চামেলিবিতান

বনবাণী — বনবাণী

মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বংঅগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।

ময়ুর, কর নি মোরে ভয়,সেই গর্ব, সেই মোর জয়।বাহিরেতে আমলকীকরিতেছে ঝকমকি,বটের উঠেছে কচি পাতা,হোথায় দুয়ার থেকেআমারে গিয়েছ দেখে—খুলিয়া বসেছি মোটা খাতা।

লিখিতেছি নিজ মনে-হেরি তাই আঁখিকোণেঅবজ্ঞায় ফিরে যাও চলি।বোঝ না, লেখনী ধরিকী যে এত খুঁটে মরি,আমারে জেনেছ মূঢ় বলি।

সেই ভালো জান যদি তাই,তাহে মোর কোনো খেদ নাই।তবু আমি খুশী আছিআস তুমি কাছাকাছি,মোরে দেখে নাহি কর ত্রাস।যদিও মানব, তবুআমারে কর না কভুদানব বলিয়া অবিশ্বাস।সুন্দরের দূত তুমি,এ ধূলির মর্তভূমি,স্বর্গের প্রসাদ হেথা আন-তবুও বধি না তোরে,বাঁধি না পিঞ্জরে ধ’রে,এও কি আশ্চর্য নাহি মান।

কাননের এই এক কোণা,হেথায় তোমার আনাগোনা।

চামেলিবিতানতলমোর বসিবার স্থল,দিন যবে অবসান হয়।হেথা আস কী যে ভাবি,মোর চেয়ে তোর দাবিবেশি বই কম কিছু নয়।জ্যোৎস্না ডালের ফাঁকেহেথা আল্‌পনা আঁকে,এ নিকুঞ্জ জানে আপনার।কচি পাতা যে বিশ্বাসেদ্বিধাহীন হেথা আসে,তোমার তেমনি অধিকার।

বর্ণহীন রিক্ত মোর সাজ,তারি লাগি পাছে পাই লাজবর্ণে বর্ণে আমি তাইছন্দ রচিবারে চাই,সুরে সুরে গীতচিত্র করি।আকাশেরে বাসি ভালো,সকাল-সন্ধ্যার আলোআমার প্রাণের বর্ণে ভরি।ধরায় যেখানে তাইতোমার গৌরব-ঠাঁইসেথায় আমারো ঠাঁই হয়।

সুন্দরের অনুরাগেতাই মোর গর্ব লাগে,মোরে তুমি কর নাই ভয়।

তোমার আমার তরে জানিমধুরের এই রাজধানী।তোর নাচ, মোর গীতি,রূপ তোর, মোর প্রীতি,তোর বর্ণ, আমার বর্ণনা-শোভনের নিমন্ত্রণেচলি মোরা দুইজনে,তাই তুই আমার আপনা।সহজ রঙ্গের রঙ্গীওই-যে গ্রীবার ভঙ্গী,বিস্ময়ের নাহি পাই পার।তুমি-যে শঙ্কা না পাও,নিঃসংশয়ে আস যাও,এই মোর নিত্য পুরস্কার।

নাশ করে যে আগ্নেয়বাণমুহূর্তে অমূল্য তোর প্রাণ-তার লাগি বসুন্ধরাহয় নি সবুজে ভরা,তার লাগি ফুল নাহি ধরে।

যে বসন্তে প্রাণে প্রাণেবেদনার সুধা আনেসে বসন্ত নহে তার তরে।ছন্দ ভেঙে দেয় সে যে,অকস্মাৎ উঠে বেজেঅর্থহীন চকিত চীৎকার,ধূমাচ্ছন্ন অবিশ্বাসবিশ্ববক্ষে হানে ত্রাস,কুটিল সংশয় কদাকার।

সৃষ্টিছাড়া এই-যে উৎপাতহানে দানবের পদাঘাতপুণ্য পৃথিবীর শিরে—তার সজ্জা তুই কি রেআনিতে পারিবি তোর মনে।অকৃতজ্ঞ নিষ্ঠুরতা,সৌন্দর্যেরে দেয় ব্যথাকেন যে তা বুঝিবি কেমনে।কেন যে কদর্য ভাষাবিধাতার ভালোবাসাবিদ্রূপে করিছে ছারখার,যে হস্ত দানেরই তরেতারি রক্তপাত করে,সেই লজ্জা নিখিলজনার।

Comments

Loading comments…