গান্ধারীর আবেদন
কাব্যগ্রন্থ — নাট্য কবিতা
দুর্য্যোধন
প্রণমি চরণে তাত!
ধৃতরাষ্ট্র
ওরে দুরাশয়অভীষ্ট হয়েছে সিদ্ধ?
দুর্য্যোধন
লভিয়াছি জয়।
ধৃতরাষ্ট্র
এখন হয়েছ সুখী?
দুর্য্যোধন
হয়েছি বিজয়ী।
ধৃতরাষ্ট্র
অখণ্ড রাজত্ব জিনি সুখ তাের কইরে দুর্ম্মতি?
দুর্য্যোধন
সুখ চাহি নাই মহারাজ।জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।ক্ষুদ্র সুখে ভরেনাকো ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধাকুরুপতি,—দীপ্তজ্বালা অগ্নিঢালা সুধাজয়রস—ঈর্ষাসিন্ধুমন্থনসঞ্জাত-সদ্য করিয়াছি পান,—সুখী নহি, তাত,অদ্য আমি জয়ী। পিতঃ, সুখে ছিনু, যবেএকত্রে আছিনু বদ্ধ পাণ্ডবে কৌরবে,কলঙ্ক যেমন থাকে শশাঙ্কের বুকেকর্ম্মহীন গর্ব্বহীন দীপ্তিহীন সুখে।সুখে ছিনু, পাণ্ডবের গাণ্ডীব টঙ্কারেশঙ্কাকুল শত্রুদল আসিত না দ্বারে,সুখে ছিনু, পাণ্ডবেরা জয়দৃপ্ত করেধরিত্রী দোহন করি, ভ্রাতৃপ্রীতি ভরে
দিত অংশ তা'র -নিত্য নব ভােগসুখেআছিনু নিশ্চিন্ত চিত্তে অনন্ত কৌতুকে।সুখে ছিনু পাণ্ডবের জয়ধ্বনি যবেহানিত কৌরব-কর্ণ প্রতিধ্বনিরবে;পাণ্ডবের যশােবিম্ব-প্রতিবিম্ব আসিউজ্জ্বল অঙ্গুলি দিয়া দিত পরকাশি'মলিন-কৌরবকক্ষ। সুখে ছিনু পিতঃআপনার সর্ব্বতেজ করি নির্ব্বাপিতপাণ্ডব-গৌরবতলে স্নিগ্ধশান্তরূপেহেমন্তের ভেক যথা জড়ত্বের কূপে।আজি পাণ্ডুপুত্রগণে পরাভব বহিবনে যায় চলি,—আজ আমি সুখী নহি,আজ আমি জয়ী।
ধৃতরাষ্ট্র
ধিক্ তাের ভ্রাতৃদ্রোহ!পাণ্ডবের কৌরবের এক পিতামহসে কি ভুলে গেলি?
দুর্য্যোধন
ভুলিতে পারিনে সে যে,এক পিতামহ তবু ধনে মানে তেজে
এক নহি। -যদি হ'ত দূরবর্ত্তী পরনাহি ছিল ক্ষোভ; শর্ব্বরীর শশধরমধ্যাহ্নের তপনেরে দ্বেষ নাহি করে,—কিন্তু প্রাতে এক পূর্ব্ব-উদয়-শিখরেদুই ভ্রাতৃ-সূর্য্যলােক কিছুতে না ধরে।আজ দ্বন্দ্ব ঘুচিয়াছে, আজি আমি জয়ী,আজি আমি একা।
ধৃতরাষ্ট্র
ক্ষুদ্র ঈর্ষ্যা! বিষময়ীভুজঙ্গিনী।
দুর্য্যোধন
ক্ষুদ্র নহে, ঈর্ষ্যা সুমহতী।ঈর্ষ্যা বৃহতের ধর্ম্ম। দুই বনস্পতিমধ্যে রাখে ব্যবধান,—লক্ষ লক্ষ তৃণএকত্রে মিলিয়া থাকে বক্ষে বক্ষে লীন;নক্ষত্র অসংখ্য থাকে সৌভ্রাত্র-বন্ধনে,—এক সূর্য এক শশী। মলিন কিরণেদূর বন-অন্তরালে পাণ্ডু চন্দ্রলেখাআজি অস্ত গেল,—আজি কুরুসূর্য্য একা,আজি আমি জয়ী।
ধৃতরাষ্ট্র
আজি ধর্ম্ম পরাজিত।
দুর্য্যোধন
লােকধর্ম্ম রাজধর্ম্ম এক নহে পিতঃ!লােকসমাজের মাঝে সমকক্ষজনসহায় সুহৃদরূপে নির্ভর বন্ধন,—কিন্তু রাজা একেশ্বর, সমকক্ষ তা'রমহাশত্রু, চিরবিঘ্ন, স্থান দুশ্চিন্তার,সম্মুখের অন্তরাল, পশ্চাতের ভয়,অহর্নিশি যশঃশক্তিগৌরবের ক্ষয়,ঐশ্বর্য্যের অংশ-অপহারী। ক্ষুদ্রজনেবলভাগ করে’ ল’য়ে বান্ধবের সনেরহে বলী; রাজদণ্ডে যত খণ্ড হয়তত তা'র দুর্ব্বলতা, তত তা'র ক্ষয়।একা সকলের উর্দ্ধে মস্তক আপনযদি না রাখিবে রাজা, যদি বহুজনবহুদূর হ'তে তাঁর সমুদ্ধত শিরনিত্য না দেখিতে পায় অব্যাহত স্থির,তবে বহুজন পরে বহুদূরে তাঁরকেমনে শাসন দৃষ্টি রহিবে প্রচার?
রাজধর্ম্মে ভ্রাতৃধর্ম্ম বন্ধুধর্ম্ম নাই,শুধু জয়ধর্ম্ম আছে, মহারাজ, তাইআজি আমি চরিতার্থ, আজি জয়ী আমি,—সম্মুখের ব্যবধান গেছে আজি নামি’পাণ্ডব-গৌরবগিরি পঞ্চচূড়াময়।
ধৃতরাষ্ট্র
জিনিয়া কপটদ্যূতে তা’রে কোস্ জয়?লজ্জাহীন অহঙ্কারী!
দুর্য্যোধন
যার যাহা বলতাই তা'র অস্ত্র পিতঃ, যুদ্ধের সম্বল।ব্যাঘ্রসনে নখেদন্তে নহিক সমানতাই বলে’ ধনুঃশরে বধি তা'র প্রাণকোন্ নর লজ্জা পায়? মূঢ়ের মতনঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুমাঝে আত্মসমর্পণযুদ্ধ নহে,—জয়লাভ এক লক্ষ্য তা'র,—আজি আমি জয়ী পিতঃ, তাই অহঙ্কার।
ধৃতরাষ্ট্র
আজি তুমি জয়ী তাই তব নিন্দাধ্বনিপরিপূর্ণ করিয়াছে অম্বর অবনীসমুচ্চ ধিক্কারে।
দুর্য্যোধন
নিন্দা আর নাহি ডরি,নিন্দারে করিব ধ্বংস কণ্ঠরুদ্ধ করি।নিস্তব্ধ করিয়া দিব মুখরা নগরীস্পর্দ্ধিত রসনা তা'র দৃঢ়বলে চাপিমাের পাদপীঠতলে। “দুর্য্যোধন পাপী”“দুর্য্যোধন ক্রুরমনা” “দুর্য্যোধন হীন”নিরুত্তরে শুনিয়া এসেছি এতদিন,রাজদণ্ড স্পর্শ করি কহি মহারাজআপামর জনে আমি কহাইব আজ“দুর্য্যোধন রাজা!—দুর্য্যোধন নাহি সহেরাজনিন্দা-আলােচনা, দুর্যোধন বহেনিজহস্তে নিজনাম।”
ধৃতরাষ্ট্র
ওরে বৎস শােন্নিন্দারে রসনা হ'তে দিলে নির্ব্বাসন
নিম্নমুখে অন্তরের গূঢ় অন্ধকারেগভীর জটিল মূল সুদূরে প্রসারে,নিত্য বিষতিক্ত করি রাখে চিত্ততল।রসনায় নৃত্য করি’ চপল চঞ্চলনিন্দা শ্রান্ত হ'য়ে পড়ে,—দিয়াে না তাহারেনিঃশব্দে আপন শক্তি বৃদ্ধি করিবারেগােপন হৃদয়দুর্গে। প্রতিমন্ত্রবলেশান্ত কর বন্দী কর নিন্দা সর্পদলেবংশীরবে হাস্যমুখে।—
দুর্য্যোধন
অব্যক্ত নিন্দায়কোনাে ক্ষতি নাহি করে রাজ-মর্যাদায়,ভ্রুক্ষেপ না করি তাহে। প্রীতি নাহি পাইতাহে খেদ নাহি—কিন্তু স্পর্দ্ধা নাহি চাইমহারাজ!—প্রতিদান স্বেচ্ছার অধীন,—প্রীতিভিক্ষা দিয়ে থাকে দীনতম দীন,—সে প্রীতি বিলাক্ তা'রা পালিত মার্জ্জারে,দ্বারের কুকুরে, আর পাণ্ডবভ্রাতারে,তাহে মাের নাহি কাজ। আমি চাহি ভয়সেই মাের রাজপ্রাপ্য,—আমি চাহি জয়
দপিতের দর্প নাশি'। শুন নিবেদনপিতৃদেব,—এতকাল তব সিংহাসনআমার নিন্দুকদল নিত্য ছিল ঘিরে,কণ্টক তরুর মত নিষ্ঠুর প্রাচীরেতােমার আমার মধ্যে রচি ব্যবধান;শুনায়েছে পাণ্ডবের নিত্য গুণগানআমাদের নিত্য নিন্দা,—এই মতে পিতঃপিতৃস্নেহ হ’তে মােরা চির নির্ব্বাসিত।এই মতে পিতঃ মােরা শিশুকাল হ'তেহীনবল,—উৎসমুখে পিতৃস্নেহস্রোতেপাষাণের বাধা পড়ি মােরা পরিক্ষীণশীর্ণ নদ, নষ্টপ্রাণ, গতিশক্তিহীন,পদে পদে প্রতিহত; পাণ্ডবেরা স্ফীতঅখণ্ড অবাধগতি;—অদ্য হ’তে পিতঃযদি সে নিন্দুকদলে নাহি কর দূরসিংহাসনপার্শ্ব হ'তে, সঞ্জয় বিদুরভীষ্ম পিতামহে,—“যদি তা'রা বিজ্ঞবেশেহিতকথা ধর্ম্মকথা সাধু উপদেশেনিন্দায় ধিক্কারে তর্কে নিমেষে নিমেষেছিন্ন ছিন্ন করি দেয় রাজকর্ম্মডাের,ভারাক্রান্ত করি রাখে রাজদণ্ড মাের,পদে পদে দ্বিধা আনে রাজশক্তিমাঝে,
মুকুট মলিন করে অপমানে লাজে,তবে ক্ষমা দাও পিতৃদেব,নাহি কাজসিংহাসন-কণ্টকশয়নে,—মহারাজবিনিময় করে’ লই পাণ্ডবের সনেরাজ্য দিয়ে বনবাস, যাই নির্ব্বাসনে।
ধৃতরাষ্ট্র
হায় বৎস অভিমানী! পিতৃস্নেহ মােরকিছু যদি হ্রাস হ'ত শুনি সুকঠোরসুহৃদের নিন্দাবাক্য,—হইত কল্যাণ।অধর্ম্মে দিয়েছি যােগ, হারায়েছি জ্ঞান,এত স্নেহ! করিতেছি সর্ব্বনাশ তাের,এত স্নেহ! জ্বালাতেছি কালানল ঘােরপুরাতন কুরুবংশ-মহারণ্যতলে,—তবু পুত্র দোষ দিস্ স্নেহ নাই বলে’!মণিলােভে কালসর্প করিলি কামনা,দিনু তােরে নিজহস্তে ধরি তা’র ফণাঅন্ধ আমি!–অন্ধ আমি অন্তরে বাহিরেচিরদিন,—তােরে ল’য়ে প্রলয়-তিমিরেচলিয়াছি,—বন্ধুগণ হাহাকার-রবেকরিছে নিষেধ,—নিশাচর গৃধ্রুসবে
করিতেছে অশুভ চীৎকার,—পদে পদেসঙ্কীর্ণ হতেছে পথ,–আসন্ন বিপদেকণ্টকিত কলেবর,তবু দৃঢ়করেভয়ঙ্কর স্নেহে বক্ষে বাঁধি ল’য়ে তােরেবায়ুবলে অন্ধবেগে বিনাশের গ্রাসেছুটিয়া চলেছি মূঢ় মত্ত অট্টহাসেউল্কার আলােকে,—শুধু তুমি আর আমি,—আর সঙ্গী বজ্রহস্ত দীপ্ত অন্তর্যামী,—নাই সম্মুখের দৃষ্টি, নাই নিবারণপশ্চাতের, শুধু নিম্নে ঘাের আকর্ষণনিদারুণ নিপাতের সহসা একদাচকিতে চেতনা হবে, বিধাতার গদামুহূর্ত্তে পড়িবে শিরে,—আসিবে সময়,ততক্ষণ পিতৃস্নেহে কোরাে না সংশয়,আলিঙ্গন কোরাে না শিথিল,—ততক্ষণদ্রুত হস্তে লুটি লও সর্ব্ব স্বার্থধন,হও জয়ী, হও সুখী, হও তুমি রাজাএকেশ্বর।—ওরে তােরা জয়বাদ্য বাজা।জয়ধ্বজা তােল শূন্যে। আজি জয়ােৎসবেন্যায় ধর্ম্ম বন্ধু ভ্রাতা কেহ নাহি র'বে,—না র’বে বিদুর ভীষ্ম না র’বে সঞ্জয়,নাহি র'বে লােকনিন্দা লােকলজ্জা ভয়,
কুরুবংশ-রাজলক্ষী নাহি র'বে আর,শুধু র'বে অন্ধ পিতা, অন্ধ পুত্র তা'রআর কালান্তক যম,—শুধু পিতৃস্নেহআর বিধাতার শাপ-আর নহে কেহ।
( চরের প্রবেশ )
চর
মহারাজ, অগ্নিহােত্র, দেব-উপাসনা,ত্যাগ করি বিপ্রগণ, ছাড়ি সন্ধ্যার্চ্চনা,দাঁড়ায়েছে চতুষ্পথে, পাণ্ডবের তরেপ্রতীক্ষিয়া;—পৌরগণ কেহ নাহি ঘরে,পণ্যশালা রুদ্ধ সব; সন্ধ্যা হ’ল তবুভৈরব-মন্দির মাঝে নাহি বাজে প্রভুশঙ্খঘণ্টা সন্ধ্যাভেরী, দীপ নাহি জ্বলে;—শােকাতুর নরনারী সবে দলে দলেচলিয়াছে নগরের সিংহদ্বার পানেদীন বেশে সজল নয়নে।
দুর্য্যোধন
নাহি জানে,জাগিয়াছে দুর্য্যোধন। মুঢ় ভাগ্যহীন।ঘনায়ে এসেছে আজি তােমার দুর্দ্দিন।
রাজায় প্রজায় আজি হবে পরিচয়ঘনিষ্ঠ কঠিন। দেখি কতদিন রয়প্রজার পরম স্পর্দ্ধা,—নির্ব্বিষ সর্পেরব্যর্থ ফণা-আস্ফালন,——নিরস্ত্র দর্পেরহুহুঙ্কার।
(প্রতিহারীর প্রবেশ )
প্রতিহারী
মহারাজ, মহিষী গান্ধারীদর্শনপ্রার্থিনী পদে।
ধৃতরাষ্ট্র
রহিনু তাঁহারিপ্রতীক্ষায়।
দুর্যোধন
পিতঃ আমি চলিলাম তবে।
(প্রস্থান)
ধৃতরাষ্ট্র
কর পলায়ন। হায় কেমনে বা সবেসাধ্বী জননীর দৃষ্টি সমুদ্যত বাজওরে পুণ্যভীত! মােরে তাের নাহি লাজ!
( গান্ধারীর প্রবেশ)
গান্ধারী
নিবেদন আছে শ্রীচরণে। অনুনয়রক্ষা কর নাথ।
ধৃতরাষ্ট্র
কভু কি অপূর্ণ রয়প্রিয়ার প্রার্থনা?
গান্ধারী
ত্যাগ কর এইবার-
ধৃতরাষ্ট্র
কারে হে মহিষী?
গান্ধারী
পাপের সংঘর্ষে যারপড়িছে ভীষণ শাণ ধর্ম্মের কৃপাণেসেই মূঢ়ে।
ধৃতরাষ্ট্র
কে সে জন? আছে কোন্ খানে?শুধু কহ নাম তা'র।
গান্ধারী
পুত্র দুর্য্যোধন।
ধৃতরাষ্ট্র
তাহারে করিব ত্যাগ?
গান্ধারী
এই নিবেদনতব পদে।
ধৃতরাষ্ট্র
দারুণ প্রার্থনা হে গান্ধারীরাজমাতা!
গান্ধারী
এ প্রার্থনা শুধু কি আমারিহে কৌরব? কুরুকুল-পিতৃ-পিতামহস্বর্গ হ'তে এ প্রার্থনা করে অহরহনরনাথ! ত্যাগ কর ত্যাগ কর তা'রে—কৌরব-কল্যাণলক্ষী যার অত্যাচারেঅশ্রুমুখী প্রতীক্ষিছে বিদায়ের ক্ষণরাত্রি দিন।
ধৃতরাষ্ট্র
ধর্ম্ম তা'রে করিবে শাসনধর্ম্মেরে যে লঙ্ঘন করেছে,—আমি পিতা-
গান্ধারী
মাতা আমি নহি? গর্ভভার-জর্জ্জরিতাজাগ্রত হৃৎপিণ্ডতলে বহি নাই তা'রে?স্নেহ-বিগলিত চিত্ত শুভ্র দুগ্ধধারেউচ্ছ্বসিয়া উঠে নাই দুই স্তন বাহি’তা’র সেই অকলঙ্ক শিশুমুখ চাহি?শাখাবন্ধে ফল যথা, সেই মত করিবহু বর্ষ ছিল না সে আমারে আঁকড়িদুই ক্ষুদ্র বাহুবৃন্ত দিয়ে,—ল’য়ে টানিমাের হাসি হ’তে হাসি, বাণী হতে বাণীপ্রাণ হ’তে প্রাণ?—তবু কহি, মহারাজ,সেই পুত্র দুর্যোধনে ত্যাগ কর আজ।
ধৃতরাষ্ট্র
কি রাখিব তা'রে ত্যাগ করি?
গান্ধারী
ধর্ম্ম তব।
ধৃতরাষ্ট্র
কি দিবে তােমারে ধর্ম্ম?
গান্ধারী
দুঃখ নবনব।পুত্রসুখ রাজ্যসুখ অধর্ম্মের পণেজিনি ল’য়ে চিরদিন বহিব কেমনেদুই কাঁটা বক্ষে আলিঙ্গিয়া?
ধৃতরাষ্ট্র
হায় প্রিয়ে,ধর্ম্মবশে একবার দিলু ফিরাইয়েদ্যূতবদ্ধ পাণ্ডবের হৃত রাজ্যধন।পরক্ষণে পিতৃস্নেহ করিল গুঞ্জনশতবার কর্ণে মোর-“কি করিলি ওরে!এককালে ধর্ম্মাধর্ম্ম দুই তরী পরেপা দিয়ে বাঁচে না কেহ। বারেক যখননেমেছে পাপের স্রোতে কুরুপুত্রগণতখন ধর্ম্মের সাথে সন্ধি করা মিছে,পাপের দুয়ারে পাপ সহায় মাগিছে।কি করিলি, হতভাগ্য, বৃদ্ধ, বুদ্ধিহত,দুর্ব্বল দ্বিধায় পড়ি। অপমান-ক্ষত
রাজ্য ফিরে দিলে তবু মিলাবে না আরপাণ্ডবের মনে—শুধু নব কাষ্ঠভারহুতাশনে দান। অপমানিতের করেক্ষমতার অস্ত্র দেওয়া মরিবার তরে।সক্ষমে দিয়াে না ছাড়ি দিয়ে স্বল্প পীড়া,—করহ দলন। কোরাে না বিফল ক্রীড়াপাপের সহিত; যদি ডেকে আন তা'রে,বরণ করিয়া তবে লহ একেবারে।”-এই মত পাপবুদ্ধি পিতৃস্নেহরূপেবিঁধিতে লাগিল মাের কর্ণে চুপে চুপেকত কথা তীক্ষ্ণ সূচিসম। পুনরায়ফিরানু পাণ্ডবগণে,—দ্যূতছলনায়বিসর্জ্জিনু দীর্ঘ বনবাসে। হায় ধর্ম্ম,হায় রে প্রবৃত্তিবেগ! কে বুঝিবে মর্ম্মসংসারের।
গান্ধারী
ধর্ম্ম নহে সম্পদের হেতুমহারাজ, নহে সে সুখের ক্ষুদ্র সেতু,—ধর্ম্মেই ধর্ম্মের শেষ। মূঢ় নারী আমি,ধর্ম্মকথা তােমারে কি বুঝাইব স্বামী,
জান ত সকলি। পাণ্ডবেরা যাবে বনেফিরাইলে ফিরিবে না, বদ্ধ তা'রা পণে,—এখন এ মহারাজ্য একাকী তােমারমহীপতি,—পুত্রে তব ত্যজ এইবার,—নিষ্পপেরে দুঃখ দিয়ে নিজে পূর্ণ সুখলইয়াে না,ন্যায়ধর্ম্মে কোরাে না বিমুখপৌরব-প্রাসাদ হ’তে,দুঃখ সুদুঃসহআজ হ’তে ধর্ম্মরাজ লহ তুলি' লহদেহ তুলি’ মাের শিরে।
ধৃতরাষ্ট্র
হায় মহারাণী,সত্য তব উপদেশ, তীব্র তব বাণী।
গান্ধারী
অধর্ম্মের মধুমাখা বিষফল তুলিআনন্দে নাচিছে পুত্র;—স্নেহমমাহে ভুলিসে ফল দিয়ে না তা'রে ভােগ করিবারে,কেড়ে লও, ফেলে দাও, কাঁদাও তাহারে।ছললব্ধ পাপস্ফীত রাজ্যধনজনেফেলে রাখি’ সেও চলে' যাক্ নির্ব্বাসনে,
বঞ্চিত পাণ্ডবদের সমদুঃখভারকরুক বহন।
ধৃতরাষ্ট্র
ধর্ম্মবিধি বিধাতার,—জাগ্রত আছেন তিনি, ধর্ম্মদণ্ড তাঁররয়েছে উদ্যত নিত্য,—অয়ি মনস্বিনী,তাঁর রাজ্যে তাঁর কার্য্য করিবেন তিনি।আমি পিতা-
গান্ধারী
তুমি রাজা, রাজ-অধিরাজ,বিধাতার বামহস্ত; -ধর্ম্মরক্ষা কাজতােমা পরে সমর্পিত। শুধাই তােমারেযদি কোনাে প্রজা তব, সতী অবলারেপরগৃহ হ’তে টানি করে অপমানবিনা দোষে—কি তাহার করিবে বিধান?
ধৃতরাষ্ট্র
নির্ব্বাসন।
গান্ধারী
তবে আজ রাজ-পদতলেসমস্ত নারীর হ'য়ে নয়নের জলেবিচার প্রার্থনা করি। পুত্র দুর্য্যোধনঅপরাধী প্রভু! তুমি আছ, হে রাজন,প্রমাণ আপনি। পুরুষে পুরুষে দ্বন্দ্বস্বার্থ ল’য়ে বাধে অহরহ,—ভালো মন্দনাহি বুঝি তা'র,—দণ্ডনীতি, ভেদনীতি,কূটনীতি কতশত,—পুরুষের রীতিপুরুষেই জানে। বলের বিরোধে বল,ছলের বিরোধে কত জেগে উঠে ছল,কৌশলে কৌশল হানে,—মোরা থাকি দূরেআপনার গৃহকর্ম্মে শান্ত অন্তঃপুরে।যে সেথা টানিয়া আনে বিদ্বেষ অনলবাহিরের দ্বন্দ হ’তে,পুরুষেরে ছাড়িঅন্তঃপুরে প্রবেশিয়া নিরুপায় নারীগৃহধর্ম্মচারিণীর পুণ্যদেহ পরেকলুষ-পরুষ স্পর্শে অসম্মানে করেহস্তক্ষেপ,—পতি সাথে বাধায়ে বিরোধযে নর পত্নীরে হানি লয় তা’র শোধসে শুধু পাষণ্ড নহে, সে যে কাপুরুষ।মহারাজ, কি তা'র বিধান? অকলুষ
পুরুবংশে পাপ যদি জন্মলাভ করেসেও সহে,—কিন্তু প্রভু, মাতৃগর্ব্বভরেভেবেছিনু গর্ভে মাের বীরপুত্রগণজন্মিয়াছে,—হায় নাথ, সে দিন যখনঅনাথিনী পাঞ্চালীর আর্ত্তকণ্ঠরবপ্রাসাদ-পাষাণ-ভিত্তি করি দিল দ্রবলজ্জা ঘৃণা করুণার তাপে,—ছুটি গিয়াহেরিনু গবাক্ষে, তা'র বস্ত্র আকর্ষিয়াখল খল হাসিতেছে সভামাঝখানেগান্ধারীর পুত্র পিশাচেরা,—ধর্ম্ম জানেসে দিন চূর্ণিয়া গেল জন্মের মতনজননীর শেষ গর্ব্ব। কুরুরাজগণ!পৌরুষ কোথায় গেছে ছাড়িয়া ভারত?তােমরা, হে মহারথী জড়মূর্ত্তিবৎবসিয়া রহিলে সেথা চাহি মুখে মুখেকেহ বা হাসিলে, কেহ করিলে কৌতুকেকানাকানি,—কোষমাঝে নিশ্চল কৃপাণবজ্র-নিঃশেষিত লুপ্ত বিদ্যুৎ সমাননিদ্রাগত।—মহারাজ, শুন মহারাজএ মিনতি। দূর কর জননীর লাজ,বীরধর্ম্ম করহ উদ্ধার, পদাহতসতীত্বের ঘুচাও ক্রন্দন, অবনত
ন্যায়ধর্ম্মে করহ সম্মান,—ত্যাগ করদুর্য্যোধনে।
ধৃতরাষ্ট্র
পরিতাপ-দহনে জর্জ্জরহৃদয়ে করিছ শুধু নিস্ফল আঘাতহে মহিষী!
গান্ধারী
শতগুণ বেদনা কি, নাথ,লাগিছে না মােরে? প্রভু, দণ্ডিতের সাথেদণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতেসর্ব্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার। যার তরে প্রাণকোনাে ব্যথা নাহি পায় তা'রে দণ্ডদানপ্রবলের অত্যাচার। যে দণ্ডবেদনাপুত্রেরে পার না দিতে সে কারে দিয়াে না,—যে তােমার পুত্র নহে তারাে পিতা আছে,মহা অপরাধী হবে তুমি তা'র কাছেবিচারক। শুনিয়াছি বিশ্ববিধাতারসবাই সন্তান মােরা,—পুত্রের বিচারনিয়ত করেন তিনি আপনার হাতেনারায়ণ; ব্যথা দেন, ব্যথা পান সাথে,
নতুবা বিচারে তাঁর নাই অধিকার,—মূঢ় নারী লভিয়াছি অন্তরে আমারএই শাস্ত্র।—পাপী পুত্রে ক্ষমা কর যদিনির্ব্বিচারে, মহারাজ, তবে নিরবধিযত দণ্ড দিলে তুমি যত দোষী জনেফিরিয়া লাগিবে আসি দণ্ডদাতা ভূপে,—ন্যায়ের বিচার তব নির্ম্মমতারূপেপাপ হ'য়ে তােমারে দাগিবে। ত্যাগ করপাপী দুর্য্যোধনে।
ধৃতরাষ্ট্র
প্রিয়ে, সংহর, সংহর,তব বাণী। ছিঁড়িতে পারিনে মােহডাের,ধর্ম্মকথা শুধু আসি হানে সুকঠোরব্যর্থ ব্যথা। পাপী পুত্র ত্যাজ্য বিধাতার,তাই তা'রে ত্যজিতে না পারি,—আমি তা'রএকমাত্র; উন্মত্ত তরঙ্গ মাঝখানেযে পুত্র সঁপেছে অঙ্গ তা'রে কোন্ প্রাণেছাড়ি যাব।—উদ্ধারের আশা ত্যাগ করি,তবু তা'রে প্রাণপণে বক্ষে চাপি ধরি,তারি সাথে এক পাপে ঝাঁপ দিয়া পড়ি,এক বিনাশের তলে তলাইয়া মরি
অকাতরে,—অংশ লই তা'র দুর্গতির,—অর্ধ ফল ভােগ করি তা'র দুর্ম্মতির,—সেই ত সান্ত্বনা মাের,—এখন ত আরবিচারের কাল নাই—নাই প্রতিকার,নাই পথ,—ঘটেছে যা ছিল ঘটিবার,ফলিবে যা ফলিবার আছে।
( প্রস্থান)
গান্ধারী
হে আমারঅশান্ত হৃদয়, স্থির হও। নতশিরেপ্রতীক্ষা করিয়া থাক বিধির বিধিরেধৈর্য্য ধরি। যে দিন সুদীর্ঘ রাত্রি পরেসদ্য জেগে উঠে কাল, সংশােধন করেআপনারে, সেদিন দারুণ দুঃখদিন।দুঃসহ উত্তাপে যথা স্থির গতিহীনঘুমাইয়া পড়ে বায়ু-জাগে ঝঞ্ঝাঝড়েঅকস্মাৎ, আপনার জড়ত্বের পরেকরে আক্রমণ, অন্ধ বৃশ্চিকের মতভীমপুচ্ছে আত্মশিয়ে হানে অবিরত
দীপ্ত বজ্রশূল, সেই মত কাল যবেজাগে, তা’রে সভয়ে অকাল কহে সবে।লুটাও লুটাও শির, প্রণম, রমণী,সেই মহাকালে; তা'র রথচক্রধ্বনিদূর রুদ্রলােক হ’তে বজ্র-ঘর্ঘরিতওই শুনা যায়। তাের আর্ত্ত জর্জ্জরিতহৃদয় পাতিয়া রাখ তা'র পদতলে।ছিন্ন সিক্ত হৃৎপিণ্ডের রক্ত শতদলেঅঞ্জলি রচিয়া থাক্ জাগিয়া নীরবেচাহিয়া নিমেষহীন।—তা’র পরে যবেগগনে উড়িবে ধূলি, কঁপিবে ধরণী,সহসা উঠিবে শূন্যে ক্রন্দনের ধ্বনি-হায় হায় হা রমণী, হায় রে অনাথা,হায় হায় বীরবধূ, হায় বীরমাতা,হায় হায় হাহাকার—তখন সুধীরেধূলায় পড়িস লুটি’ অবনত শিরেমুদিয়া নয়ন। -তা'র পরে নমাে নমঃসুনিশ্চিত পরিণাম, নির্ব্বাক্ নির্ম্মমদারুণ করুণ শাস্তি; নমাে নমাে নমঃকল্যাণ কঠোর কান্ত, ক্ষমা স্নিগ্ধতম।নমাে নমাে বিদ্বেষের ভীষণা নির্ব্বৃতি,শ্মশানের ভস্মমাখা পরমা নিষ্কৃতি।
(দুর্য্যোধন-মহিষী ভানুমতীর প্রবেশ)
ভানুমতী
( দাসীগণের প্রতি)
ইন্দুমুখি! পরভৃতে! লহ তুলি শিরেমাল্যবস্ত্র অলঙ্কার।
গান্ধারী
বৎসে, ধীরে! ধীরেপৌরব ভবনে কোন্ মহােৎসব আজি?কোথা যাও নব বস্ত্রঅলঙ্কারে সাজিবধূ মাের?
ভানুমতী
শত্রুপরাভব-শুভক্ষণসমাগত।
গান্ধারী
শত্রু যার আত্মীয় স্বজনআত্মা তা'র নিত্য শত্রু, ধর্ম্ম শত্রু তা'র,অজেয় তাহার শত্রু। নব অলঙ্কারকোথা হ'তে, হে কল্যাণি?
ভানুমতী
জিনি বসুমতীভুজবলে, পাঞ্চালীরে তা’র পঞ্চপতিদিয়েছিল যত রত্ন মণি অলঙ্কার,যজ্ঞদিনে যাহা পরি ভাগ্য-অহঙ্কারঠিকরিত’ মাণিক্যের শত সূচীমুখেদ্রৌপদীর অঙ্গ হ’তে,—বিদ্ধ হ’ত বুকেকুরুকুলকামিনীর—সে রত্নভূষণেআমারে সাজায়ে তা’রে যেতে হ’ল বনে।
গান্ধারী
হা রে মূঢ়ে, শিক্ষা তবু হ’ল না তােমার,সেই রত্ন নিয়ে তবু এত অহঙ্কার।একি ভয়ঙ্করী কান্তি, প্রলয়ের সাজ।যুগান্তের উল্কাসম দহিছে না আজএ মণি-মঞ্জীর তােরে? রত্ন-ললাটিকাএ যে তাের সৌভাগ্যের বজ্রানলশিখা।তােরে হেরি অঙ্গে মাের ত্রাসের স্পন্দনসঞ্চারিছে,—চিত্তে মাের উঠিছে ক্রন্দন,—আনিছে শঙ্কিত কর্ণে, তাের অলঙ্কারউন্মাদিনী শঙ্করীর তাণ্ডব-ঝঙ্কার।
ভানুমতী
মাতঃ মােরা ক্ষত্রনারী! দুর্ভাগ্যের ভয়নাহি করি। কভু জয়, কভু পরাজয়,—মধ্যাহ্ন গগনে কভু, কভু অস্তধামেক্ষত্রিয়মহিমা সূর্য্য উঠে আর নামে।ক্ষত্রবীরাঙ্গনা মাতঃ সেই কথা স্মরিশঙ্কার বক্ষেতে থাকি সঙ্কটে না ডরিক্ষণকাল। দুর্দ্দিন-দুর্য্যোগ যদি আসে,বিমুখ ভাগ্যেরে তবে হানি’ উপহাসেকেমনে মরিতে হয় জানি তাহা দেবি,কেমনে বাঁচিতে হয়, শ্রীচরণ সেবি’সে শিক্ষাও লভিয়াছি।
গান্ধারী
বৎসে, অমঙ্গলএকেলা তােমার নহে। ল’য়ে দলবলসে যবে মিটায় ক্ষুধা উঠে হাহাকারকত বীর-রক্তস্রোতে কত বিধবারঅশ্রুধারা পড়ে আসি-রত্নঅলঙ্কারবধূহস্ত হ’তে খসি পড়ে শত শতচুতলতা-কুঞ্জবনে মঞ্জরীর মতঝাঞ্ঝাবাতে। বৎসে, ভাঙিয়াে না বদ্ধ সেতু!ক্রীড়াচ্ছলে তুলিয়াে না বিপ্লবের কেতু
গৃহমাঝে। আনন্দের দিন নহে আজি।স্বজন-দুর্ভাগ্য ল’য়ে সর্ব্ব অঙ্গে সাজিগর্ব্ব করিয়াে না মাতঃ! হ'য়ে সুসংযতআজ হ'তে শুদ্ধচিত্তে উপবাসব্রতকর আচরণ,—বেণী করি উন্মােচনশান্ত মনে কর বৎসে দেবতা-অৰ্চ্চন।এ পাপ-সৌভাগ্য দিনে গর্ব্ব-অহঙ্কারেপ্রতিক্ষণে লজ্জা দিয়ােনাক বিধাতারে।খুলে ফেল অলঙ্কার, নব রক্তাম্বর,থামাও উৎসববাদ্য, রাজআড়ম্বর,অগ্নিগৃহে যাও, পুত্রি, ডাক পুরােহিতে,কালেরে প্রতীক্ষা কর শুদ্ধসত্ত্ব চিতে।
(ভানুমতীর প্রস্থান)
(দ্রৌপদীসহ পঞ্চপাণ্ডবের প্রবেশ)
যুধিষ্ঠির
আশীর্ব্বাদ মাগিবারে এসেছি জননীবিদায়ের কালে।
গান্ধারী
সৌভাগ্যের দিনমণি।দুঃখরাত্রি-অবসানে দ্বিগুণ উজ্জ্বলউদিবে হে বৎসগণ! বায়ু হ'তে বল,
সূর্য্য হ’তে তেজ, পৃথ্বী হ’তে ধৈর্য্যক্ষমাকর লাভ, দুঃখব্রত পুত্র মাের! রমাদৈন্যমাঝে গুপ্ত থাকি দীন ছদ্মরূপেফিরুন্ পশ্চাতে তব, সদা চুপে চুপে।দুঃখ হ’তে তােমা তরে করুন্ সঞ্চয়অক্ষয় সম্পদ। নিত্য হউক্ নির্ভয়নির্ব্বাসনবাস।—বিনা পাপে দুঃখভােগঅন্তরে জ্বলন্ত তেজ করুক সংযােগ-বহ্নিশিখাদগ্ধ দীপ্ত সুবর্ণের প্রায়।সেই মহাদুঃখ হবে মহৎ সহায়তােমাদের। -সেই দুঃখে রহিবেন ঋণীধর্ম্মরাজ বিধি,—যবে শুধিবেন তিনিনিজহস্তে আত্মঋণ, তখন জগতেদেবনর কে দাঁড়াবে তােমাদের পথে।মাের পুত্র করিয়াছে যত অপরাধখণ্ডন করুক সব মাের আশীর্ব্বাদপুত্রাধিক পুত্রগণ! অন্যায় পীড়নগভীর কল্যাণসিন্ধু করুক্ মন্থন।
(দ্রৌপদীকে আলিঙ্গন পূর্ব্বক)
ভূলুণ্ঠিতা স্বর্ণলতা, হে বৎসে আমার,হে আমার রাহুগ্রস্ত শশী! একবার
তােল শির, বাক্য মাের কর অবধান।যে তােমারে অবমানে তারি অপমানজগতে রহিবে নিত্য, কলঙ্ক অক্ষয়।তব অপমান রাশি বিশ্বজগন্ময়ভাগ করে’ লইয়াছে সর্ব্ব কুলাঙ্গনাকাপুরুষতার হস্তে সতীর লাঞ্ছনা।যাও বৎসে, পতি সাথে অমলিন মুখ,অরণ্যেরে কর স্বর্গ, দুঃখে কর সুখ।বধূ মাের, সুদুঃসহ পতিদুঃখব্যথাবক্ষে ধরি, সতীত্বের লভ সার্থকতা।রাজগৃহে আয়ােজন দিবস যামিনসহস্র সুখের; বনে তুমি একাকিনীসর্ব্বসুখ, সর্ব্বসঙ্গ, সর্ব্বৈশ্বর্য্যময়,সকল সান্ত্বনা একা সকল আশ্রয়,ক্লান্তির আরাম, শান্তি, ব্যাধির শুশ্রূষা,দুর্দ্দিনের শুভলক্ষী, তামসীর ভূষাউষা মূর্ত্তিমতী। তুমি হবে একাকিনীসর্ব্বপ্রীতি, সর্ব্বসেবা, জননী, গেহিনী,—সতীত্বের শ্বেতপদ্ম সম্পূর্ণ সৌরভেশতদলে প্রস্ফুটিয়া জাগিবে গৌরবে।
Comments
Loading comments…