এবার ফিরাও মোরে

চিত্রা

সংসারে সবাই যবে সারাক্ষণ শত কর্ম্মে রততুই শুধু ছিন্নবাধা পলাতক বালকের মত

মধ্যাহ্নে মাঠের মাঝে একাকী বিষন্ন তরুচ্ছায়েদূর-বনগন্ধবহ মন্দগতি ক্লান্ত তপ্তবায়েসারাদিন বাজাইলি বাঁশি!—ওরে তুই ওঠ আজি!আগুন লেগেছে কোথা? কার শঙ্খ উঠিয়াছে বাজিজাগাতে জগৎ-জনে? কোথা হতে ধ্বনিছে ক্রন্দনেশূন্যতল? কোন্ অন্ধকারা মাঝে জর্জ্জর বন্ধনেঅনাথিনী মাগিছে সহায়? স্ফীতকায় অপমানঅক্ষমের বক্ষ হতে রক্ত শুষি করিতেছে পানলক্ষমুখ দিয়া! বেদনারে করিতেছে পরিহাসস্বার্থোদ্ধত অবিচার! সঙ্কুচিত ভীত ক্রীতদাসলুকাইছে ছদ্মবেশে! ওই যে দাঁড়ায়ে নতশিরমূক সবে-ম্লানমুখে লেখা শুধু শত শতাব্দীরবেদনার করুণ কাহিনী; স্কন্ধে যত চাপে ভার-বহি চলে মন্দগতি, যতক্ষণ থাকে প্রাণ তার,—তার পরে সন্তানেরে দিয়ে যায় বংশ বংশ ধরি’;নাহি ভর্তসে অদৃষ্টেরে, নাহি নিন্দে দেবতারে স্মরি,মানবেরে নাহি দেয় দোষ, নাহি জানে অভিমান,শুধু দুটি অন্ন খুঁটি কোন মতে কষ্টক্লিষ্ট প্রাণরেখে দেয় বাঁচাইয়া! সে অন্ন যখন, কেহ কাড়ে,সে প্রাণে আঘাত দেয় গর্ব্বাদ্ধ নিষ্ঠুর অত্যাচারে,

নাহি জানে কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে,দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে,মরে সে নীরবে! এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখেদিতে হবে ভাষা, এই সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকেধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা; ডাকিয়া বলিতে হবে-মুহূর্ত্ত তুলিয়া শির একত্র দাড়াও দেখি সবে!যার ভয়ে তুমি ভীত, সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে,যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে;যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার,—তখনি সেপথ-কুকুরের মত সঙ্কোচে সত্রাসে যাবে মিশে;দেবতা বিমুখ তারে, কেহ নাহি সহায় তাহায়,মুখে করে আস্ফালন, জানে সে হীনতা আপনারমনে মনে!-কবি, তবে উঠে এস,যদি থাকে প্রাণতবে তাই লহ সাখে,—তবে তাই কর আজি দান!বড় দুঃখ, বড় ব্যথা,—সম্মুখেতে কষ্টের সংসারবড়ই দরিদ্র, শূন্য, বড় ক্ষুদ্র, বদ্ধ অন্ধকার!-অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু,চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু,

সাহসবিস্তৃত বক্ষপট! এ দৈন্য-মাঝারে, কবি,একবার নিয়ে এস স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি!

এবার ফিরাও মরে, লয়ে যাও সংসারের তীরেহে কল্পনে, রঙ্গময়ি! দুলায়ো না সমীরে সমীরেতরঙ্গে তরঙ্গে আর! ভুলায়ো না মোহিনী মায়ায়!বিজন বিষাদবন অন্তরের নিকুঞ্জচ্ছায়ায়রেখো না বসায়ে আর! দিন যায়, সন্ধ্যা হয়ে আসে!অন্ধকারে ঢাকে দিশি, নিরাশ্বাস উদাস বাতাসেনিঃশ্বসিয়া কেঁদে ওঠে বন! বাহিরিনু হেথা হতেউন্মুক্ত অম্বরতলে, ধূসরপ্রসর রাজপথে,জনতার মাঝখানে! কোথা যাও, পান্থ, কোথা যাও,আমি নহি পরিচিত, মোর পানে ফিরিয়া তাকাও!বল মোরে নাম তবু, আমারে কোরো না অবিশ্বাস!সৃষ্টিছাড়া সৃষ্টিমাঝে বহুকাল করিয়াছি বাসসঙ্গীহীন রাত্রিদিন; তাই মোর অপরূপ বেশ,আচার নুতনতর; তাই মোর চক্ষে স্বপ্নাবেশ,বক্ষে জলে ক্ষুধানল!-যে দিন জগতে চলে আসি,কোন্ মা আমারে দিলি শুধু এই খেলাবার বাঁশি!বাজাতে বাজাতে তাই মুগ্ধ হয়ে আপনার সুরে

দীর্ঘ দিন দীর্ঘ রাত্রি চলে গেনু একান্ত সুদূরেছাড়ায়ে সংসারসীমা! -সে বাঁশিতে শিখেছি যে সুরতাহারি উল্লাসে যদি গীতশূন্য অবসাদপুরধ্বনিয়া তুলিতে পারি, মৃত্যুঞ্জয়ী আশার সঙ্গীতেকর্ম্মহীন জীবনের একপ্রান্ত পারি তরঙ্গিতেশুধু মুহূর্ত্তের তরে, দুঃখ যদি পায় তার ভাষা,সুপ্তি হতে জেগে ওঠে অন্তরের গভীর পিপাসাস্বর্গের অমৃত লাগি, -তবে ধন্য হবে মোর গান,শত শত অসন্তোষ মহাগীতে লভিবে নির্ব্বাণ।

কি গাহিবে, কি শুনাবে!-বল, মিথ্যা আপনার সুখ,মিথ্যা আপনার দুঃখ! স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখবৃহৎ জগত হতে, সে কখনো শেখে নি বাঁচিতে।মহা বিশ্বজীবনের তরঙ্গেতে নাচিতে নাচিতেনির্ভয়ে ছুটিতে হবে, সত্যেরে করিয়া ধ্রুবতারা!মৃত্যুরে করি না শঙ্কা! দুর্দ্দিনের অশ্রুজলধারামস্তকে পড়িবে ঝরি-তারি মাঝে যাব অভিসারেতার কাছে,—জীবনসর্ব্বস্বধন অর্পিয়াছি যারেজন্ম জন্ম ধরি! কে সে? জানিনা কে! চিনি নাই তারে-শুধু এইটুকু জানি-তারি লাগি রাত্রি-অন্ধকারে

চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর পানেঝড়ঝঞ্চা বজ্রপাতে, জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানেঅন্তর প্রদীপখানি! শুধু জানি—যে শুনেছে কানেতাহার আহ্বানগীত-ছুটেছে সে নির্ভীক পরাণেসঙ্কট আবর্ত্তমাঝে, দিয়েছে সে বিশ্ব বিসর্জ্জন,নির্যাতন লয়েছে সে বক্ষ পাতি; মৃত্যুর গর্জ্জনশুনেছে সে সঙ্গীতের মত। দহিয়াছে অগ্নি তারে,বিদ্ধ করিয়াছে শূল, ছিন্ন তারে করেছে কুঠারে,সর্ব্ব প্রিয়বস্তু তার অকাতরে করিয়া ইন্ধনচিরজন্ম তারি লাগি জ্বেলেছে সে হোম-হুতাশন;—হৃৎপিণ্ড করিয়া ছিন্ন রক্তপদ্ম অর্ঘ্য উপহারেভক্তিভরে জন্মশোধ শেষ পুজা পূজিয়াছে তারেমরণে কৃতার্থ করি প্রাণ! শুনিয়াছি, তারি লাগিরাজপুত্র পরিয়াছে ছিন্ন কন্থা, বিষয়ে বিরাগীপথের ভিক্ষুক! মহাপ্রাণ সহিয়াছে পলে পলেসংসারের ক্ষুদ্র উৎপীড়ন, বিধিয়াছে পদতলেপ্রত্যহের কুশাঙ্কুর, করিয়াছে তারে অবিশ্বাসমূঢ় বিজ্ঞ জনে, প্রিয়জন করিয়াছে পরিহাসঅতিপরিচিত অবজ্ঞায়, গেছে সে করিয়া ক্ষমানীরবে করুণনেত্রে-অন্তরে বহিয়া নিরুপমা

সৌন্দর্য্যপ্রতিমা! তারি পদে, মানী সঁপিয়াছে মান,ধনী সঁপিয়াছে ধন, বীর সঁপিয়াছে আত্মপ্রাণ,তাহারি উদ্দেশে কবি বিরচিয়া লক্ষ লক্ষ গানছড়াইছে দেশে দেশে!- শুধু জানি তাহারি মহান্গম্ভীর মঙ্গলধ্বনি শুনা যায় সমুদ্রে সমীরে,তাহারি অঞ্চলপ্রান্ত লুটাইছে নীলাম্বর ঘিরে,তারি বিশ্ববিজয়িনী পরিপূর্ণ প্রেমমূর্ত্তিখানিবিকাশে পরমক্ষণে প্রিয়জনমুখে! শুধু জানিসে বিশ্বপ্রিয়ার প্রেমে ক্ষুদ্রতারে দিয়া বলিদানবর্জিতে হইবে দূবে জীবনের সর্ব্ব অসম্মান,সম্মুখে দাড়াতে হবে উন্নতমস্তক উচ্চে তুলিযে মস্তকে ভয় লেখে নাই লেখা, দাসত্বের ধূলিআঁকে নাই কলঙ্ক-তিলক! তাহারে অন্তরে রাখিজীবনকণ্টকপথে যেতে হবে নীরবে একাকী,সুখে দুঃখে ধৈর্য্য ধরি, বিরলে মুছিয়া অশ্রু-আঁখি,প্রতিদিবসের কর্ম্মে প্রতিদিন নিরলস থাকিসুখী করি সর্ব্বজনে! তার পরে দীর্ঘ পথশেষেজীবযাত্রা অবসানে ক্লান্তপদে রক্তসিত বেশেউত্তরিব একদিন শ্রান্তিহরা শান্তির উদ্দেশেদুঃখহীন নিকেতনে! প্রসন্নবদনে মন্দ হেসে

পরাবে মহিমালক্ষ্মী ভক্তকণ্ঠে বরমাল্যখানি,করপদ্ম পরশনে শান্ত হবে সর্ব্ব দুঃখ গ্লানিসর্ব্ব অমঙ্গল! লুটাইয়া রক্তিম চরণতলেধৌত করি দিব পদ আজন্মের রুদ্ধ অশ্রুজলে।সুচিরসঞ্চিত আশা সম্মুখে করিয়া উদঘাটনজীবনের অক্ষমতা কাঁদিয়া করিব নিবেদন,মাগিব অনন্তক্ষমা! হয় ত ঘুচিরে দুঃখনিশা,তৃপ্ত হবে এক প্রেমে জীবনের সর্ব্বপ্রেমতৃষা!

Comments

Loading comments…