোথা আছে সুন্দর মরণঅনন্ত শীতল। সেই স্বচ্ছ অতলতাদেখেছি তােমার মাঝে। চারিদিক হতেদেবের অঙ্গুলি যেন দেখায়ে দিতেছেমােরে, ওই তব অলােক আলােকমাঝেকীর্ত্তিক্লিষ্ট জীবনের পূর্ণনির্ব্বাপন।
চিত্রাঙ্গদা
আমি নহি, আমি নহি, হায়, পার্থ, হায়কোন্ দেবের ছলনা! যাও যাও ফিরেযাও, ফিরে যাও বীর! মিথ্যারে কোরাে নাউপাসনা। শৌর্য্য বীর্য্য মহত্ত্ব তােমারদিয়াে না মিথ্যার পদে। যাও, ফিরে যাও!
হায়, হায়, সে কি ফিরাইতে পারি! সেইথরথর ব্যাকুলতা বীর হৃদয়ের,তৃষ্ণার্ত্ত কম্পিত এক স্ফুলিঙ্গনিশ্বাসীহােমাগ্নিশিখার মত; সেই, নয়নেরদৃষ্টি যেন অন্তরের বাহু হ'য়ে, কেড়েনিতে আসিছে আমায়; উত্তপ্ত হৃদয়ছুটিয়া আসিতে চাহে সর্ব্বাঙ্গ টুটিয়া,তাহার ক্রন্দনধ্বনি প্রতিঅঙ্গে শুনাযায় যেন! এ তৃষ্ণা কি ফিরাইতে পারি?
(বসন্ত ও মদনের প্রবেশ)
হে অনঙ্গদেব, এ কি রূপ-হুতাশনেঘিরেছ আমারে, দগ্ধ হই, দগ্ধ করে’মারি।
মদন
বল, তম্বি, কালিকার বিবরণ।মুক্ত পুষ্পশর মাের কোথা কি সাধিলকাজ শুনিতে বাসনা।
চিত্রাঙ্গদা
কাল সন্ধ্যাবেলা,সরসীর তৃণপুঞ্জ তীরে, পেতেছিনুপুষ্পশয্যা, বসন্তের ঝরা ফুল দিয়ে।শ্রান্ত কলেবরে, শুয়েছিনু আপনারমনে, বাম বাহুপরে রাখিয়া অলসশির; ভাবিতেছিলাম দিবসের কথা,শুনেছিনু যেই স্তুতি অর্জ্জুনের মুখেস্মরিতেছিলাম তা'র প্রতি ক্ষুদ্র কথাএকাকিনী শুয়ে শুয়ে; পূর্ণ দিবসেরসঞ্চিত অমৃত হ’তে বিন্দু বিন্দু ল'য়েকরিতেছিলাম পান; ভুলিতেছিলামপূর্ব ইতিহাস, গতজন্মকথাসম;যেন আমি রাজকন্যা নহি; যেন মােরনাই পূর্ব্বপর; যেন আমি ধরাতলেএকদিনে উঠেছি ফুটিয়া, অরণ্যেরপিতৃমাতৃহীন ফুল; একটি প্রভাতশুধু পরমায়ু, তারি মাঝে শুনে নিতেহবে—ভ্রমর গুঞ্জনগীতি, বনান্তেরআনন্দমর্ম্মর; তার পরে নীলাম্বরহ’তে নামাইয়া আঁখি, নুমাইয়া গ্রীবা,বায়ুস্পর্শভরে টুটিয়া লুটিয়া যাব
ক্রন্দনবিহীন, মাঝখানে ফুরাইবেকুসুমকাহিনীটুকু আদি অন্তহারা।
বসন্ত
একটি প্রভাতে ফুটে অনন্ত জীবন,হে সুন্দরি!
মদন
সঙ্গীতে যেমন, ক্ষণিকেরতানে, গুঞ্জরি কাঁদিয়া উঠে অন্তহীনকথা। তা'র পরে বল।
চিত্রাঙ্গদা
ভাবিতে ভাবিতেসর্ব্বাঙ্গে হানিতেছিল ঘুমের হিল্লোলদক্ষিণের বায়ু। সপ্তপর্ণশাখা হ'তেফুল্ল মালতীর লতা টুপটাপ করি’মাের গৌরতনুপরে পাঠাইতেছিলশত নিঃশব্দ চুম্বন; ফুলগুলি কেহচুলে, কেহ পদমূলে, কেহ স্তনতটেবিছাইল আপনার মরণশয়ন।অচেতনে গেল কতক্ষণ। হেনকালেজানি না কখন্ ঘুমঘােরে, অনুভব
হ’ল, যেন কার মুগ্ধ নয়নের দৃষ্টিদশ অঙ্গুলির মত পরশ করিছেরভস-লালসে মাের নিদ্রালস তনু।চমকি’ উঠিমু জাগি'।
দেখিনু, সন্ন্যাসীপদপ্রান্তে নির্ণিমেষ দাঁড়ায়ে রয়েছেস্থির প্রতিমূর্ত্তি সম। পূর্ব্বাচল হ'তেধীরে ধীরে সরে' এসে পশ্চিমে হেলিয়েদ্বাদশীর শশী সমস্ত হিমাংশুরাশিদিয়াছে ঢালিয়া, ঙ্খলিতবসন মােরঅম্লাননূতন শুভ্র সৌন্দর্য্যের পরে।পুষ্পগন্ধে পূর্ণ তরুতল; ঝিল্লিরবেতন্দ্রামগ্ন-নিশীথিনী; স্বচ্ছ সরােবরেঅকম্পিত চন্দ্রকরচ্ছায়া; সুপ্ত বায়ু;শিরে ল’য়ে জ্যোৎস্নলােকে মসৃণ চিক্কণরাশি রাশি অন্ধকার পল্লবের ভারস্তম্ভিত অটবী। সেই মত চিত্রার্পিতদাঁড়াইয়া দীর্ঘকায় বনস্পতিসম,দণ্ডধারী ব্রহ্মচারী ছায়াসহচর।প্রথম সে নিদ্রাভঙ্গে চারিদিক চেয়েমনে হ’ল, কবে কোন্ বিস্মৃত প্রদোষেজীবন ত্যজিয়া, স্বপ্নজন্ম করিয়াছি
লাভ, কোন্ এক অপরূপ নিদ্রালােকে,জনশূন্য ম্লানজ্যোৎস্না বৈতরণীতীরে।দাঁড়ানু উঠিয়া। মিথ্যা সরম সঙ্কোচখসিয়া পড়িল শ্লথ বসনের মতপদতলে। শুনিলাম, “প্রিয়ে, প্রিয়তমে!”গম্ভীর আহ্বানে, জন্ম জন্ম শত জন্মমোর, উঠিল জাগিয়া এক দেহ মাঝে।কহিলাম, “লহ, লহ, যাহা আছে, সবলহ জীবনবল্লভ।” দিলাম বাড়ায়ে,দুই বাহু।—চন্দ্র অস্ত গেল বনান্তরে,অন্ধকারে ঝাঁপিল মেদিনী। স্বর্গ মর্ত্ত্যদেশকাল দুঃখসুখ জীবন মরণঅচেতন হ'য়ে গেল অসহ্য পুলকে।প্রভাতের প্রথম কিরণে, বিহঙ্গেরপ্রথম সঙ্গীতে, বাম করে দিয়া ভরধীরে ধীরে উঠিয়া বসিনু শয্যাতলে।দেখিনু চাহিয়া, সুখসুপ্ত বীরবর।শ্রান্ত হাস্য লেগে আছে ওষ্ঠপ্রান্তে তাঁরপ্রভাতের চন্দ্রকলাসম, রজনীরআনন্দের শীর্ণ অবশেষ। নিপতিতউন্নত ললাট-পটে অরুণের আভা;মর্ত্ত্যলােকে যেন নব উদয়পর্ব্বতে
নবকীর্ত্তি-সূর্যোদয় পাইবে প্রকাশ।নিশ্বাস ফেলিয়া, উঠিনু শয়ন ছাড়ি';মালতীর লতাজাল দিলাম নামায়েসাবধানে, রবিকর করি' অন্তরালসুপ্তমুখ হ’তে। দেখিলাম চতুর্দ্দিকেসেই পূর্ব্বপরিচিত প্রাচীন পৃথিবী।আপনারে আরবার মনে পড়ে' গেল,ছুটিয়া পলায়ে এনু, নব প্রভাতেরশেফালি-বিকীর্ণ-তৃণ বনস্থলী দিয়ে,আপনার ছায়াত্রস্তা হরিণীর মত।বিজন বিতানতলে বসি’, করপুটেমুখ আবরিয়া, কাঁদিবারে চাহিলাম,এল না ক্রন্দন।
মদন
হায়, মানবনন্দিনি,স্বর্গের সুখের দিন স্বহস্তে ভাঙিয়াধরণীর একরাত্রি পূর্ণ করি’ তাহেযত্নে ধরিলাম তব অধরসম্মুখে;শচীর প্রসাদসুধা, রতির চুম্বিত,নন্দনবনের গন্ধে মােদিত-মধুর,তােমারে করানু পান, তবু এ ক্রন্দন!
চিত্রাঙ্গদা
কারে, দেব, করাইলে পান? কার তৃষামিটাইলে? সে চুম্বন, সে প্রেমসঙ্গমএখনাে উঠিছে কাঁপি যে অঙ্গ ব্যাপিয়াবীণার ঝঙ্কার সম, সে ত মাের নহে!বহুকাল সাধনায় এক দণ্ড শুধুপাওয়া যায় প্রথম মিলন, সে মিলনকে লইল লুটি’, আমারে বঞ্চিত করি।সে চিরদুর্লভ মিলনের সুখস্মৃতিসঙ্গে করে’ ঝরে' পড়ে যাবে, অতিস্ফুটপুস্পদলসম, এ মায়া-লাবণ্য মাের;অন্তরের দরিদ্র রমণী, রিক্তদেহেবসে' র'বে চিরদিনরাত। মীনকেতু,কোন্ মহারাক্ষসীরে দিয়াছ বাঁধিয়াঅঙ্গসহচরী করি’ ছায়ার মতন-কি অভিসম্পাত? চিরন্তন তৃষ্ণাতুরলােলুপ ওষ্ঠের কাছে আসিল চুম্বন,সে করিল পান। সেই প্রেমদৃষ্টিপাতএমনি আগ্রহপূর্ণ, যে অঙ্গেতে পড়েসেথা যেন অঙ্কিত করিয়া রেখে যায়বাসনার রাঙা চিহ্নরেখা, সেই দৃষ্টিরবিরশ্মিসম, চিররাত্রিতাপসিনী
কুমারীহৃদয়পদ্মপানে ছুটে এল,সে তাহারে লইল ভুলায়ে।
মদন
কল্য নিশিব্যর্থ গেছে তবে! শুধু, কূলের সম্মুখেএসে আশার তরণী গেছে ফিরে' ফিরে'তরঙ্গ-আঘাতে?
চিত্রাঙ্গদা
কাল রাত্রে কিছু নাহিমনে ছিল দেব! সুখস্বর্গ এত কাছেদিয়েছিল ধরা, পেয়েছি কি না পেয়েছিকরিনি গণনা আত্মবিস্মরণসুখে।আজ প্রাতে উঠে,' নৈরাশ্যধিক্কারবেগেঅন্তরে অন্তরে টুটিছে হৃদয়। মনেপড়িতেছে একে একে রজনীর কথা,বিদ্যুৎবেদনাসহ হতেছে চেতনাঅন্তরে বাহিরে মাের হয়েছে সতীন,আর তাহা নারিব ভুলিতে। সপত্নীরেস্বহস্তে সাজায়ে সযতনে প্রতিদিনপাঠাইতে হবে, আমার আকাঙ্ক্ষা-তীর্থবাসরশয্যায়; অবিশ্রাম সঙ্গে রহি’প্রতিক্ষণ দেখিতে হইবে চক্ষু মেলি’
তাহার আদর। ওগো, দেহের সােহগেঅন্তর জ্বলিবে হিংসানলে, হেন শাপনরলােকে কে পেয়েছে আর? হে অতনুবর তব ফিরে’ লও।
মদন
যদি ফিরে’ লই,—ছলনার আবরণ খুলে' ফেলে' দিয়েকাল প্রাতে কোন্ লাজে দাঁড়াইবে আসি’পার্থের সম্মুখে, কুসুমপল্লবহীনহেমন্তের হিমশীর্ণ লতা? প্রমােদেরপ্রথম আস্বাদটুকু দিয়ে, মুখ হ'তেসুধাপাত্র কেড়ে নিয়ে চূর্ণ করে' ফেলযদি ভূমিতলে, কি আঘাতে উঠিবে সেচমকিয়া, কি আক্রোশে হেরিবে তােমায়!
চিত্রাঙ্গদা
সেও ভালো দেব! এই ছদ্মরূপিণীরচেয়ে শ্রেষ্ঠ আমি শতগুণে। আপনারেকরিব প্রকাশ; ভালো যদি নাই লাগে,ঘৃণাভরে চলে' যান যদি, বুক ফেটেমরি যদি আমি, তবু আমি, আমি র'বসেও ভালো ইন্দ্রসখা!
বসন্ত
শােন মাের কথা।ফুলের ফুরায় যবে ফুটিবার কাজতখন প্রকাশ পায় ফল। যথাকালেআপনি ঝরিয়া পড়ে' যাবে, তাপক্লিষ্টলঘু লাবণ্যের দল; আপন গৌরবেতখন বাহির হবে; হেরিয়া তােমারেনূতন সৌভাগ্য বলি’ মানিবে ফাল্গুনী।যাও, ফিরে' যাও, বৎসে, যৌবন-উৎসবে!
চিত্রাঙ্গদা
কি দেখিছ বীর!
অৰ্জ্জুন
দেখিতেছি পুষ্পবৃন্তধরি’, কোমল অঙ্গুলিগুলি রচিতেছেমালা; নিপুণতা চারুতায় দুই বােনেমিলি, খেলা করিতেছে যেন, সারাবেলাচঞ্চল উল্লাসে, অঙ্গুলির আগে আগে।দেখিতেছি, আর ভাবিতেছি।
চিত্রাঙ্গদা
কি ভাবিছ?
অৰ্জ্জুন
ভাবিতেছি অমনি সুন্দর করে' ধরে'সরসিয়া ওই রাঙা পরশের রসেপ্রবাস-দিবসগুলি গেঁথে গেঁথে প্রিয়েঅমনি রচিবে মালা; মাথায় পরিয়াঅক্ষয় আনন্দহার গৃহে ফিরে' যাব।
চিত্রাঙ্গদা
এ প্রেমের গৃহ আছে?
অর্জ্জুন
গৃহ নাই?
চিত্রাঙ্গদা
নাইগৃহে নিয়ে যাবে? বােলাে না গৃহের কথা।গৃহ চির বরষের; নিত্য যাহা থাকে তাইগৃহ নিয়ে যেয়াে। অরণ্যের ফুল যবেশুকাইবে, গৃহে কোথা ফেলে' দিবে তা'রে,অনাদরে পাষাণের মাঝে? তা'র চেয়েঅরণ্যের অন্তঃপুরে, নিত্য নিত্য যেথামরিছে অঙ্কুর, পড়িছে পল্লবরাশি,ঝরিছে কেশর, খসিছে কুসুমদল,ক্ষণিক জীবনগুলি ফুটিছে টুটিছেপ্রতি পলে পলে,—দিনান্তে আমার খেলাসাঙ্গ হ'লে ঝরিব সেথায়, কাননেরশত শত সমাপ্ত সুখের সাথে। কোনােখেদ রহিবে না কারাে মনে।
অর্জ্জুন
এই শুধু?
চিত্রাঙ্গদা
শুধু এই। আর কিছু নয়। বীরবরতাহে দুঃখ কেন! আলস্যের দিনে যাহা
ভালাে লাগে, আলস্যের দিনে তাহা শেষকরে' ফেল। সুখেরে রাখিলে ধরে’-বেঁধে'তা’র বেশি একদণ্ড কাল, দুঃখ হ'য়েওঠে। যাহা আছে তাই লও, যতক্ষণআছে ততক্ষণ রাখ। কামনার কালেযতটুকু চেয়েছিলে, তৃপ্তির সন্ধ্যায়তা’র বেশি আশা করিয়াে না।দিন গেল।এই মালা পর গলে। শ্রান্ত মাের তনুওই তব বাহুপরে টেনে লও বীর।সন্ধি হােক অধরের সুখ-সম্মিলনেক্ষান্ত করি’ মিথ্যা অসন্তোষ। বাহুবন্ধেএস বন্দী করি দোঁহে দোঁহা, প্রণয়েরসুধাময় চির-পরাজয়ে।
অর্জ্জুন
ওই শােনপ্রিয়তমে, বনান্তের দূর লােকালয়েআরতির শান্তিশঙ্খ উঠিল বাজিয়া।
মদন
আমি পঞ্চশর, সখা; এক শরে হাসি,অশ্রু এক শরে; এক শরে আশা, অন্যশরে ভয়; এক শরে বিরহ-মিলন-আশা-ভয়-দুঃখ-সুখ এক নিমিষেই।
বসন্ত
শ্রান্ত আমি, ক্ষান্ত দাও সখা! হে অনঙ্গ,সাঙ্গ কর রণরঙ্গ তব। রাত্রিদিনসচেতন থেকে, তব হুতাশনে আরকতকাল করিব ব্যজন। মাঝে মাঝেনিদ্রা আসে চোখে, নত হয়ে পড়ে পাখা,ভস্মে ম্লান হ'য়ে আসে তপ্তদীপ্তিরাশি।চমকিয়া জেগে, আবার নূতনশ্বাসেজাগাইয়া তুলি তা’র নব-উজ্জ্বলতা।এবার বিদায় দাও সখা!
মদন
জানি তুমিঅনন্ত অস্থির, চিরশিশু। নিত্য তুমিবন্ধনবিহীন হ'য়ে দ্যুলােকে ভূলােকে
করিতেছ খেলা। একান্ত যতনে যারেতুলিছ সুন্দর করি’ বহুকাল ধরে'নিমেষে যেতেছ তা'রে ফেলি’ ধূলিতলেপিছে না ফিরিয়া। আর বেশি দিন নাই;আনন্দচঞ্চল দিনগুলি, লঘুবেগে,তব পক্ষ-সমীরণে, হুহু করি’ কোথাযেতেছে উড়িয়া, চ্যুত পল্লবের মত।হর্ষঅচেতন বর্ষ শেষ হ'য়ে এল।
অৰ্জ্জুন
আমি যেন পাইয়াছি, প্রভাতে জাগিয়াঘুম হ’তে, স্বপ্নলব্ধ অমূল্য রতন।রাখিবার স্থান তা'র নাহি এ ধরারমৃত্তিকায়; ধরে' রাখে এমন কিরীটনাই, গেঁথে' রাখে হেন সূত্র নাই, ফেলে'যাই হেন নরাধম নহি; তা'রে ল'য়েচিররাত্রি চিরদিন ক্ষত্রিয়ের বাহুবন্ধ হ'য়ে পড়ে' আছে কর্ত্তব্যবিহীন।
( চিত্রাঙ্গদার প্রবেশ)
চিত্রাঙ্গদা
কি ভাবিছ?
অৰ্জ্জুন
ভাবিতেছি মৃগয়ার কথা।ওই দেখ বৃষ্টিধারা আসিয়াছে নেমেপর্ব্বতের পরে; অরণ্যেতে ঘনঘােরছায়া; নির্ঝরিণী উঠেছে দুরন্ত হ'য়ে,কলগর্ব্ব-উপহাসে তটের তর্জ্জনকরিতেছে অবহেলা; মনে পড়িতেছেএমনি বর্ষার দিনে, পঞ্চভ্রাতা মিলে
চিত্রক অরণ্যতলে যেতেম শিকারে।সারাদিন রৌদ্রহীন স্নিগ্ধ অন্ধকারেকাটিত উৎসাহে; গুরু গুরু মেঘমন্দ্রেনৃত্য করি’ উঠিত হৃদয়; ঝরঝরবৃষ্টিজলে, মুখর নির্ঝরকলোল্লাসেসাবধান পদশব্দ শুনিতে পেত নামৃগ; চিত্রব্যাঘ্র পঞ্চনখচিহ্নরেখারেখে যেত পথপঙ্কপরে, দিয়ে যেতআপনার গৃহের সন্ধান। কেকারবেধ্বনিত’ অরণ্যভূমি। শিকার সমাধাহ'লে পঞ্চসঙ্গী পণ করি’ সন্তরণেহইতাম পার, বর্ষার সৌভাগ্যগর্ব্বেস্ফীত তরঙ্গিণী। সেই মত বাহিরিবমৃগয়ায়, করিয়াছি মনে।
চিত্রাঙ্গদা
হে শিকারি,যে মৃগয়া আরম্ভ করেছ, আগে তাইহােক্ শেষ। তবে কি জেনেছ স্থিরএই স্বর্ণ মায়ামৃগ তােমারে দিয়েছেধরা? নহে, তাহা নহে। এ বন্য-হরিণীআপনি রাখিতে নারে আপনারে ধরি’!চকিতে ছুটিয়া যায় কে জানে কখন
স্বপনের মত। ক্ষণিকের খেলা সহে,চিরদিবসের পাশ বহিতে পারে না।ওই চেয়ে দেখ, যেমন করিছে খেলাবায়ুতে বৃষ্টিতে,—শ্যাম বর্ষা হানিতেছেনিমেষে সহস্র শর বায়ুপৃষ্ঠপরে,তবু সে দুরন্ত মৃগ মাতিয়া বেড়ায়অক্ষত অজেয়;—তােমাতে আমাতে, নাথ,সেই মত খেলা, আজি বরষার দিনে;—চঞ্চলারে করিবে শিকার প্রাণপণকরি’; যত শর, যত অস্ত্র আছে তূণেএকাগ্র আগ্রহভরে করিবে বর্ষণ।কভু অন্ধকার, কভু বা চকিত আলোচমকিয়া হাসিয়া মিলায়, কভু স্নিগ্ধবৃষ্টিবরিষণ, কভু দীপ্ত বজ্রজ্বালা।মায়ামৃগী ছুটিয়া বেড়ায়, মেঘাচ্ছন্নজগতের মাঝে, বাধাহীন চিরদিন।
চিত্রাঙ্গদা
হে মন্মথ, কি জানি কি দিয়েছ মাখায়েসর্ব্বদেহে মাের। তীব্র মদিরার মতরক্তসাথে মিশে’ উন্মাদ করেছে মােরে।আপনার গতিগর্ব্বে মত্ত মৃগী আমি,ধাইতেছি মুক্তকেশে, উচ্ছ্বসিত বেশেপৃথিবী লঙ্ঘিয়া। ধনুর্দ্ধর ঘনশ্যামব্যাধেরে আমার, করিয়াছি পরিশ্রান্তআশাহতপ্রায়, ফিরাতেছি পথে পথেবনে বনে তা’রে। নির্দয় বিজয়সুখেহাসিতেছি কৌতুকের হাসি। এ খেলায়ভঙ্গ দিতে হইতেছে ভয়, একদণ্ডস্থির হলে পাছে, ক্রন্দনে হৃদয় ভরেফেটে পড়ে যায়।
মদন
থাক! ভাঙিয়াে না খেলা।এ খেলা আমার। ছুটুক ফুটুক বাণ,টুটুক্ হৃদয়। আমার মৃগয়া আজিঅরণ্যের মাঝখানে নবীন বর্ষায়।দাও দাও শ্রান্ত করে' দাও; কর তা'রে
পদানত; বাঁধ তারে দৃঢ়পাশে; দয়াকরিয়াে না, হাসিতে জর্জ্জর করে' দাও,অমৃতে-বিষেতে-মাখা খর বাক্যবাণহান বুকে। শিকারে দয়ার বিধি নাই।
অৰ্জ্জুন
কোনাে গৃহ নাই তব প্রিয়ে, যে ভবনেকাঁদিছে বিরহে তব প্রিয় পরিজন?নিত্য স্নেহ-সেবা দিয়ে যে আনন্দপুরীরেখেছিলে সুধাময় করে’, যেথাকারপ্রদীপ নিয়ে দিয়ে এসেছ চলিয়াঅরণ্যের মাঝে? আপন শৈশবস্মৃতিযেথায় কাঁদিতে যায় হেন স্থান নাই?
চিত্রাঙ্গদা
প্রশ্ন কেন? তবে কি আনন্দ মিটে গেছে?যা’ দেখিছ তাই আমি, আর কিছু নাইপরিচয়। প্রভাতে এই যে দুলিতেছেকিংশুকের একটি পল্লব প্রান্তভাগেএকটি শিশির, এর কোনাে নাম ধামআছে? এর কি শুধায় কেহ পরিচয়?তুমি যারে ভালবাসিয়াছ, সে এমনিশিশিরের কণা, নামধামহীন।
অর্জ্জুন
কিছুতা’র নাই কি বন্ধন পৃথিবীতে? একবিন্দু স্বর্গ শুধু ভূমিতলে ভুলে’ পড়ে'গেছে?
চিত্রাঙ্গদা
তাই বটে। শুধু নিমেষের তরেদিয়েছে আপন উজ্জ্বলতা অরণ্যেরকুসুমেরে।
অর্জ্জুন
তাই সদা হারাই হারাইকরে প্রাণ, তৃপ্তি নাহি পাই, শান্তি নাহিমানি। সুদুর্লভ, আরো কাছাকাছি এস।মানুষের মত, নামধামগােত্রগৃহ-দেহমনবাক্যে, সহস্র বন্ধনে দাওধরা। চারিপার্শ্ব হ’তে পরশি তােমারে,নির্ভয়নির্ভরে করি বাস! নাম নাই?তবে কোন্ প্রেমমন্ত্রে জপিব তােমারেহৃদয়মন্দিরমাঝে? গােত্র নাই? তবেকি মৃণালে এ কমল ধরিয়া রাখিব?
চিত্রাঙ্গদা
নাই, নাই, নাই।—যারে বাঁধিবারে চাওকখনাে সে বন্ধন জানেনি। সে কেবলমেঘের সুবর্ণছটা, গন্ধ কুসুমের,তরঙ্গের গতি।
অর্জ্জুন
তাহারে যে ভালবাসেঅভাগা সে। প্রিয়ে, দিয়াে না প্রেমের হাতেআকাশকুসুম। বুকে রাখিবার ধনদাও তা'রে সুখে দুঃখে সুদিনে দুর্দ্দিনে।
চিত্রাঙ্গদা
এখনাে যে বর্ষ যায় নাই, শ্রান্তি এরিমাঝে? হায় হায় এখন বুঝিনু, পুষ্পস্বল্প-পরমায়ু দেবতার আশীর্ব্বাদে।গতবসন্তের যত মৃতপুষ্পসাথেঝরিয়া পড়িত যদি এ মােহন তনুআদরে মরিত হবে। বেশি দিন নহেপার্থ! যে ক’দিন আছে, আশা মিটাইয়াকুতুহলে, আনন্দের মধুটুকু তা'র
নিঃশেষ করিয়া কর পান। এর পরেবারবার আসিয়াে না স্মৃতির কুহকেফিরে' ফিরে’, গত সায়াহ্নের চ্যুতবৃন্তমাধবীর আশে, তৃষিত ভূঙ্গের মত।
বনচর
হায় হায় কে রক্ষা করিবে?
অর্জ্জুন
কি হয়েছে
বনচর
উত্তর পর্ব্বত হ'তে আসিছে ছুটিয়াদস্যুদল, বরষার পার্ব্বত্য বন্যারমত বেগে, বিনাশ করিতে লােকালয়।
অর্জ্জুন
এ রাজ্যে রক্ষক কেহ নাই?
বনচর
রাজকন্যাচিত্রাঙ্গদা আছিলেন দুষ্টের দমন;তাঁর ভয়ে রাজ্যে নাহি ছিল কোনাে ভয়,যমভয় ছাড়া। শুনেছি গেছেন তিনিতীর্থপর্যটনে, অজ্ঞাত ভ্রমণব্রত।
অর্জ্জুন
এ রাজ্যের রক্ষক রমণী?
বনচর
এক দেহেতিনি পিতামাতা অনুরক্ত প্রজাদের।স্নেহে তিনি রাজমাতা, বীর্য্যে যুবরাজ।
(প্রস্থান)
( চিত্রাঙ্গদার প্রবেশ)
চিত্রাঙ্গদা
কি ভাবিছ নাথ?
অর্জ্জুন
রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাকেমন না জানি তাই ভাবিতেছি মনে।প্রতিদিন শুনিতেছি শতমুখ হ'তেতারি কথা, নব নব অপূর্ব্ব কাহিনী।
চিত্রাঙ্গদা
কুৎসিত, কুরূপ! এমন বঙ্কিম ভুরুনাই তা'র, এমন নিবিড় কৃষ্ণতারা।কঠিন সবল বাহু বিঁধিতে শিখেছেলক্ষ্য, বাঁধিতে পারে না বীরতনু, হেনসুকোমল নাগপাশে।
অর্জ্জুন
কিন্তু শুনিয়াছি,স্নেহে নারী বীর্য্যে সে পুরুষ।
চিত্রাঙ্গদা
ছি ছি, সেইতা’র মন্দভাগ্য। নারী যদি নারী হয়শুধু, শুধু ধরণীর শােভা, শুধু আলাে,শুধু ভালবাসা, শুধু সুমধুর ছলে,শতরূপ ভঙ্গিমায় পলকে পলকেলুটায়ে জড়ায়ে বেঁকে বেঁধে হেসে কেঁদেসেবায় সােহাগে ছেয়ে চেয়ে থাকে সদাতবে তা'র সার্থক জনম। কি হইবেকর্ম্মকীর্ত্তি বীর্য্যবল শিক্ষা দীক্ষা তা'র।হে পৌরব, কাল যদি দেখিতে তাহারেএই বনপথপার্শ্বে, এই পূর্ণাতীরে,ওই দেবালয় মাঝে-হেসে চলে' যেতে।হায় হায়, আজ এত হয়েছে অরুচিনারীর সৌন্দর্য্যে, নারীতে খুঁজিতে চাওপৌরুষের স্বাদ।
এস নাথ, ওই দেখগাঢ়চ্ছায়া শৈলগুহামুখে, বিছাইয়ারাখিয়াছি আমাদের মধ্যাহ্ন-শয়ন,কচি কচি পীতশ্যাম কিশলয় তুলি’আর্দ্র করি’ ঝরণার শীকরনিকরে।গভীর পল্লবছায়ে বসি’, ক্লান্তকণ্ঠে
কঁদিছে কপােত, “বেলা যায়” “বেলা যায়”বলি'। কুলুকুলু বহিয়া চলেছে নদীছায়াতল দিয়া। শিলাখণ্ডে স্তরে স্তরেসরস সুস্নিগ্ধ সিক্ত শ্যামল শৈবালনয়ন চুম্বন করে কোমল অধরে।এস নাথ বিরল বিরামে।
অৰ্জ্জুন
আজ নহেপ্রিয়ে!
চিত্রাঙ্গদা
কেন নাথ?
অর্জ্জুন
শুনিয়াছি দস্যুদলআসিছে নাশিতে জনপদ। ভীতজনেকরিব রক্ষণ।
চিত্রাঙ্গদা
কোনাে ভয় নাই প্রভু!তীর্থযাত্রাকালে, রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাস্থাপন করিয়া গেছে সতর্ক প্রহরীদিকে দিকে; বিপদের যত পথ ছিলবন্ধ করে' দিয়ে গেছে বহু তর্ক করি'।
অর্জ্জুন
তবু আজ্ঞা কর, প্রিয়ে স্বল্পকালতরেকরে' আসি কর্ত্তব্যসন্ধান। বহুদিনরয়েছে অলস হ'য়ে ক্ষত্রিয়ের বাহু।সুমধ্যমে, ক্ষীণকীর্ত্তি এই ভুজদ্বয়পুনর্ব্বার নবীন গৌরবে ভরি’ আনি’তােমার মস্তকতলে যতনে রাখিয়াদিব, হবে তব যােগ্য উপধান।
চিত্রাঙ্গদা
যদিনাই যেতে দিই? যদি বেঁধে রাখি? ছিন্নকরে’ যাবে? তাই যাও। কিন্তু মনে রেখােছিন্ন লতা জোড়া নাহি লাগে। যদি তৃপ্তিহ'য়ে থাকে, তবে যাও, করিব না মানা;যদি তৃপ্তি নাহি হ'য়ে থাকে, তবে মনেরেখাে, চঞ্চলা সুখের লক্ষী কারাে তরেবসে’ নাহি থাকে; সে কাহারাে সেবাদাসীনহে; তা'র সেবা করে নরনারী, অতিভয়ে ভয়ে নিশিদিন রাখে চোখে চোখেযতদিন প্রসন্ন সে থাকে। রেখে যাবে।যারে সুখের কলিকা, কর্মক্ষেত্র হ'তেফিরে এসে সন্ধ্যাকালে দেখিবে তাহার
দলগুলি ফুটে' ঝরে' পড়ে' গেছে ভূমে;সব কর্ম্ম ব্যর্থ মনে হবে। চিরদিনরহিবে জীবনমাঝে জীবন্ত অতৃপ্তিক্ষুধাতুরা। এস, নাথ, বস'। কেন আজিএত অন্যমন? কার কথা ভাবিতেছ?চিত্রাঙ্গদা? আজ তা'র এত ভাগ্য কেন?
অর্জ্জুন
ভাবিতেছি বীরাঙ্গনা কিসের লাগিয়াধরেছে দুষ্কর ব্রত? কি অভাব তা'র?
চিত্রাঙ্গদা
কি অভাব তা’র? কি ছিল সে অভাগীর?বীর্য্য তা’র অভ্রভেদী দুর্গ সুদুর্গমরেখেছিল চতুর্দ্দিকে অবরুদ্ধ করি’রুদ্যমান রমণীহৃদয়। রমণী তসহজেই অন্তরবাসিনী; সঙ্গোপনেথাকে আপনাতে; কে তা'রে দেখিতে পায়,হৃদয়ের প্রতিবিম্ব দেহের শােভায়প্রকাশ না পায় যদি। কি অভাব তা’র?অরুণ-লাবণ্য-লেখা-চিরনির্ব্বাপিতঊষার মতন, যে রমণী আপনারশতস্তর তিমিরের তলে বসে' থাকেবীর্য্যশৈলশৃঙ্গপরে নিত্য-একাকিনী
কি অভাব তা’র? থাক থাক, তা'র কথা।পুরুষের শ্রুতি-সুমধুর নহে, তা'রইতিহাস!
অর্জ্জুন
বল বল। শ্রবণলালসাক্রমশঃ বাড়িছে মাের। হৃদয় তাহারকরিতেছি অনুভব হৃদয়ের মাঝে।যেন পান্থ আমি, প্রবেশ করেছি গিয়াকোন্ অপরূপ দেশে অর্দ্ধ রজনীতে।নদীগিরিবনভূমি সুপ্তিনিমগন,শুভ্রসৌধকিরীটিনী উদার নগরীছায়াসম অর্দ্ধস্ফুট দেখা যায়, শুনাযায় সাগরগর্জ্জন; প্রভাতআকাশেবিচিত্র বিস্ময়ে যেন ফুটিবে চৌদিক;প্রতীক্ষা করিয়া আছি উৎসুক হৃদয়েতারি তরে। বল বল শুনি তা'র কথা।
চিত্রাঙ্গদা
কি আর শুনিবে?
অর্জ্জুন
দেখিতে পেতেছি তা'রেঅশ্বারােহী, অবহেলে বাম করে বল্লাধরি’, দক্ষিণেতে শরাসন, নগরের
বিজয়লক্ষনীর মত, আর্ত্ত প্রজাগণেকরিছেন বরাভয়দান। দরিদ্রেরসঙ্কীর্ণ দুয়ারে, রাজার মহিমা যেথানত হয় প্রবেশ করিতে, মাতৃরূপধরি’ সেথা, করিছেন দয়াবিতরণ।সিংহিনীর মত, চারিদিকে আপনারবৎসগণে রয়েছেন আগলিয়া, শত্রুকেহ কাছে নাহি আসে ডরে। ফিরিছেনমুক্তলজ্জা, ভয়হীনা, প্রসন্নহাসিনী,বীর্য্যসিংহ পরে চড়ি’ জগদ্ধাত্রী দয়া।রমণীর কমনীয় দুই বাহু পরেস্বাধীন সে অসঙ্কোচ বল, ধিক্ থাকতা'র কাছে রুনুঝুনু কঙ্কণ কিঙ্কিণী।অয়ি বরারোহে, বহুদিন কর্ম্মহীনএ পরাণ মাের, উঠিছে অশান্ত হ'য়েদীর্ঘ শীত-সুপ্তোথিত ভুজঙ্গের মত।এস এস দোঁহে দুই মত্ত অশ্ব ল'য়েপাশাপাশি ছুটে চলে' যাই, মহাবেগেদুই দীপ্ত জ্যোতিষ্কের মত। বাহিরিয়াযাই, এই রুদ্ধ সমীরণ, এই তিক্তপুষ্পগন্ধমদিরায় নিদ্রাঘনঘােরঅরণ্যের অন্ধগর্ভ হ'তে।
চিত্রাঙ্গদা
হে কৌন্তেয়,যদি এ লালিত্য, এই কোমল ভীরুতা,স্পর্শক্লেশসকাতর শিরীষপেলবএই রূপ, ছিন্ন করে' ঘৃণাভরে ফেলি'পদতলে, পরের বসনখণ্ড সম,—সে ক্ষতি কি সহিতে পারিবে? কামিনীরছলাকলা মায়ামন্ত্র দূর করে' দিয়েউঠিয়া দাঁড়াই যদি সরল উন্নতবীর্য্যমন্ত অন্তরের বলে, পর্ব্বতেরতেজস্বী তরুণ তরুসম, বায়ুভরেআনম্রসুন্দর, কিন্তু লতিকার মতনহে নিত্য কুণ্ঠিত লুণ্ঠিত,—সেকি ভালােলাগিবে পুরুষচোখে?—থাক থাক, তা'রচেয়ে এই ভালো। আপন যৌবনখানি,দুদিনের বহুমূল্য ধন, সাজাইয়াসযতনে, পথচেয়ে বসিয়া রহিব;অবসরে আসিবে যখন, আপনারসুধাটুকু দেহপাত্রে আকর্ণ পূরিয়াকরাইব পান; সুখস্বাদে শ্রান্তি হ'লেচলে' যাবে কর্ম্মের সন্ধানে; পুরাতনহ'লে, যেথা স্থান দিবে, সেথায় রহিব
পার্শ্বে পড়ি। যামিনীর নর্ম্মসহচরীযদি হয় দিবসের কর্ম্মসহচরী,সতত প্রস্তুত থাকে বামহস্তসমদক্ষিণ হস্তের অনুচর, সে কি ভালােলাগিবে বীরের প্রাণে?
অৰ্জ্জুন
বুঝিতে পারিনেআমি রহস্য তােমার। এতদিন আছি,তবু যেন পাইনি সন্ধান। তুমি যেনবঞ্চিত করিছ মােরে গুপ্ত থেকে সদা;তুমি যেন দেবীর মতন, প্রতিমারঅন্তরালে থেকে, আমারে করিছ দানঅমূল্য চুম্বন রত্ন, আলিঙ্গন সুধা;নিজে কিছু চাই না, লহ না। অঙ্গহীনছন্দোহীন প্রেম প্রতিক্ষণে পরিতাপজাগায় অন্তরে। তেজস্বিনী, পরিচয়পাই তব মাঝে মাঝে কথায় কথায়।তা'র কাছে এ সৌন্দর্যরাশি, মনে হয়মৃত্তিকার মূর্ত্তি শুধু, নিপুণ চিত্রিতশিল্প যবনিকা। মাঝে মাঝে মনে হয়তােমারে তােমার রূপ ধরিতে পারে নাআর, তাই সদা কাঁপিতেছে টলমল
করি'। নিত্যদীপ্ত হাসিটির মাঝেভরা অশ্রু করিতেছে বাস, মাঝে মাঝেছলছল করে' ওঠে, মুহূর্ত্তের মাঝেফাটিয়া পড়িবে যেন আবরণ টুটি'।সাধকের কাছে, প্রথমেতে ভ্রান্তি আসেমনােহর মায়াকায়া ধরি’; তা'র পরেসত্য দেখা দেয়, ভূষণ-বিহীনরূপেআলাে করি’ অন্তর বাহির। সেই সত্যকোথা আছে তােমার মাঝারে, দাও তা'রে।আমার যে সত্য তাই লও। শ্রান্তিহীনসে মিলন চিরদিবসের। অশ্রু কেনপ্রিয়ে? বাহুতে লুকায়ে মুখ কেন এইব্যাকুলতা? বেদনা দিয়েছি প্রিয়তমে?তবে থাক, তবে থাক্। ওই মনােহররূপ পুণ্যফল মাের। এই যে সঙ্গীতশােনা যায় মাঝে মাঝে বসন্তসমীরেএ যৌবন যমুনার পরপার হ'তে,এই মাের বহুভাগ্য। এ বেদনা মােরসুখের অধিক সুখ, আশার অধিকআশা, হৃদয়ের চেয়ে বড়, তাই তা'রেহৃদয়ের ব্যথা বলে' মনে হয় প্রিয়ে।
মদন
শেষ রাত্রি আজি।
বসন্ত
আজ রাত্রিঅবসানেতব অঙ্গ-শােভা, ফিরে' যাবে বসন্তেরঅক্ষয়ভাণ্ডারে। পার্থের চুম্বনস্মৃতিভুলে' গিয়ে, তব ওষ্ঠ-রাগ, দুটি নবকিশলয়ে মঞ্জরি’ উঠিবে লতিকায়।অঙ্গের বরণ তব, শত শ্বেত ফুলেধরিয়া নূতন তনু, গতজন্মকথাত্যজিবে স্বপ্নের মত নব জাগরণে।
চিত্রাঙ্গদা
হে অনঙ্গ, হে বসন্ত, আজ রাত্রে তবেএ মুমূর্ষুরূপ মাের, শেষ রজনীতেশ্রান্ত প্রদীপের অন্তিম শিখার মত-আচম্বিতে উঠুক উজ্জ্বলতম হ'য়ে।
মদন
তবে তাই হােক। সখা, দক্ষিণ পবনদাও তবে নিশ্বাসিয়া প্রাণপূর্ণ বেগে।
অঙ্গে অঙ্গে উচুক উচ্ছ্বসি পুনর্ব্বারনবােল্লাসে যৌবনের ক্লান্ত মন্দ স্রোতআজি মাের পঞ্চ পুষ্পশরে, নিশীথেরনিদ্রাভেদ করি’, ভােগবতী তটিনীরতরঙ্গউচ্ছ্বাসে, প্লাবিত করিয়া দিববাহুপাশে বদ্ধ দুটি প্রেমিকের তনু।
অর্জ্জুন ও চিত্রাঙ্গদা
চিত্রাঙ্গদা
প্রভু, মিটিয়াছে সাধ? এই সুললিতসুগঠিত নবনী-কোমল সৌন্দর্য্যেরযত গন্ধ যত মধু ছিল, সকলি কিকরিয়াছ পান! আর কিছু বাকি আছে?আর কিছু চাও? আমার যা কিছু ছিলসব হয়ে গেছে শেষ?—হয় নাই প্রভু!ভালাে হােক, মন্দ হােক, আরাে কিছু বাকিআছে, সে আজিকে দিব।
প্রিয়তম, ভালােলেগেছিল বলে’ করেছিনু নিবেদনএ সৌন্দর্য-পুষ্পরাশি চরণকমলে—নন্দনকানন হ’তে তুলে' নিয়ে এসেবহু সাধনায়। যদি সাঙ্গ হ’ল পূজাতবে আজ্ঞা কর প্রভু, নির্ম্মাল্যের ডালিফেলে দিই মন্দির বাহিরে। এইবারপ্রসন্ন নয়নে চাও সেবিকার পানে।যে ফুলে করেছি পূজা, নহি আমি কভু
সে ফুলের মত প্রভু এত সুমধুর,এত সুকোমল, এত সম্পূর্ণ সুন্দর।দোষ আছে, গুণ আছে, পাপ আছে, পুণ্যআছে; কত দৈন্য আছে; আছে আজন্মেরকত অতৃপ্ত তিয়াষা। সংসার-পথেরপান্থ, ধূলিলিপ্ত বাস, বিক্ষত চরণ;কোথা পাব কুসুম-লাবণ্য, দুদণ্ডেরজীবনের অকলঙ্ক শােভা! কিন্তু আছেঅক্ষয় অমর এক রমণী-হৃদয়?দুঃখ সুখ আশা ভয় লজ্জা দুর্ব্বলতাধূলিময়ী ধরণীর কোলের সন্তান,তা’র কত ভ্রান্তি, তা'র কত ব্যথা,কত ভালবাসা, মিশ্রিত জড়িত হ'য়েআছে এক সাথে।—আছে এক সীমাহীনঅপূর্ণতা, অনন্ত মহৎ। কুসুমেরসৌরভ মিলায়ে থাকে যদি, এইবারসেই জন্ম-জন্মান্তের সেবিকার পানেচাও।
সূর্য্যোদয়
( অবগুণ্ঠন খুলিয়া)
আমি চিত্রাঙ্গদা। রাজেন্দ্রনন্দিনী:হয় ত পড়িবে মনে, সেই একদিন
সেই সরােবরতীরে, শিবালয়ে, দেখাদিয়েছিল এক নারী, বহু আবরণেভারাক্রান্ত করি’ তা'র রূপহীন তনু।কি জানি কি বলেছিল নির্লজ্জ মুখরা,পুরুষেরে করেছিল পুরুষ-প্রথায়আরাধনা; প্রত্যাখ্যান করেছিলে তা'রে।ভালোই করেছ। সামান্য সে নারীরূপেগ্রহণ করিতে যদি তা'রে, অনুতাপবিঁধিত তাহার বুকে আমরণ কাল।প্রভু, আমি সেই নারী। তবু আমি সেইনারী নহি; সে আমার হীন ছদ্মবেশ।তার পরে পেয়েছিনু বসন্তের বরেবর্ষকাল অপরূপ রূপ। দিয়েছিনুশ্রান্ত করি’ বীরের হৃদয়, ছলনারভারে। সেও আমি নহি।
আমি চিত্রাঙ্গদা।দেবী নহি, নহি আমি সামান্যা রমণী।পূজা করি’ রাখিবে মাথায়, সেও আমিনই, অবহেলা করি’ পুষিয়া রাখিবেপিছে সেও আমি নহি। যদি পার্শ্বে রাখমােরে সঙ্কটের পথে, দুরূহ চিন্তারযদি অংশ দাও, যদি অনুমতি কর’
কঠিন ব্রতের তব সহায় হইতে,যদি সুখে দুখে মােরে কর সহচরী,আমার পাইবে তবে পরিচয়। গর্ভেআমি ধরেছি যে সন্তান তােমার, যদিপুত্র হয়, আশৈশব বীরশিক্ষা দিয়েদ্বিতীয় অর্জ্জুন করি’ তা’রে একদিনপাঠাইয়া দিব যবে পিতার চরণে,তখন জানিবে মােরে প্রিয়তম!
আজশুধু নিবেদি চরণে, আমি চিত্রাঙ্গদা,রাজেন্দ্রনন্দিনী।
প্রিয়ে, আজ ধন্য আমি
Comments
Loading comments…