বিদায়-অভিশাপ
কাব্যগ্রন্থ
কচ
দেহ আজ্ঞা, দেবযানী, দেবলোকে দাসকরিবে প্রয়াণ। আজি গুরুগৃহবাসসমাপ্ত আমার। আশীর্ব্বাদ কর মোরেযে বিদ্যা শিখিনু তাহা চিরদিন ধরে'অন্তরে জাজ্জ্বল্য থাকে উজ্জ্বল রতন,সুমেরুশিখরশিরে সূর্য্যের মতন,অক্ষয় কিরণ।
দেবযানী
মনােরথ পূরিয়াছে,পেয়েছ দুর্লভ বিদ্যা আচার্য্যের কাছে,সহস্রবর্ষের তব দুঃসাধ্য সাধনাসিদ্ধ আজি; আর কিছু নাহি কি কামনাভেবে দেখ মনে মনে!
কচ
আর কিছু নাহি।
দেবযানী
কিছু নাই? তবু আরবার দেখ চাহিঅবগাহি হৃদয়ের সীমান্ত অবধিকরহ সন্ধান; অন্তরের প্রান্তে যদিকোনাে বাঞ্ছা থাকে, কুশের অঙ্কুরসমক্ষুদ্র দৃষ্টি-অগােচর, তবু তীক্ষ্ণতম।
কচ
আজি পূর্ণ কৃতার্থ জীবন। কোনাে ঠাইমাের মাঝে কোনাে দৈন্য কোনাে শূন্য নাইসুলক্ষণে!
দেবযানী
তুমি সুখী ত্রিজগৎ মাঝে।যাও তবে ইন্দ্রলােকে আপনার কাজে
উচ্চশিরে গৌরব বহিয়া। স্বর্গপুরেউঠিবে আনন্দধ্বনি, মনােহর সুরেবাজিবে মঙ্গল-শঙ্খ, সুরাঙ্গনাগণকরিবে তােমার শিরে পুষ্প বরিষণসদ্যছিন্ন নন্দনের মন্দার-মঞ্জরী।স্বর্গপথে কলকণ্ঠে অপ্সরী কিন্নরীদিবে হুলুধ্বনি। আহা, বিপ্র, বহুক্লেশেকেটেছে তােমার দিন বিজনে বিদেশেসুকঠোর অধ্যয়নে। নাহি ছিল কেহস্মরণ করায়ে দিতে সুখময় গেহ,নিবারিতে প্রবাস-বেদনা। অতিথিরেযথাসাধ্য পূজিয়াছি দরিদ্রকুটীরেযাহা ছিল দিয়ে। তাই বলে' স্বর্গসুখকোথা পাব, কোথা হেথা অনিন্দিত মুখসুরললনার। বড় আশা করি মনেআতিথ্যের অপরাধ র’বে না স্মরণেফিরে গিয়ে সুখলােকে।
কচ
সুকল্যাণ হাসেপ্রসন্ন বিদায় আজি দিতে হবে দাসে।
দেবযানী
হাসি? হায় সখা, এ ত স্বর্গপুরী নয়!পুষ্পে কীটসম হেথা তৃষ্ণা জেগে রয়মর্ম্মমাঝে, বাঞ্ছা ঘুরে বাঞ্ছিতেরে ঘিরে,লাঞ্ছিত ভ্রমর যথা বারম্বার ফিরেমুদিত পদ্মের কাছে। হেথা সুখ গেলেস্মৃতি একাকিনী বসি দীর্ঘশ্বাস ফেলেশূন্যগৃহে; হেথায় সুলভ নহে হাসি।যাও বন্ধু, কি হইবে মিথ্যা কাল নাশি,'উৎকণ্ঠিত দেবগণ।—
যেতেছ চলিয়া?সকলি সমাপ্ত হ’ল দু’কথা বলিয়া!দশশত বর্ষ পরে এই কি বিদায়?
কচ
দেবযানী, কি আমার অপরাধ?
দেবযানী
হায়!সুন্দরী অরণ্যভূমি সহস্র বৎসরদিয়েছে বল্লভ ছায়া, পল্লবমর্ম্মর,
শুনায়েছে বিহঙ্গকূজন,—তা'রে আজিএতই সহজে ছেড়ে যাবে? তরুরাজিম্লান হ'য়ে আছে যেন, হের আজিকারবনচ্ছায় গাঢ়তর শােকে অন্ধকার,কেঁদে ওঠে বায়ু, শুষ্ক পত্র ঝরে' পড়ে,তুমি শুধু চলে' যাবে সহাস্য অধরেনিশান্তের সুখস্বপ্নসম?
কচ
দেবযানী,এ বনভূমিরে আমি মাতৃভূমি মানি,হেথা মাের নবজন্মলাভ। এর পরেনাহি মাের অনাদর,—চির প্রীতিভরেচিরদিন করিব স্মরণ।
দেবযানী
এই সেইবটতল, যেথা তুমি প্রতি দিবসেইগােধন চরাতে এসে পড়িতে ঘুমায়েমধ্যাহ্নের খরতাপে; ক্লান্ত তব কায়েঅতিথিবৎসল তরু দীর্ঘ ছায়াখানিদিত বিছাইয়া, সুখসুপ্তি দিত আনি
ঝর্ঝর পল্লবদলে করিয়া বীজনমৃদুস্বরে;—যেয়াে সখা, তবু কিছুক্ষণপরিচিত তরুতলে বস’ শেষবারনিয়ে যাও সম্ভাষণ এ স্নেহছায়ার-দুই দণ্ড থেকে যাও, সে বিলম্বে তবস্বর্গের হবে না কোনাে ক্ষতি।
কচ
অভিনববলে' যেন মনে হয় বিদায়ের ক্ষণেএই সব চিরপরিচিত বন্ধুগণে;পলাতক প্রিয়জনে বাঁধিবার তরেকরিছে বিস্তার সবে ব্যগ্র স্নেহভরেনূতন বন্ধনজাল, অন্তিম মিনতি,অপূর্ব্ব সৌন্দর্য্যরাশি। ওগাে বনস্পতি,আশ্রিতজনের বন্ধু, করি নমস্কার।কত পান্থ বসিবেক ছায়ায় তােমার,কত ছাত্র কত দিন আমার মতনপ্রচ্ছন্ন প্রচ্ছায়তলে নীরব নির্জ্জনতৃণাসনে, পতঙ্গের মৃদুগুঞ্জস্বরে,করিবেক অধ্যয়ন; প্রাতঃস্নান পরে
ঋষিবালকেরা আসি সজল বল্কলশুকাবে তােমার শাখে; রাখালের দলমধ্যাহ্নে করিবে খেলা, ওগাে তারি মাঝেএ পুরানাে বন্ধু যেন স্মরণে বিরাজে।
দেবযানী
মনে রেখাে আমাদের হােমধেনুটিরে;স্বর্গসুধা পান করে' সে পুণ্য গাভীরেভুলাে না গরবে।
কচ
সুধা হ’তে সুধাময়দুগ্ধ তা’র; দেখে তারে পাপক্ষয় হয়,মাতৃরূপা, শান্তিস্বরূপিণী, শুভ্রকান্তিপয়স্বিনী। না মানিয়া ক্ষুধাতৃষ্ণা শ্রান্তিতা'রে করিয়াছি সেবা; গহন কাননেশ্যামশস্প স্রোতস্বিনী তীরে, তারি সনেফিরিয়াছি দীর্ঘ দিন; পরিতৃপ্তিভরেস্বেচ্ছামতে ভােগ করি’ নিম্নতট পরেঅপর্যাপ্ত তৃণরাশি সুস্নিগ্ধ কোমল-আলস্য-মন্থর তনু লভি’ তরুতলরােমন্থ করেছে ধীরে শুয়ে তৃণাসনেসারাবেলা; মাঝে মাঝে বিশাল নয়নে
সকৃতজ্ঞ শান্তদৃষ্টি মেলি’, গাঢ়স্নেহচক্ষু দিয়া লেহন করেছে মাের দেহ।মনে র’বে সেই দৃষ্টি স্নিগ্ধ অচঞ্চল,পরিপুষ্ট শুভ্র তনু চিক্কণ পিচ্ছল।
দেবযানী
আর মনে রেখাে, আমাদের কলস্বনাস্রোতস্বিনী বেণুমতী।
কচ
তা'রে ভুলিব না।বেণুমতী, কত কুসুমিত কুঞ্জ দিয়েমধুকণ্ঠে অনিন্দিত কলগান নিয়েআসিছে শুশ্রূষা বহি গ্রামবধূসমসদা ক্ষিপ্রগতি, প্রবাসসঙ্গিনী মমনিত্য শুভব্রতা।
দেবযানী
হায় বন্ধু, এ প্রবাসেআরাে কোনাে সহচরী ছিল তব পাশে,পরগৃহবাসদুঃখ ভুলাবার তরেযত্ন তা’র ছিল মনে রাত্রি দিন ধরে';—হায় রে দুরাশা!
কচ
চিরজীবনের সনেতা’র নাম গাঁথা হ'য়ে গেছে।
দেবযানী
আছে মনেযেদিন প্রথম তুমি আসিলে হেথায়কিশাের ব্রাহ্মণ, তরুণ অরুণপ্রায়গৌরবর্ণ তনুখানি স্নিগ্ধ দীপ্তিঢালা,চন্দনে চর্চ্চিত ভাল, কণ্ঠে পুষ্পমালা,পরিহিত পট্টবাস, অধরে নয়নেপ্রসন্ন সরল হাসি, হােথা পুষ্পবনেদাঁড়ালে আসিয়া-
কচ
তুমি সদ্য স্নান করিদীর্ঘ আর্দ্র কেশজালে, নব শুক্লাম্বরীজ্যোতিস্নাত মূর্ত্তিমতী ঊষা, হাতে সাজিএকাকী তুলিতেছিলে নব পুষ্পরাজিপূজার লাগিয়া। কহিনু করি বিনতি“তােমারে সাজে না শ্রম, দেহ অনুমতিফুল তুলে দিব দেবী।”
দেবযানী
আমি সবিস্ময়সেই ক্ষণে শুধানু তােমার পরিচয়।বিনয়ে কহিলে,—আসিয়াছি তব দ্বারেতােমার পিতার কাছে শিষ্য হইবারেআমি বৃহস্পতিসুত।
কচ
শঙ্কা ছিল মনেপাছে দানবের গুরু স্বর্গের ব্রাহ্মণেদেন ফিরাইয়া।
দেবযানী
আমি গেনু তাঁর কাছে।হাসিয়া কহিনু-পিতা, ভিক্ষা এক আছেচরণে তােমার।—স্নেহে বসাইয়া পাশেশিরে মাের দিয়ে হাত শান্ত মৃদু ভাষেকহিলেন—কিছু নাহি অদেয় তােমারে।কহিলাম—বৃহস্পতিপুত্র তব দ্বারেএসেছেন, শিষ্য করি লহ তুমি তাঁরেএ মিনতি। সে আজিকে হ’ল কত কালতবু মনে হয় যেন সেদিন সকাল।
কচ
ঈর্ষ্যাভরে তিনবার দৈত্যগণ মােরেকরিয়াছে বধ, তুমি দেবী দয়া করে'ফিরায়ে দিয়েছ মাের প্রাণ, সেই কথাহৃদয়ে জাগায়ে র'বে চির-কৃতজ্ঞতা।
দেবযানী
কৃতজ্ঞতা! ভুলে যেয়াে, কোনাে দুঃখ নাই।উপকার যা করেছি হ'য়ে যাক ছাই—নাহি চাই দান প্রতিদান। সুখস্মৃতিনাহি কিছু মনে? যদি আনন্দের গীতিকোনাে দিন বেজে থাকে অন্তরে বাহিরে,যদি কোনাে সন্ধ্যাবেলা বেণুমতী-তীরেঅধ্যয়ন-অবসরে বসি পুষ্পবনেঅপূর্ব্ব পুলকরাশি জেগে থাকে মনে;ফুলের সৌরভসম হৃদয়-উচ্ছ্বাসব্যাপ্ত করে' দিয়ে থাকে সায়াহ্ন আকাশ,ফুটন্ত নিকুঞ্জতল, সেই সুখকথামনে রেখাে -দূর হ'য়ে যাক্ কৃতজ্ঞতা।যদি সখা হেথা কেহ গেয়ে থাকে গানচিত্তে যাহা দিয়েছিল সুখ; পরিধান
করে' থাকে কোনাে দিন হেন বস্ত্রখানিযাহা দেখে মনে তব প্রশংসার বাণীজেগেছিল, ভেবেছিলে প্রসন্ন অন্তরতৃপ্ত চোখে, আজি এরে দেখায় সুন্দর;সেই কথা মনে কোনাে অবসরক্ষণেসুখস্বর্গধামে। কতদিন এই বনেদিক্ দিগন্তরে, আষাঢ়ের নীল জটা,শ্যামস্নিগ্ধ বরষার নবঘনঘটানেবেছিল, অবিরল বৃষ্টিজলধারেকর্ম্মহীন দিনে সঘন কল্পনাভারেপীড়িত হৃদয়; এসেছিল কতদিনঅকস্মাৎ বসন্তের বাধাবন্ধহীনউল্লাস-হিল্লোলাকুল যৌবন-উৎসাহ,সঙ্গীত-মুখর সেই আবেগ প্রবাহলতায় পাতায় পুষ্পে বনে বনান্তরেব্যাপ্ত করি’ দিয়াছিল লহরে লহরেআনন্দপ্লাবন; ভেবে দেখ একবারকত ঊষা, কত জ্যোৎস্না, কত অন্ধকারপুষ্পগন্ধঘন অমানিশা, এই বনেগেছে মিশে সুখে দুঃখে তােমার জীবনে,—তারি মাঝে হেন প্রাতঃ, হেন সন্ধ্যাবেলা,হেন মুগ্ধরাত্রি, হেন হৃদয়ের খেলা,
হেন সুখ, হেন মুখ দেয় নাই দেখাযাহা মনে আঁকা র'বে চির চিত্ররেখাচিররাত্রি চিরদিন? শুধু উপকার!শােভা নহে, প্রীতি নহে, কিছু নহে আর?
কচ
আর যাহা আছে তাহা প্রকাশের নয়সখি! বহে যাহা মর্ম্মমাঝে রক্তময়বাহিরে তা কেমনে দেখাব?
দেবযানী
জানি সখে,তােমার হৃদয় মাের হৃদয়-আলােকেচকিতে দেখেছি কতবার, শুধু যেনচক্ষের পলকপাতে; তাই আজি হেনস্পর্দ্ধা রমণীর। থাকো তবে, থাকো তবে,যেওনাকো। সুখ নাই যশের গৌরবে।হেথা বেণুমতী-তীরে মােরা দুই জনঅভিনব স্বর্গলােক করিব সৃজনএ নির্জ্জন বনচ্ছায়া সাথে মিশাইয়ানিভৃত বিশ্রব্ধ মুগ্ধ দুইখানি হিয়ানিখিল-বিস্মৃত। ওগাে বন্ধু, আমি জানিরহস্য তােমার।
কচ
নহে, নহে, দেবযানী।
দেবযানী
নহে? মিথ্যা প্রবঞ্চনা! দেখি নাই আমিমন তব? জান না কি প্রেম অন্তর্যামী?বিকশিত পুষ্প থাকে পল্লবে বিলীন,গন্ধ তা’র লুকাবে কোথায়? কতদিনযেমনি তুলেছ মুখ, চেয়েছ যেমনি,যেমনি শুনেছ তুমি মোর কণ্ঠধ্বনিঅমনি সর্ব্বাঙ্গে তব কম্পিয়াছে হিয়া,—নড়িলে হীরক যথা পড়ে ঠিকরিয়াআলোেক তাহার। সে কি আমি দেখি নাই?ধরা পড়িয়াছ বন্ধু বন্দী তুমি তাইমাের কাছে। এ বন্ধন নারিবে কাটিতে।ইন্দ্র আর তব ইন্দ্র নহে।
কচ
শুচিস্মিতে,সহস্র বৎসর ধরি এ দৈত্যপুরীতেএরি লাগি করেছি সাধনা?
দেবযানী
কেন নহে?বিদ্যারি লাগিয়া শুধু লােকে দুঃখ সহেএ জগতে? করেনি কি রমণীর লাগিকোনাে নর মহাতপ? পত্নীবর মাগিকরেন নি সম্বরণ তপতীর আশেপ্রখর সূর্য্যের পানে তাকায়ে আকাশেঅনাহারে কঠোর সাধনা কত? হায়,বিদ্যাই দুর্লভ শুধু, প্রেম কি হেথায়এতই সুলভ? সহস্র বৎসর ধরে’সাধনা করেছ তুমি কি ধনের তরেআপনি জান না তাহা। বিদ্যা একধারেআমি একধারে-কভু মােরে কভু তা'রেচেয়েছ সােৎসুকে; তব অনিশ্চিত মনদোঁহারেই করিয়াছে যত্নে আরাধনসঙ্গোপনে। আজ মােরা দোঁহে একদিনেআসিয়াছি ধরা দিতে। লহ সখা চিনেযারে চাও! বল যদি সরল সাহসে“বিদ্যায় নাহিক সুখ, নাহি সুখ যশে,দেবযানী, তুমি শুধু সিদ্ধি মূর্ত্তিমতী,তােমারেই করিনু বরণ”, নাহি ক্ষতি
নাহি কোনাে লজ্জা তাহে। রমণীর মনসহস্রবর্ষেরই সখা সাধনার ধন।
কচ
দেব-সন্নিধানে শুভে করেছিনু পণমহাসঞ্জীবনী বিদ্যা করি’ উপাৰ্জ্জনদেবলােকে ফিরে যাব; এসেছিনু তাই,সেই পণ মনে মাের জেগেছে সদাই,পূর্ণ সেই প্রতিজ্ঞা আমার, চরিতার্থএতকাল পরে এ জীবন; কোনাে স্বার্থকরি না কামনা আজি।
দেবযানী
ধিক্ মিথ্যাভাষীশুধু বিদ্যা চেয়েছিলে? গুরুগৃহে আসি’শুধু ছাত্ররূপে তুমি আছিলে নির্জ্জনেশাস্ত্র গ্রন্থে রাখি আঁখি রত অধ্যয়নেঅহরহ? উদাসীন আর সবা পরে?ছাড়ি অধ্যয়নশালা বনে বনান্তরেফিরিতে পুষ্পের তরে, গাঁথি মাল্যখানিসহাস্য প্রফুল্ল মুখে কেন দিতে আনি
এ বিদ্যাহীনারে? এই কি কঠোর ব্রত?এই তব ব্যবহার বিদ্যার্থীর মত?প্রভাতে রহিতে অধ্যয়নে, আমি আসিশূন্য সাজি হাতে ল’য়ে দাঁড়াতেম হাসি,তুমি কেন গ্রন্থ রাখি উঠিয়া আসিতে,প্রফুল্ল শিশিরসিক্ত কুসুমরাশিতেকরিতে আমার পূজা? অপরাহুকালেজলসেক করিতাম তরু-আলবালে,আমারে হেরিয়া শ্রান্ত কেন দয়া করি’দিতে জল তুলে? কেন পাঠ পরিহরিপালন করিতে মোর মৃগশিশুটিকে?স্বর্গ হ'তে যে সঙ্গীত এসেছিলে শিখেকেন তাহা শুনাইতে, সন্ধ্যাবেলা যবেনদীতীরে অন্ধকার নামিত নীরবেপ্রেমনত নয়নের স্নিগ্ধচ্ছায়াময়দীর্ঘ পল্লবের মত? আমার হৃদয়বিদ্যা নিতে এসে কেন করিলে হরণস্বর্গের চাতুরীজালে? বুঝেছি এখন,আমারে করিয়া বশ পিতার হৃদয়েচেয়েছিলে পশিবারে—কৃতকার্য্য হ'য়েআজ যাবে মােরে কিছু দিয়ে কৃতজ্ঞতা;লৰূমনােরথ অর্থ রাজদ্বারে যথা
দ্বারীহস্তে দিয়ে যায় মুদ্রা দুই চারিমনের সন্তোষে?—
কচ
হা অভিমানিনী নারী;সত্য শুনে কি হইবে সুখ? ধর্ম্ম জানে,প্রতারণা করি নাই; অকপট প্রাণেআনন্দ অন্তরে তব সাধিয়া সন্তোষ,সেবিয়া তােমারে যদি করে' থাকি দোষতা’র শাস্তি দিতেছেন বিধি। ছিল মনেকব না সে কথা! বল কি হইবে জেনেত্রিভুবনে কারাে যাহে নাই উপকার,একমাত্র শুধু যাহা নিতান্ত আমারআপনার কথা। ভালবাসি কি না আজসে তর্কে কি ফল? আমার যা আছে কাজসে আমি সাধিব। স্বর্গ আর স্বর্গ বলে’যদি মনে নাহি লাগে, দূর বনতলেযদি ঘুরে মরে চিত্ত বিদ্ধমৃগসম,চিরতৃষ্ণা লেগে থাকে দগ্ধ প্রাণে মমসর্ব্বকার্য্য মাঝে—তবু চলে' যেতে হবেসুখশূন্য সেই স্বর্গধামে। দেব সবে
এই সঞ্জীবনী বিদ্যা করিয়া প্রদাননূতন দেবত্ব দিয়া তবে মাের প্রাণসার্থক হইবে; তার পূর্ব্বে নাহি মানিআপনার সুখ। ক্ষম মােরে, দেবযানী,ক্ষম অপরাধ।
দেবযানী
ক্ষমা কোথা মনে মাের?করেছ এ নারীচিত্ত কুলিশ-কঠোরহে ব্রাহ্মণ! তুমি চলে' যাবে স্বর্গলােকেসগৌরবে, আপনার কর্ত্তব্য-পুলকেসর্ব্ব দুঃখশােক করি দূর-পরাহত;আমার কি আছে কাজ, কি আমার ব্রত?আমার এ প্রতিহত নিষ্ফল জীবনেকি রহিল, কিসের গৌরব? এই বনেবসে' র’ব নতশিরে নিঃসঙ্গ একাকীলক্ষ্যহীনা। যে দিকেই ফিরাইব আঁখিসহস্র স্মৃতির কাঁটা বিঁধিবে নিষ্ঠুর;লুকায়ে বক্ষের তলে লজ্জা অতি ক্রূরবারম্বার করিবে দংশন। ধিক্ ধিক,কোথা হ'তে এলে তুমি, নির্ম্মম পথিক,
বসি’ মাের জীবনের বনচ্ছায়াতলেদণ্ড দুই অবসর কাটাবার ছলেজীবনের সুখগুলি-ফুলের মতনছিন্ন করে' নিয়ে-মালা করেছ গ্রন্থনএকখানি সূত্র দিয়ে; যাবার বেলায়সে মালা নিলে না গলে, পরম হেলায়সেই সূক্ষম সূত্রখানি দুই ভাগ করে'ছিঁড়ে দিয়ে গেলে। লুটাইল ধূলিপরেএ প্রাণের সমস্ত মহিমা। তােমা পরেএই মাের অভিশাপ-যে বিদ্যার তরেমােরে কর অবহেলা, সে বিদ্যা তােমারসম্পূর্ণ হ'বে না বশ;—তুমি শুধু তা'রভারবাহী হ'য়ে র'বে, করিবে না ভােগ,শিখাইবে, পারিবে না করিতে প্রয়ােগ।
কচ
আমি বর দিনু, দেবী, তুমি সুখী হবে।ভুলে যাবে সর্ব্বগ্লানি বিপুল গৌরবে।
Comments
Loading comments…