নীলমণিলতা
বনবাণী — বনবাণী
ফাল্গুনমাধুরী তার চরণের মঞ্জীরে মঞ্জীরেনীলমণিমঞ্জরীর গুঞ্জন বাজায়ে দিল কি রে।আকাশ যে মৌনভারবহিতে পারে না আর,নীলিমাবন্যায় শূন্যে উচ্ছলে অনন্ত ব্যাকুলতা,তারি ধারা পুষ্পপাত্রে ভরি নিল নীলমণিলতা।
পৃথ্বীর গভীর মৌন দূর শৈলে ফেলে নীল ছায়া,মধ্যাহ্নমরীচিকায় দিগন্তে খোঁজে সে স্বপ্নকায়া।
যে মৌন নিজেরে চায়সমুদ্রের নীলিমায়,অন্তহীন সেই মৌন উচ্ছ্বসিল নীলগুচ্ছ ফুলে,দুর্গম রহস্য তার উঠিল সহজ ছন্দে দুলে।
আসন্ন মিলনাশ্বাসে বধূর কম্পিত তনুখানিনীলাম্বর-অঞ্চলের গুণ্ঠনে সঞ্চিত করে বাণী।মর্মের নির্বাক্ কথাপায় তার নিঃসীমতানিবিড় নির্মল নীলে, আনন্দের সেই নীল দ্যুতিনীলমণিমঞ্জরীর পুঞ্জে পুঞ্জে প্রকাশে আকুতি।
অজানা পান্থের মতো ডাক দিলে অতিথির ডাকে—অপরূপ পুষ্পোচ্ছ্বাসে হে লতা, চিনালে আপনাকে।বেল জুঁই শেফালিরেজানি আমি ফিরে ফিরে-কত ফাল্গুনের কত শ্রাবণের আশ্বিনের ভাষাতারা তো এনেছে চিত্তে, রঙিন করেছে ভালোবাসা।
চাঁপার কাঞ্চন-আভা সে-যে কার কণ্ঠস্বরে সাধা,নাগকেশরের গন্ধ সে-যে কোন বেণীবন্ধে বাঁধা।বাদলের চামেলি-যেকালো আঁখি-জলে ভিজে,করবীর রাঙা রঙ কঙ্কণঝংকার সুরে মাখা,কদম্বকেশরগুলি নিদ্রাহীন বেদনায় আঁকা।
তুমি সুদূরের দূতী, নূতন এসেছ নীলমণি,স্বচ্ছ নীলাম্বরসম নির্মল তোমার কণ্ঠধ্বনি।যেন ইতিহাসজালেবাঁধা নহ দেশে কালে,যেন তুমি দৈববাণী বিচিত্র বিশ্বের মাঝখানে-পরিচয়হীন তব আবির্ভাব, কেন এ কে জানে।
‘কেন এ কে জানে’ এই মন্ত্র আজি মোর মনে জাগে,তাই তো ছন্দের মালা গাঁথি অকারণ অনুরাগে।বসন্তের নানা ফুলেগন্ধ তরঙ্গিয়া তুলে,আম্রবনে ছায়া কাঁপে মৌমাছির গুঞ্জরণগানে—মেলে অপরূপ ডানা প্রজাপতি, কেন এ কে জানে।
কেন এ কে জানে এত বর্ণগন্ধরসের উল্লাস,প্রাণের মহিমাছবি রূপের গৌরবে পরকাশ।যেদিন বিতানচ্ছায়েমধ্যাহ্নের মন্দবায়েময়ুর আশ্রয় নিল, তোমারে তাহারে একখানেদেখিলাম চেয়ে চেয়ে, কহিলাম ‘কেন এ কে জানে’।
অভ্যাসের-সীমা-টানা চৈতন্যের সংকীর্ণ সংকোচেঔদাস্যের ধুলা ওড়ে, আঁখির বিস্ময়রস ঘোচে।মন জড়তায় ঠেকেনিখিলেরে জীর্ণ দেখে,
হেনকালে হে নবীন, তুমি এসে কী বলিলে কানে-বিশ্ব-পানে চাহিলাম, কহিলাম ‘কেন এ কে জানে’।
আমি আজ কোথা আছি, প্রবাসে অতিথিশালা-মাঝে।তব নীললাবণ্যের বংশীধ্বনি দূর শূন্যে বাজে।আসে বৎসরের শেষ,চৈত্র ধরে ম্লান বেশ,হয়তো বা রিক্ত তুমি ফুল ফোটাবার অবসানে—তবু, হে অপূর্ব রূপ, দেখা দিলে কেন যে কে জানে।
Comments
Loading comments…