পরিশোধ

গীতবিতান — পরিশিষ্ট

শ্যামা। এখনো কেন সময় নাহি হল।নাম-না-জানা অতিথি—আঘাত হানিলে না দুয়ারে,কহিলে না ‘দ্বার খোলো’।হাজার লোকের মাঝেরয়েছি একেলা যে,এসে আমার হঠাৎ-আলো—পরান চমকি তোলো।আঁধার-বাধা আমার ঘরে,জানি না কাঁদি কাহার তরে।চরণসেবার সাধনা আনো,সকল দেবার বেদনা আনো,নবীন প্রাণের জাগরমন্ত্রকানে কানে বোলো।

রাজপথে

প্রহরীগণ। রাজার আদেশ ভাই—চোর ধরা চাই, চোর ধরা চাই।কোথা তারে পাই?যারে পাও তারে ধরো,কোনো ভয় নাই।

বজ্রসেনের প্রবেশ

প্রহরী। ধর্ ধর্, ওই চোর, ওই চোর।বজ্রসেন। নই আমি, নই নই নই চোর।অন্যায় অপবাদেআমারে ফেলো না ফাঁদে।নই আমি নই চোর।প্রহরী। ওই বটে, ওই চোর, ওই চোর।বজ্রসেন। এ কথা মিথ্যা অতি ঘোর।আমি পরদেশী—হেথা নেই স্বজন বন্ধু কেহ মোর।নই চোর, নই আমি নই চোর।শ্যামা। আহা মরি মরি,মহেন্দ্রনিন্দিতকান্তি উন্নতদর্শনকারে বন্দী ক’রে আনে চোরের মতনকঠিন শৃঙ্খলে।— শীঘ্র যা লো সহচরী,বল্ গে নগরপালে মোর নাম করি,শ্যামা ডাকিতেছে তারে। বন্দী সাথে লয়েএকবার আসে যেন আমার আলয়েদয়া করি।সহচরী। সুন্দরের বন্ধন নিষ্ঠুরের হাতে ঘুচাবে কে।নিঃসহায়ের অশ্রুবারি পীড়িতের চক্ষে মুছাবে কে।

আর্তের ক্রন্দনে হেরো ব্যথিত বসুন্ধরা,অন্যায়ের আক্রমণে বিষবাণে জর্জরা।প্রবলের উৎপীড়নে কে বাঁচাবে দুর্বলেরে—অপমানিতেরে কার দয়া বক্ষে লবে ডেকে।

প্রহরীদের প্রতি

শ্যামা। তোমাদের একি ভ্রান্তি—কে ওই পুরুষ দেবকান্তি,প্রহরী, মরি মরি—এমন ক’রে কি ওকে বাঁধে।দেখে যে আমার প্রাণ কাঁদে।বন্দী করেছ কোন্ দোষে।প্রহরী। চুরি হয়ে গেছে রাজকোষে—চোর চাই যে ক’রেই হোক।হোক-না সে যেই-কোনো লোক—নহিলে মোদের যাবে মান।শ্যামা। নির্দোষী বিদেশীর রাখো প্রাণ—দুই দিন মাগিনু সময়।প্রহরী। রাখিব তোমার অনুনয়।দুই দিন কারাগারে রবে,তার পর যা হয় তা হবে।বজ্রসেন। এ কী খেলা, হে সুন্দরী, কিসের এ কৌতুক।কেন দাও অপমানদুখ—মোরে নিয়ে কেন, কেন এ কৌতুক।শ্যামা। নহে নহে নহে এ কৌতুক।মোর অঙ্গের স্বর্ণ-অলঙ্কারসঁপি দিয়া, শৃঙ্খল তোমারনিতে পারি নিজদেহে। তব অপমানেমোর অন্তরাত্মা আজি অপমান মানে।

বজ্রসেন। কোন্ অযাচিত আশার আলোদেখা দিল রে তিমিররাত্রি ভেদি দুর্দিনদুর্যোগে।কাহার মাধুরী বাজাইল করুণ বাঁশি।অচেনা নির্মম ভুবনে দেখিনু এ কী সহসা—কোন্ অজানার সুন্দর মুখে সান্ত্বনাহাসি।

২

কারাঘর

শ্যামার প্রবেশ

বজ্রসেন। এ কী আনন্দ!হৃদয়ে দেহে ঘুচালে মম সকল বন্ধ।দুঃখ আমার আজি হল যে ধন্য,মৃত্যুগহনে লাগে অমৃতসুগন্ধ।এলে কারাগারে রজনীর পারে উষাসম,মুক্তিরূপা অয়ি লক্ষ্মী দয়াময়ী।শ্যামা। বোলো না বোলো না আমি দয়াময়ী।মিথ্যা, মিথ্যা, মিথ্যা!এ কারাপ্রাচীরে শিলা আছে যতনহে তা কঠিন আমার মতো।আমি দয়াময়ী!মিথ্যা, মিথ্যা, মিথ্যা।বজ্রসেন। জেনো প্রেম চিরঋণী আপনারই হরষে,জেনো, প্রিয়ে—সব পাপ ক্ষমা করি ঋণশোধ করে সে।কলঙ্ক যাহা আছেদূর হয় তার কাছে—কালিমার ’পরে তার অমৃত সে বরষে।

শ্যামা। হে বিদেশী, এসো এসো। হে আমার প্রিয়,এই কথা স্মরণে রাখিয়োতোমা-সাথে এক স্রোতে ভাসিলাম আমিহে হৃদয়স্বামী।জীবনে মরণে প্রভু।বজ্রসেন। প্রেমের জোয়ারে ভাসাবে দোঁহারে—বাঁধন খুলে দাও, দাও দাও।ভুলিব ভাবনা, পিছনে চাব না—পাল তুলে দাও, দাও দাও।প্রবল পবনে তরঙ্গ তুলিল—হৃদয় দুলিল, দুলিল দুলিল।পাগল হে নাবিক,ভুলাও দিগ্‌বিদিকপাল তুলে দাও, দাও দাও।শ্যামা। চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে—নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে।জীবন মরণ সুখ দুখ দিয়েবক্ষে ধরিব জড়ায়ে।স্খলিত শিথিল কামনার ভারবহিয়া বহিয়া ফিরি কত আর—নিজ হাতে তুমি গেঁথে নিয়ো হার,ফেলো না আমারে ছড়ায়ে।বিকায়ে বিকায়ে দীন আপনারেপারি না ফিরিতে দুয়ারে দুয়ারে—তোমার করিয়া নিয়ো গো আমারেবরণের মালা পরায়ে।

বজ্রসেন ও শ্যামা তরণীতে

শ্যামা। এবার ভাসিয়ে দিতে হবে আমার এই তরী।তীরে বসে যায় যে বেলা, মরি গো মরি।ফুল ফোটানো সারা ক’রেবসন্ত যে গেল স’রে—নিয়ে ঝরা ফুলের ডালা বলো কী করি।জল উঠেছে ছল্‌ছলিয়ে, ঢেউ উঠেছে দুলে—মর্মরিয়ে ঝরে পাতা বিজন তরুমূলে।শূন্যমনে কোথায় তাকাস—সকল বাতাস সকল আকাশওই পারের ওই বাঁশির সুরে উঠে শিহরি।বজ্রসেন। কহো কহো মোরে প্রিয়ে,আমারে করেছ মুক্ত কী সম্পদ দিয়ে।অয়ি বিদেশিনী,তোমারই কাছে আমি কত ঋণে ঋণী।শ্যামা। নহে নহে নহে। সে কথা এখন নহে

ওই রে তরী দিল খুলে।তোর বোঝা কে নেবে তুলে।সামনে যখন যাবি ওরে,থাক্-না পিছন পিছে পড়ে—পিঠে তারে বইতে গেলেএকলা প’ড়ে রইবি কূলে।ঘরের বোঝা টেনে টেনেপারের ঘাটে রাখলি এনে—তাই যে তোরে বারে বারে

ফিরতে হল গেলি ভুলে।ডাক্ রে আবার মাঝিরে ডাক্,বোঝা তোমার যাক ভেসে যাক—জীবনখানি উজাড় করেসঁপে দে তার চরণমূলে।বজ্রসেন। কী করিয়া সাধিলে অসাধ্য ব্রত কহো বিবরিয়া।জানি যদি, প্রিয়ে, শোধ দিব এ জীবন দিয়ে—এই মোর পণ।শ্যামা। নহে নহে নহে। সে কথা এখন নহে।

তোমা লাগি যা করেছি কঠিন সে কাজ,আরো সুকঠিন আজ তোমারে সে কথা বলা—

বালক কিশোর, উত্তীয় তার নাম—ব্যর্থ প্রেমে মোর মত্ত অধীর।মোর অনুনয়ে তব চুরি-অপবাদনিজ’পরে লয়ে সঁপেছে আপন প্রাণ।এ জীবনে মম, ওগো সর্বোত্তম,সর্বাধিক মোর এই পাপতোমার লাগিয়া।বজ্রসেন। কাঁদিতে হবে রে, রে পাপিষ্ঠা,জীবনে পাবি না শান্তি।ভাঙিবে ভাঙিবে কলুষনীড় বজ্র-আঘাতে।কোথা তুই লুকাবি মুখ মৃত্যু-আঁধারে।শ্যামা। ক্ষমা করো নাথ, ক্ষমা করো।এ পাপের যে অভিসম্পাতহোক বিধাতার হাতে নিদারুণতর।তুমি ক্ষমা করো।

বজ্রসেন। এ জন্মের লাগিতোর পাপমূল্যে কেনা মহাপাপভাগীএ জীবন করিলি ধিক কৃত। কলঙ্কিনী,ধিক্ নিশ্বাস মোর তোর কাছে ঋণী।শ্যামা। তোমার কাছে দোষ করি নাই,দোষ করি নাই,দোষী আমি বিধাতার পায়ে;তিনি করিবেন রোষ—সহিব নীরবে।তুমি যদি না কর দয়া,সবে না, সবে না, সবে না।বজ্রসেন। তবু ছাড়িবি নে মোরে?শ্যামা। ছাড়িব না, ছাড়িব না।তোমা লাগি পাপ নাথ,তুমি করো মর্মাঘাত।ছাড়িব না।

শ্যামাকে বজ্রসেনের হত্যার চেষ্টা

নেপথ্যে। হায়, এ কী সমাপন! অমৃতপাত্র ভাঙিলি,করিলি মৃত্যুরে সমর্পণ।এ দুর্লভ প্রেম মূল্য হারালো হারালোকলঙ্কে অসম্মানে।

৪

পথিকরমণী

সব-কিছু কেন নিল না, নিল না,নিল না ভালোবাসা।

আপনাতে কেন মিটালো না যত-কিছু দ্বন্দেরে—ভালো আর মন্দেরে।নদী নিয়ে আসে পঙ্কিল জলধারা,সাগরহৃদয়ে গহনে হয় হারা।ক্ষমার দীপ্তি দেয় স্বর্গের আলো প্রেমের আনন্দেরে।

প্রস্থান

বজ্রসেন। ক্ষমিতে পারিলাম না যেক্ষমো হে মম দীনতাপাপীজনশরণ প্রভু!মরিছে তাপে মরিছে লাজেপ্রেমের বলহীনতা—ক্ষমো হে মম দীনতা।প্রিয়ারে নিতে পারি নি বুকে, প্রেমেরে আমি হেনেছি।পাপীরে দিতে শাস্তি শুধু পাপেরে ডেকে এনেছি।জানি গো, তুমি ক্ষমিবে তারেযে অভাগিনী পাপের ভারেচরণে তব বিনতা—ক্ষমিবে না, ক্ষমিবে না আমার ক্ষমাহীনতা।

এসো এসো এসো প্রিয়ে,মরণলোক হতে নূতন প্রাণ নিয়ে।নিষ্ফল মম জীবন, নীরস মম ভুবন—শূন্য হৃদয় পূরণ করো মাধুরীসুধা দিয়ে।

নূপুর কুড়াইয়া লইয়া

হায় রে নূপুর,তার করুণ চরণ ত্যজিলি, হারালি কলগুঞ্জনসুর।

নীরব ক্রন্দনে বেদনাবন্ধনেরাখিলি ধরিয়া বিরহ ভরিয়া স্মরণ সুমধুর।তোর ঝঙ্কারহীন ধিক্কারে কাঁদে প্রাণ মম নিষ্ঠুর।

শ্যামার প্রবেশ

শ্যামা। এসেছি, প্রিয়তম।ক্ষমো মোরে ক্ষমো।গেল না, গেল না কেন কঠিন পরান মমতব নিঠুর করুণ করে।বজ্রসেন। কেন এলি, কেন এলি, কেন এলি ফিরে—যাও যাও, চলে যাও।

শ্যামার প্রণাম ও প্রস্থান

বজ্রসেন। ধিক্ ধিক্ ওরে মুগ্ধ, কেন চাস্ ফিরে ফিরে।এ যে দুষিত নিষ্ঠুর স্বপ্ন,এ যে মোহবাষ্পঘন কুজ্ঝটিকা—দীর্ণ করিবি না কি রে।অশুচি প্রেমের উচ্ছিষ্টেনিদারুণ বিষ—লোভ না রাখিসপ্রেতবাস তোর ভগ্ন মন্দিরে।নির্মম বিচ্ছেদসাধনায়পাপক্ষালন হোক—না কোরো মিথ্যা শোক,দুঃখের তপস্বী রে—স্মৃতিশৃঙ্খল করো ছিন্ন—আয় বাহিরে,আয় বাহিরে।

নেপথ্যে। কঠিন বেদনার তাপস দোঁহেযাও চিরবিরহের সাধনায়।ফিরো না, ফিরো না— ভুলো না মোহে।গভীর বিষাদের শান্তি পাও হৃদয়ে,জয়ী হও অন্তরবিদ্রোহে।যাক পিয়াসা, ঘুচুক দুরাশা,যাক মিলায়ে কামনাকুয়াশা।স্বপ্ন-আবেশ-বিহীন পথেযাও বাঁধনহারা,তাপবিহীন মধুর স্মৃতি নীরবে ব’হে।

এমন আর কতদিন চলে যাবে রে!জীবনের ভার বহিব কত! হায় হায়!যে আশা মনে ছিল, সকলই ফুরাইল—কিছু হল না জীবনে।জীবন ফুরায়ে এল। হায় হায়।

ওহে দয়াময়, নিখিল-আশ্রয় এ ধরা-পানে চাও—পতিত যে জন করিছে রোদন, পতিতপাবন,তাহারে উঠাও।মরণে যে জন করেছে বরণ তাহারে বাঁচাও।

কত দুখ শোক, কাঁদে কত লোক, নয়ন মুছাও।ভাঙিয়া আলয় হেরে শূন্যময়। কোথায় আশ্রয়—তারে ঘরে ডেকে নাও।প্রেমের তৃষায় হৃদয় শুকায়, দাও প্রেমসুধা দাও।

হেরো কোথা যায়, কার পানে চায়। নয়নে আঁধার—নাহি হেরে দিক, আকুল পথিক চাহে চারি ধার।এ ঘোর গহনে অন্ধ সে নয়নে তোমার কিরণেআঁধার ঘুচাও।সঙ্গহারা জনে রাখিয়া চরণে বাসনা পূরাও।

কলঙ্কের রেখা প্রাণে দেয় দেখা প্রতিদিন হায়।হৃদয় কঠিন হল দিন দিন, লজ্জা দূরে যায়।দেহ গো বেদনা, করাও চেতনা! রেখো না, রেখো না—এ পাপ তাড়াও।সংসারের রণে পরাজিত জনে নববল দাও!

নিত্য সত্যে চিন্তন করো রে বিমলহৃদয়ে,নির্মল অচল সুমতি রাখো ধরি সতত।সংশয়নৃশংস সংসারে প্রশান্ত রহো,তাঁর শুভ ইচ্ছা স্মরি বিনয়ে রহো বিনত।বাসনা করো জয়, দুর করো ক্ষুদ্র ভয়।প্রাণধন করিয়া পণ চলো কঠিন শ্রেয়পথে,ভোলো প্রসন্নমুখে স্বার্থসুখ, আত্মদুখ—প্রেম-আনন্দরসে নিয়ত রহো নিরত।

মা, আমি তোর কী করেছি।শুধু তোরে জন্ম ভ’রে মা বলে রে ডেকেছি।চিরজীবন পাষাণী রে, ভাসালি আঁখিনীরে—চিরজীবন দুঃখানলে দহেছি।আঁধার দেখে তরাসেতে চাহিলাম তোর কোলে যেতে—সন্তানেরে কোলে তুলে নিলি নে।মা-হারা সন্তানের মতো কেঁদে বেড়াই অবিরত—এ চোখের জল মুছায়ে তো দিলি নে।ছেলের প্রাণে ব্যথা দিয়ে যদি, মা, তোর জুড়ায় হিয়েভালো ভালো, তাই তবে হোক—অনেক দুঃখ সয়েছি।

সকলেরে কাছে ডাকি আনন্দ-আলয়ে থাকিঅমৃত করিছ বিতরণ।পাইয়া অনন্ত প্রাণ জগত গাহিছে গানগগনে করিয়া বিচরণ।সূর্য শূন্যপথে ধায়— বিশ্রাম সে নাহি চায়,সঙ্গে ধায় গ্রহপরিজন।লভিয়া অসীম বল ছুটিছে নক্ষত্রদল,চারি দিকে চলেছে কিরণ।পাইয়া অমৃতধারা নব নব গ্রহ তারাবিকশিয়া উঠে অনুক্ষণ—জাগে নব নব প্রাণ, চিরজীবনের গানপূরিতেছে অনন্ত গগন।পূর্ণ লোক লোকান্তর, প্রাণে মগ্ন চরাচরপ্রাণের সাগরে সন্তরণ।জগতে যে দিকে চাই বিনাশ বিরাম নাই,অহরহ চলে যাত্রীগণ।মোরা সবে কীটবৎ, সমুখে অনন্ত পথকী করিয়া করিব ভ্রমণ।অমৃতের কণা তব পাথেয় দিয়েছ, প্রভো,ক্ষুদ্র প্রাণে অনন্ত জীবন।

সখা, তুমি আছ কোথা—সারা বরষের পরে জানাতে এসেছি ব্যথা।কত মোহ, কত পাপ, কত শোক, কত তাপ,কত যে সয়েছি আমি তোমারে কব সে কথা।

যে শুভ্র জীবন তুমি মোরে দিয়েছিলে সখা,দেখো আজি তাহে কত পড়েছে কলঙ্করেখা।এনেছি তোমারি কাছে, দাও তাহা দাও মুছে—নয়নে ঝরিছে বারি, সভয়ে এসেছি পিতা।দেখো দেব, চেয়ে দেখো হৃদয়েতে নাহি বল—সংসারের বায়ুবেগে করিতেছে টলমল।লহো সে হৃদয় তুলে, রাখো তব পদমূলে—সারাটি বরষ যেন নির্ভয়ে রহে গো সেথা।

সখা, মোদের বেঁধে রাখো প্রেমডোরে।আমাদের ডেকে নিয়ে চরণতলে রাখো ধ’রে—বাঁধো হে প্রেমভোরে।কঠোর পরানে কুটিল বয়ানেতোমার এ প্রেমের রাজ্য রেখেছি আঁধার ক’রে।আপনার অভিমানে দুয়ার দিয়ে প্রাণেগরবে আছি বসে চাহি আপনা-পানে।বুঝি এমনি করে হারাব তোমারে—ধূলিতে লুটাই আপনার পাষাণভারে।তখন কারে ডেকে কাঁদিব কাতর স্বরে।

ছি ছি সখা, কী করিলে, কোন্ প্রাণে পরশিলে—কামিনীকুসুম ছিল বন আলো করিয়া।মানুষ-পরশ-ভরে শিহরিয়া সকাতরেওই-যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া।জান তো কামিনী-সতী কোমল কুসুম অতি—দূর হতে দেখিবার, ছুঁইবার নহে সে।

দূর হতে মৃদু বায় গন্ধ তার দিয়ে যায়,কাছে গেলে মানুষের শ্বাস নাহি সহে সে।মধুপের পদক্ষেপে পড়িতেছে কেঁপে কেঁপে,কাতর হতেছে কত প্রভাতের সমীরে।পরশিতে রবির শুকাইছে কলেবর,শিশিরের ভরটুকু সহিছে না শরীরে।হেন কোমলতাময় ফুল কি না ছুঁলে নয়—হায় রে কেমন বন ছিল আলো করিয়া।মানুষ-পরশ-ভরে শিহরিয়া সকাতরেওই-যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া।

না সজনী, না, আমি জানি জানি, সে আসিবে না।এমনি কাঁদিয়ে পোহাইবে যামিনী, বাসনা তবু পূরিবে না।জনমেও এ পোড়া ভালে কোনো আশা মিটিল না।যদি বা সে আসে, সখী, কী হবে আমার তায়।সে তো মোরে, সজনী লো, ভালো কভু বাসে না— জানি লোভালো ক’রে কবে না কথা, চেয়েও না দেখিবে—বড়ো আশা করে শেষে পূরিবে না কামনা।

ভাসিয়ে দে তরী তবে নীল সাগরোপরি।বহিছে মৃদুল বায়, নাচিছে মৃদু লহরী।ডুবেছে রবির কায়া, আধো আলো, আধো ছায়া-আমরা দুজনে মিলি যাই চলল ধীরি ধীরি।একটি তারার দীপ যেন কনকের টিপদূর শৈলভুরুমাঝে রয়েছে উজল করি।নাহি সাড়া, নাহি শব্দ, মন্ত্রে যেন সব স্তব্ধ—শান্তির ছবিটি যেন কী সুন্দর আহা মরি।

ছিলে কোথা বলো, কত কী যে হলজান না কি তা? হায় হায়, আহা!মানদায়ে যায় যায় বাসবের প্রাণ—এখানে কী কর, তুমি ফুলশরতারে গিয়ে করো ত্রাণ।

চলো চলো, চলো চলো, চলো চলো ফুলধনু,চলো যাই কাজ সাধিতে।দাও বিদায় রতি গো!এমন এমন ফুল দিব আনিপরখিবে মানিনীহৃদয়ে হানি,মরমে মরমে রমণী অমনিথাকিবে গো দহিতে।

এসো গো এসো বনদেবতা, তোমারে আমি ডাকি।জটার ’পরে বাঁধিয়া লতা বাকলে দেহ ঢাকিতাপস, তুমি দিবস-রাতি নীরবে আছ বসি—মাথার ’পরে উঠিছে তারা, উঠিছে রবি শশী।

বহিয়া জটা বরষা-ধারা পড়িছে ঝরি ঝরি,শীতের বায়ু করিছে হাহা তোমারে ঘিরি ঘিরি।নামায়ে মাথা আঁধার আসি চরণে নমিতেছে,তোমার কাছে শিখিয়া জপ নীরবে জপিতেছে।

একটি তারা মারিছে উঁকি আঁধারভুরু-’পর,জটার মাঝে হারায়ে যায় প্রভাতরবিকর।

পড়িছে পাতা, ফুটিছে ফুল, ফুটিছে পড়িতেছে—মাথায় মেঘ কত-না ভাব ভাঙিছে গড়িতেছে।মিলিয়া ছায়া মিলিয়া আলো খলিছে লুকাচুরি,আলয় খুঁজে বনের বায়ু ভ্রমিছে ঘুরি ঘুরি।

তোমার তপ ভাঙাতে চাহে ঝটিকা পাগলিনী—গরজি ঘন ছুটিয়া আসে প্রলয়রব জিনি,ভ্রূকুটি করি চপলা হানে ধরি অশনিচাপ।জাগিয়া উঠি নাড়িয়া মাথা তাহারে দাও শাপ।

এসো হে এসো বনদেবতা, অতিথি আমি তব—আমার যত প্রাণের আশা তোমার কাছে কব।নমিব তব চরণে, দেব, বসিব পদতলে—সাহস পেয়ে বনবালারা আসিবে দলে দলে।

কত ডেকে ডেকে জাগাইছ মোরে,তবু তো চেতনা নাই গো।মেলি মেলি আঁখি মেলিতে না পারি,ঘুম রয়েছে সদাই গো।মায়ানিদ্রাবশে আছি অচেতন,শুয়ে শুয়ে কত দেখি কুস্বপন—ধন রত্ন দাস বিলাসভবন—অন্ত নাহি তার পাই গো।

কল্পনার বলে উঠিয়া আকাশেভ্রমি অহরহ মনের উল্লাসে,ভাবি না কী হবে নিদ্রার বিনাশে—কোথা আছি কোথা যাই গোজানি না গো এ-যে রাক্ষসের পুরী,জানি না যে হেথা দিনে হয় চুরি,জানি না বিপদ আছে ভূরি ভূরি—সুধা ব’লে বিষ খাই গো।

ভাঙিতে আমার মনের সংশয়জাগায়ে দিতেছ নিজপরিচয়,তুমি-যে জনক জননী উভয়বুঝাইছ সদা তাই গো।সে কথা আমার কানে নাহি যায়,ভুলিয়ে রয়েছি রাক্ষসীমায়ায়—কী হবে, জননী, বলো গো উপায়।শুধু কৃপাতিক্ষা চাই গো।

আঁধার সকলই দেখি তোমারে দেখি না যবে।ছলনা চাতুরী আসে হৃদয়ে বিষাদবাসেতোমারে দেখি না যবে, তোমারে দেখি না যবেএসো এসো, প্রেমময়, অমৃতহাসিটি লয়ে।এসো মোর কাছে ধীরে এই হৃদয়নিলয়ে।ছাড়িব না তোমায় কভু জনমে জনমে আর,তোমায় রাখিয়া হৃদে যাইব ভবের পার।

Comments

Loading comments…