সতী

কাব্যগ্রন্থ — নাট্য কবিতা

অমাবাই

পিতঃ!

বিনায়ক রাও

পিতা? আমি তাের পিতা? পাপীয়সিস্বাতন্ত্র্যচারিণী! যবনের গৃহে পশিম্লেচ্ছগলে দিলি মালা কুলকলঙ্কিনী!আমি তাের পিতা?

অমাবাই

অন্যায় সমরে জিনিস্বহস্তে বধিলে তুমি পতিরে আমার,হায় পিতা, তবু তুমি পিতা! বিধাতারঅশ্রুপাতে পাছে লাগে মহা অভিশাপতব শিরে, তাই আমি দুঃসহ সন্তাপ

রুদ্ধ করি রাখিয়াছি এ বক্ষপঞ্জরে।তুমি পিতা, আমি কন্যা, বহুদিন পরেহয়েছে সাক্ষাৎ দোঁহে সমর-অঙ্গনেদারুণ নিশীথে। পিতঃ, আমি প্রণমি’ চরণেপদধূলি তুলি’ শিরে লইব বিদায়।আজ যদি নাহি পার ক্ষমিতে কন্যায়আমি তবে ভিক্ষা মাগি বিধাতার ক্ষমাতােমা লাগি পিতৃদেব!

বিনায়ক রাও

কোথা যাবি অমা?ধিক অশ্রুজল! ওরে দুর্ভাগিনী নারীযে বৃক্ষে বাঁধিলি নীড় ধর্ম্ম না বিচারি’সে ত বজ্রাহত দগ্ধ, যাবি কার কাছেইহকাল-পরকাল-হারা?

অমাবাই

পুত্র আছে-

বিনায়ক রাও

থাক পুত্র! ফিরে আর চাসনে পশ্চাতেপাতকের ভগ্নশেষ পানে। আজ রাতে

শোণিত-তর্পণে তাের প্রায়শ্চিত্ত শেষ,—যবনের গৃহে তাের নাহিক প্রবেশআর কভু। বল্ তবে কোথা যাবি আজ?

অমাবাই

হে নির্দ্দয়। আছে মৃত্যু, আছে যমরাজ,পিতা হ’তে স্নেহময়, মুক্তদ্বারে যারআশ্রয় মাগিয়া কেহ ফিরে নাই আর।

বিনায়ক রাও

মৃত্যু? বৎসে! হা দুর্বৃত্তে! পরম পাবকনির্ম্মল উদার মৃত্যু—সকল পাতককরে গ্রাস-সিন্ধু যথা সকল নদীরসব পঙ্করাশি। সেই মৃত্যু সুগভীরতাের মুক্তি গতি। কিন্তু মৃত্যু আজ না সে,নহে হেথা। চল্ তবে দূর তীর্থবাসেসলজ্জ স্বজন আর সক্রোধ সমাজপরি হরি; বিসর্জ্জি কলঙ্ক ভয় লাজজন্মভূমি ধূলিতলে। সেথা গঙ্গাতীরেনবীন নির্ম্মল বায়ু;—স্বচ্ছ পুণ্যনীরেতিন সন্ধ্যা স্নান করি’, নির্জ্জন কুটীরেশিব শিব শিব নাম জপি শান্ত মনে,সুদূর মন্দির হ’তে সায়াহ্ন পবনে

শুনিয়া আরতিধ্বনি,একদিন কবেআয়ুশেষে মৃত্যু তােরে লইবে নীরবে-পতিত কুসুমে ল’য়ে পঙ্ক ধুয়ে তা'রগঙ্গা যথা দেয় তা’রে পূজা-উপহারসাগরের পদে।

অমাবাই

পুত্র মাের!

বিনায়ক রাও

তা'র কথাদূর কর। অতীত-নির্ম্মুক্ত পবিত্রতাধৌত করে’ দিক্ তােরে। সদ্য শিশুসমআরবার আয় বৎসে পিতৃকোলে মমবিস্মৃতি মাতার গর্ভ হ'তে।নব দেশে,নব তরঙ্গিণীতীরে, শুভ্র হাসি হেসেনবীন কুটীরে মাের জ্বালাবি আলােককন্যার কল্যাণ করে।

অবাবাই

জ্বলে পতিশােক,বিশ্ব হেরি ছায়াসম; তােমাদের কথাদূর হতে আনে কানে ক্ষীণ অস্ফুটতা,

পশে না হৃদয়মাঝে। ছেড়ে দাও মােরে,ছেড়ে দাও! পতিরক্তসিক্ত স্নেহভডারেবেঁধাে না আমায়।

বিনায়ক রাও

কন্যা নহেক পিতার।শাখাচ্যুত পুষ্প শাখে ফিরেনাক আর।কিন্তু রে শুধাই তােরে কারে ক’স পতিলজ্জাহীনা! কাড়ি নিল যে ম্লেচ্ছ দুর্ম্মতিজীবাজির প্রসারিত বরহস্ত হ'তেবিবাহের রাত্রে তােরে-বঞ্চিয়া কপােতেশ্যেন যথা ল’য়ে যায় কপােত-বধূরেআপনার ম্লেচ্ছ নীড়ে,—সে দুষ্ট দস্যুরেপতি ক’স তুই!—সে রাত্রি কি মনে পড়ে?বিবাহ-সভায় সবে উৎসুক অন্তরেবসে' আছি,—শুভলগ্ন হ’ল গতপ্রায়,—জীবাজি আসে না কেন সবাই শুধায়,চায় পথপানে। দেখা দিল হেনকালেমশালের রক্তরশ্মি নিশীথের ভালে,শুনা গেল বাদ্যরব। হর্ষে উচ্ছ্বসিলঅন্তঃপুরে হুলুধ্বনি। দুয়ারে পশিল

শতেক শিবিকা; কোথা জীবাজি কোথায়শুধাতে না শুধাতেই, ঝটিকার প্রায়অকস্মাৎ কোলাহলে হতবুদ্ধি করিমুহূর্ত্তের মাঝে তােরে বলে অপহরিকে কোথা মিলাল। ক্ষণপরে নতশিরেজীবাজি বন্ধনমুক্ত এল ধীরে ধীরে-শুনিনু কেমনে তা'রে বন্দী করি পথে,ল'য়ে তা'র দীপমালা, চড়ি তা'র রথে,কাড়ি ল’য়ে পরি তা’র বর-পরিচ্ছদবিজাপুর যবনের রাজসভাসদদস্যুবৃত্তি করি গেল। সে দারুণরাতেহােমাগ্নি করিয়া স্পর্শ জীবাজির সাথেপ্রতিজ্ঞা করিনু আমি—দস্যরক্তপাতেলব এর প্রতিশােধ। বহুদিন পরেহয়েছি সে পণমুক্ত। নিশীথ সমরেজীবাজি ত্যজিয়া প্রাণ বীরের সদ্গতিলভিয়াছে। রে বিধবা, সেই তাের পতি,—দস্য সে ত ধর্ম্মনাশী!

অমাবাই

ধিক্ পিতা, ধিক!বধেছ পতিরে মাের-আরাে মর্ম্মান্তিক

এই মিথ্যা বাক্যশেল। তব ধর্ম্ম কাছেপতিত হয়েছি, তবু মম ধর্ম্ম আছেসমুজ্জ্বল। পত্নী আমি, নহি সেবাদাসী।বরমাল্যে বরেছিনু তাঁরে ভালবাসিশ্রদ্ধাভরে; ধরেছিনু পতির সন্তানগর্ভে মাের,—বলে করি নাই আত্মদান,মনে আছে দুই পত্র একদিন রাতেপেয়েছিনু অন্তঃপুরে গুপ্তদূতী হাতে।তুমি লিখেছিলে শুধু,—“হান তা'রে ছুরি,”মাতা লিখেছিল, “পত্রে বিষ দিনু পূরিকর তাহা পান।” যদি বলে পরাজিতঅসহায় সতীধর্ম্ম কেহ কেড়ে নিততা হ'লে কি এতদিন হ'ত না পালনতোমাদের সে আদেশ? হৃদয় অর্পণকরেছিনু বীরপদে। যবন ব্রাহ্মণসে ভেদ কাহার ভেদ? ধর্ম্মের সে নয়।অন্তরের অন্তর্যামী যেথা জেগে রয়সেথায় সমান দোঁহে। মাঝে মাঝে তবুসংস্কার উঠিত জাগি;—কোনাে দিন কভুনিগূঢ় ঘৃণার বেগ শিরায় অধীরহানিত বিদ্যুৎকম্প,—অবাধ্য শরীরসঙ্কোচে কুঞ্চিত হ'ত;—কিন্তু তারো পরে

সতীত্ব হয়েছে জয়ী। পূর্ণ ভক্তিভরেকরেছি পতির পূজা; হয়েছি যবনীপবিত্র অন্তরে; নহি পতিতা রমণী,—পরিতাপে অপমানে অবনতশিরেমাের পতিধর্ম্ম হ’তে নাহি যাব ফিরেধর্ম্মান্তরে অপরাধীসম।—এ কি, এ কি!নিশীথের উল্কাসম এ কাহারে দেখিছুটে আসে মুক্তকেশে!

( রমাবাইয়ের প্রবেশ)

জননী আমার!কখনাে যে দেখা হবে এ জনমে আরহেন ভাবি নাই মনে। মাগাে, মা জননিদেহ তব পদধূলি।

রমাবাই

ছুঁসনে যবনীপাতকিনী!

অমাবাই

কোনাে পাপ নাই মাের দেহে,—নির্ম্মল তােমারি মত।

রমাবাই

যবনের গেহেকার কাছে সমর্পিলি ধর্ম্ম আপনার?

অমাবাই

পতি কাছে।

রমাবাই

পতি? ম্লেচ্ছ, পতি সে তােমার?জানিস্ কাহারে বলে পতি? নষ্টমতি,ভ্রষ্টাচার! রমণীর সে যে এক গতি,একমাত্র ইষ্টদেব। স্লেচ্ছ মুসলমান,ব্রাহ্মণ কন্যার পতি? দেবতা সমান?

অমাবাই

উচ্চ বিপ্রকুলে জন্মি’ তবুও যবনেঘৃণা করি নাই আমি, কায়বাক্যেমনেপূজিয়াছি পতি বলি’; মােরে করে ঘৃণাএমন কে সতী আছে? নহি আমি হীনাজননী তােমার চেয়ে,—হবে মাের গতিসতীস্বর্গলােকে।

রমাবাই

সতী তুমি?

অমাবাই

আমি সতী।

রমাবাই

জানিস্ মরিতে অসঙ্কোচে?

অমাবাই

জানি আমি।

রমাবাই

তবে জ্বাল চিতানল! ওই তাের স্বামীপড়িয়া সমরভূমে।

অমাবাই

জীবাজি?

রমাবাই

জীবাজি।বাক্‌দত্ত পতি তাের। তারি ভস্মে আজিভস্ম মিলাইতে হবে। বিবাহ রাত্রিরবিফল হােমাগ্নিশিখা শ্মশানভূমির

ক্ষুধিত চিতাগ্নিরূপে উঠেছে জাগিয়া;আজি রাত্রে সে রাত্রির অসমাপ্ত ক্রিয়াহবে সমাপন।

বিনায়ক

যাও বৎসে, যাও ফিরেতব পুত্র কাছে, তব শােকতপ্ত নীড়ে।দারুণ কর্ত্তব্য মাের নিঃশেষ করিয়াকরেছি পালন,—যাও তুমি।—অয়ি প্রিয়াবৃথা করিতেছ ক্ষোভ। যে নব শাখারেআমাদের বৃক্ষ হ'তে কঠিন কুঠারেছিন্ন করি নিয়ে গেল বনান্তর ছায়ে,সেথা যদি বিশীর্ণা সে মরিত শুকায়েঅগ্নিতে দিতাম তা'রে; সে যে ফলেফুলেনব প্রাণে বিকশিত, নব নব মূলেনূতন মৃত্তিকা ছেয়ে। সেথা তা'র প্রীতি,সেথাকার ধর্ম্ম তা’র, সেথাকার রীতি।অন্তরের যােগসূত্র ছিঁড়েছে যখনতােমার নিয়মপাশ নির্জ্জীব বন্ধনধর্ম্মে বাঁধিছে না তা'রে, বাঁধিতেছে বলে।ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও!–যাও বৎসে চলে',

যাও তব গৃহকর্ম্মে ফিরে,—যাও তবস্নেহপ্রীতিজড়িত সংসারে,—অভিনবধর্ম্মক্ষেত্র মাঝে। এস প্রিয়ে, মােরা দোঁহেচলে' যাই তীর্থধামে কাটি মায়ামােহেসংসারের দুঃখ সুখ চক্র আবর্ত্তনত্যাগ করি’,—

রমাবাই

তা’র আগে করিব ছেদনআমার সংসার হ'তে পাপের অঙ্কুরযতগুলি জন্মিয়াছে। করি যাব দূরআমার গর্ভের লজ্জা। কন্যার কুযশেমাতার সতীত্বে যেন কলঙ্ক পরশে।অনলে অঙ্গারসম সে কলঙ্ককালীতুলিব উজ্জ্বল করি চিতানল জ্বালি'।সতীখ্যাতি রটাইব দুহিতার নামেসতী মঠ উঠাইব এ শ্মশানধামেকন্যার ভস্মের পরে।

অমাবাই

ছাড় লােকলাজলােকখ্যাতি,—হে জননী এ নহে সমাজ,

এ মহাশ্মশানভূমি। হেথা পুণ্যপাপলােকের মুখের বাক্যে করিয়াে না মাপ,—সত্যেরে প্রত্যক্ষ কর মৃত্যুর আলােকে।সতী আমি। ঘৃণা যদি করে মােরে লােকেতবু সতী আমি। পরপুরুষের সনেমাতা হ'য়ে বাঁধ যদি মৃত্যুর মিলনেনির্দ্দোষ কন্যারে—লােকে তােরে ধন্য কবে—কিন্তু মাতঃ নিত্যকাল অপরাধী র'বেশশ্মশানের অধীশ্বর পদে।

রমাবাই

জ্বাল চিতা,সৈন্যগণ! ঘের’ আসি বন্দিনীরে।

অমাবাই

পিতা!

বিনায়ক

ভয় নাই, ভয় নাই! হায় বৎসে হায়মাতৃহস্ত হ'তে আজি রক্ষিতে তােমায়পিতারে ডাকিতে হ’ল। -যেই হস্তে তােরেবক্ষে বেঁধে রেখেছিনু, কে জানিত ওরে

ধর্ম্মেরে করিতে রক্ষা, দোষীরে দণ্ডিতেসেই হস্তে একদিন হইবে খণ্ডিতেতােমারি সৌভাগ্যসূত্র হে বৎসে আমার!

অমাবাই

পিতা!

বিনায়ক

আয় বৎসে! বৃথা আচার বিচার।পুত্রে ল’য়ে মাের সাথে আয় মাের মেয়েআমার আপন ধন। সমাজের চেয়েহৃদয়ের নিত্যধর্ম্ম সত্য চিরদিন।পিতৃস্নেহ নির্ব্বিচার বিকারবিহীনদেবতার বৃষ্টিসম,—আমার কন্যারেসেই শুভ স্নেহ হ'তে কে বঞ্চিতে পারেকোন্ শাস্ত্র, কোন্ লোক, কোন্ সমাজেরমিথ্যা বিধি, তুচ্ছ ভয়?

রমাবাই

কোথা যাস্! ফের।রে পাপিষ্ঠে, ওই দেখ তাের লাগি প্রাণযে দিয়েছে রণভূমে,—তা’র প্রাণদান

নিস্ফল হবে না,—তােরে লইবে সে সাথেবরবেশে, ধরি তাের মৃত্যুপূত হাতেশূরস্বর্গ মাঝে। শুন, যত আছ বীরতােমরা সকলে ভক্ত ভৃত্য জীবাজির,—এই তাঁর বাকদত্তা বধূ,—চিতানলেমিলন ঘটায়ে দাও মিলিয়া সকলেপ্রভুকৃত্য শেষ কর।

সৈন্যগণ

ধন্য পুণ্যবতী!

অমাবাই

পিতা!

বিনায়ক রাও

ছাড় তােরা!

সৈন্যগণ

যিনি এ নারীর পতিতাঁর অভিলাষ মােরা করিব পূরণ।

বিনায়ক

পতি এঁর স্বধর্ম্মী যবন।

সেনাপতি

সৈন্যগণ,বাঁধ বৃদ্ধ বিনায়কে।

অমাবাই

মাতঃ! পাপীয়সি!পিশাচিনি!

রমাবাই

মূঢ় তােরা কি করিস বসি’!বাজা বাদ্য, কর জয়ধ্বনি।

সৈন্যগণ

জয় জয়।

অমাবাই

নারকিনী!

সৈন্যগণ

জয় জয়।

রমাবাই

রটা বিশ্বময়সতী অমা।

অমাবাই

জাগ, জাগ, জাগ, ধর্ম্মরাজ!শ্মশানের অধীশ্বর, জাগ তুমি আজ।হের তব মহারাজ্যে করিছে উৎপাতক্ষুদ্র শত্রু,—জাগ’, তা'রে কর বজ্রাঘাতদেবদেব! তব নিত্যধর্ম্মে কর জয়ীক্ষুদ্র ধর্ম্ম হ'তে।

রমাবাই

বল্ জয় পুণ্যময়ী,বল্ জয় সতী।

সৈন্যগণ

জয় জয় পুণ্যবতী।

অমাবাই

পিতা, পিতা, পিতা মাের!

সৈন্যগণ

ধন্য ধন্য সতী!

Comments

Loading comments…