জগদীশচন্দ্র

বনবাণী — বনবাণী

যেদিন ধরণী ছিল, ব্যথাহীন বাণীহীন মরু,প্রাণের আনন্দ নিয়ে, শঙ্কা নিয়ে, দুঃখ নিয়ে তরুদেখা দিল দারুণ নির্জনে। কত যুগ-যুগান্তরেকান পেতে ছিল স্তব্ধ, মানুষের পদশব্দ-তরেনিবিড় গহনতলে। যবে এল মানব অতিথি,দিল তারে ফুল ফল, বিস্তারিয়া দিল ছায়াবীথি।প্রাণের আদিমভাষা গূঢ় ছিল তাহার অন্তরে,সম্পূর্ণ হয় নি ব্যক্ত আন্দোলনে ইঙ্গিতে মর্মরে।তার দিনরজনীর জীবযাত্রা বিশ্বধরাতলে।চলেছিল নানা পথে শব্দহীন নিত্যকোলাহলেসীমাহীন ভবিষ্যতে; আলোকের আঘাতে তনুতেপ্রতিদিন উঠিয়াছে চঞ্চলিত অণুতে অণুতেস্পন্দবেগে নিঃশব্দ ঝঙ্কারগীতি; নীরব স্তবনেসূর্যের বন্দনাগান গাহিয়াছে প্রভাতপবনে।প্রাণের প্রথমবাণী এইমত জাগে চারি ভিতেতৃণে তৃণে, বনে বনে, তবু তাহা রয়েছে নিভৃতে-কাছে থেকে শুনি নাই; হে তপস্বী, তুমি একমনানিঃশব্দেরে বাক্য দিলে; অরণ্যের অন্তরবেদনা।

শুনেছ একান্তে বসি; মূক জীবনের যে ক্রন্দনধরণীর মাতৃবক্ষে নিরন্তর জাগালো স্পন্দনঅঙ্কুরে অঙ্কুরে উঠি, প্রসারিয়া শত ব্যগ্র শাখা,পত্রে পত্রে চঞ্চলিয়া, শিকড়ে শিকড়ে আঁকাবাঁকাজন্মমরণের দ্বন্দ্বে, তাহার রহস্য তব কাছেবিচিত্র অক্ষররূপে সহসা প্রকাশ লভিয়াছে।প্রাণের আগ্রহবার্তা নির্বাকের অন্তঃপুর হতেঅন্ধকার পার করি আনি দিলে দৃষ্টির আলোতে।তোমার প্রতিভাদীপ্ত চিত্ত-মাঝে কহে আজি কথাতরুর মর্মর-সাথে মানবমর্মের আত্মীয়তা;প্রাচীন আদিমতম সম্বন্ধের দেয় পরিচয়।হে সাধকশ্রেষ্ঠ, তব দুঃসাধ্য সাধন লভে জয়-সতর্ক দেবতা যেথা গুপ্তবাণী রেখেছেন ঢাকিসেথা তুমি দীপহস্তে অন্ধকারে পশিলে একাকী,জাগ্রত করিলে তারে। দেবতা আপন পরাভবেযেদিন প্রসন্ন হন, সেদিন উদার জয়রবেধ্বনিত অমরাবতী আনন্দে রচিয়া দেয় বেদিবীর বিজয়ীর তরে, যশের পতাকা অভ্রভেদীমর্তের চূড়ায় উড়ে।

মনে আছে একদা যেদিনআসন প্রচ্ছন্ন তব, অশ্রদ্ধার অন্ধকারে লীন,ঈর্ষাকণ্টকিত পথে চলেছিলে ব্যথিত চরণে,ক্ষুদ্র শত্রুতার সাথে প্রতিক্ষণে অকারণ রণে

হয়েছ পীড়িত শ্রান্ত। সে দুঃখই তোমার পাথেয়,সে অগ্নি জ্বেলেছে যাত্রাদীপ, অবজ্ঞা দিয়েছে শ্রেয়,পেয়েছ সম্বল তব আপনার গভীর অন্তরে।তোমার খ্যাতির শঙ্খ আজি বাজে দিকে দিগন্তরেসমুদ্রের এ কূলে, ও কূলে; আপন দীপ্তিতে আজিবন্ধু, তুমি দীপ্যমান; উচ্ছ্বসি উঠিছে বাজিবিপুল কীর্তির মন্ত্র তোমার আপন কর্ম-মাঝে।জ্যোতিষ্কসভার তলে যেথা তব আসন বিরাজেসেথায় সহস্র দীপ জ্বলে আজি দীপালি-উৎসবে।আমারো একটি দীপ তারি সাথে মিলাইনু যবেচেয়ে দেখে তার পানে, এ দীপ বন্ধুর হাতে জ্বালা;তোমার তপস্যাক্ষেত্র ছিল যবে নিভৃত নিরালা,বাধায় বেষ্টিত রুদ্ধ, সেদিন সংশয়সন্ধ্যাকালেকবি-হাতে বরমাল্য সে বন্ধু পরায়েছিল ভালে;অপেক্ষা করে নি সে তো জনতার সমর্থন-তরে,দুর্দিনে জ্বেলেছে দীপ রিক্ত তব অর্ঘ্যথালি-’পরে।আজি সহস্রের সাথে ঘোষিল সে, ধন্য ধন্য তুমি,ধন্য তব বন্ধুজন, ধন্য তব পুণ্য জন্মভূমি।

Comments

Loading comments…