বসন্ত

বনবাণী — নটরাজ-ঋতুরঙ্গশালা

হে বসন্ত, হে সুন্দর, ধরণীর ধ্যান-ভরা ধন,বৎসরের শেষেশুধু একবার মর্তে মূর্তি ধর ভুবনমোহননববরবেশে।তারি লাগি তপস্বিনী কী তপস্যা করে অনুক্ষণ,আপনারে তপ্ত করে, ধৌত করে, ছাড়ে আভরণ—ত্যাগের সর্বস্ব দিয়ে ফল-অর্ঘ করে আহরণতোমার উদ্দেশে।

সূর্য প্রদক্ষিণ করি ফিরে সে পূজার নৃত্যতালেভক্ত উপাসিকা।নম্র ভালে আঁকে তার প্রতিদিন উদয়াস্তকালেরক্তরশ্মিটিকা।সমুদ্রতরঙ্গে সদা মন্দ্রস্বরে মন্ত্র পাঠ করে,উচ্চারে নামের শ্লোক অরণ্যের উচ্ছ্বাসে মর্মরে,বিচ্ছেদের মরুশূন্যে স্বপ্নচ্ছবি দিকে দিগন্তরেরচে মরীচিকা।

আবর্তিয়া ঋতুমাল্য করে জপ, করে আরাধনদিন গুনে গুনে।সার্থক হল যে তার বিরহের বিচিত্র সাধনমধুর ফাল্গুনে।হেরিনু উত্তরী তব, হে তরুণ, অরুণ আকাশে,শুনিনু চরণধ্বনি দক্ষিণের বাতাসে বাতাসে,মিলনমাঙ্গল্যহোম প্রজ্বলিত পলাশে পলাশেরক্তিম আগুনে।

তাই আজি ধরিত্রীর যত কর্ম, যত প্রয়োজনহল অবসান।বৃক্ষশাখা রিক্তভার, ফলে তার নিরাসক্ত মন,ক্ষেতে নাই ধান।বকুলে বকুলে শুধু মধুকর উঠিছে গুঞ্জরি,অকারণ আন্দোলনে চঞ্চলিছে অশোকমঞ্জরী,কিশলয়ে কিশলয়ে নৃত্য উঠে দিবসশর্বরী-বনে জাগে গান।

হে বসন্ত, হে সুন্দর, হায় হায়, তোমার করুণাক্ষণকালতরে।মিলাইবে এ উৎসব, এই হাসি, এই দেখাশুনাশূন্য নীলাম্বরে।নিকুঞ্জের বর্ণচ্ছটা একদিন বিচ্ছেদবেলায়ভেসে যাবে বৎসরান্তে রক্তসন্ধ্যাস্বপ্নের ভেলায়,বনের মঞ্জীরধ্বনি অবসন্ন হবে নিরালায়শ্রান্তিক্লান্তিভরে।

তোমারে করিবে বন্দী নিত্যকাল মৃত্তিকাশৃঙ্খলেশক্তি আছে কার।ইচ্ছায় বন্ধন লও, সে বন্ধন ইন্দ্রজালবলেকর অলংকার।সে বন্ধন দোলরজ্জু, স্বর্গে মর্তে দোলে ছন্দভরে;সে বন্ধন শ্বেতপদ্ম বাণীর মানসসরোবরে;সে বন্ধন বীণাতন্ত্র, সুরে সুরে সংগীতনির্ঝরেবর্ষিছে ঝংকার।

নন্দনে আনন্দ তুমি, এই মর্তে, হে মর্তের প্রিয়,নিত্য নাই হলে।সুদূরমাধুর্য-পানে তব স্পর্শ, অনির্বচনীয়,দ্বার যদি খোলে—ক্ষণে ক্ষণে সেথা আসি নিস্তব্ধ দাঁড়াবে বসুন্ধরা,লাগিবে মন্দাররেণু শিরে তার উর্ধ্ব হতে ঝরা,মাটির বিচ্ছেদপাত্র স্বর্গের উচ্ছ্বাস-রসে ভরারবে তার কোলে।

Comments

Loading comments…