বৃক্ষবন্দনা

বনবাণী — বনবাণী

অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বানপ্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ;ঊর্ধ্ব শীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনাছন্দোহীন পাষাণের বক্ষ-’পরে; আনিলে বেদনানিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে।

সেদিন অম্বর-মাঝেশ্যামে নীলে মিশ্রমন্ত্রে স্বর্গলোকে জ্যোতিষ্কসমাজেমর্তের মাহাত্ম্যগান করিলে ঘোষণা। যে জীবনমরণতোরণদ্বার বারম্বার করি উত্তরণযাত্রা করে যুগে যুগে অনন্তকালের তীর্থপথেনব নব পান্থশালে বিচিত্র নূতন দেহরথে,তাহারি বিজয়ধ্বজা উড়াইলে নিঃশঙ্ক গৌরবেঅজ্ঞাতের সম্মুখে দাঁড়ায়ে। তোমার নিঃশব্দ রবেপ্রথম ভেঙেছে স্বপ্ন ধরিত্রীর, চমকি উল্লসিনিজেরে পড়েছে তার মনে- দেবকন্যা দুঃসাহসীকবে যাত্রা করেছিল জ্যোতিঃস্বর্গ ছাড়ি দীনবেশেপাংশুম্লান গৈরিকবসন-পরা, খণ্ড কালে দেশেঅমরার আনন্দেরে খণ্ড খণ্ড ভোগ করিবারে,দুঃখের সংঘাতে তারে বিদীর্ণ করিয়া বারে বারেনিবিড় করিয়া পেতে।

মৃত্তিকার হে বীর সন্তান,সংগ্রাম ঘোষিলে তুমি মৃত্তিকারে দিতে মুক্তিদানমরুর দারুণ দুর্গ হতে; যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে;সন্তরি সমুদ্র-উর্মি দুর্গম দ্বীপের শূন্য তীরেশ্যামলের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিলে অদম্য নিষ্ঠায়,দুস্তর শৈলের বক্ষে প্রস্তরের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়বিজয়-আখ্যানলিপি লিখি দিলে পল্লব-অক্ষরেধূলিরে করিয়া মুগ্ধ, চিহ্নহীন প্রান্তরে প্রান্তরেব্যাপিলে আপন পন্থা।

বাণীশূন্য ছিল একদিনজলস্থল শূন্যতল, ঋতুর-উৎসবমন্ত্র-হীন-শাখায় রচিলে তব সংগীতের আদিম আশ্রয়,যে গানে চঞ্চল বায়ু নিজের লভিল পরিচয়,সুরের বিচিত্র বর্ণে আপনার দৃশ্যহীন তনুরঞ্জিত করিয়া নিল, অঙ্কিল গানের ইন্দ্রধনুউত্তরীর প্রান্তে প্রান্তে। সুন্দরের প্রাণমূর্তিখানিমৃত্তিকার মর্তপটে দিলে তুমি প্রথম বাখানিটানিয়া আপন প্রাণে রূপশক্তি সূর্যলোক হতে,আলোকের গুপ্তধন বর্ণে বর্ণে বর্ণিলে আলোতে।ইন্দ্রের অপ্সরী আসি মেঘে মেঘে হানিয়া কঙ্কণবাষ্পপাত্র চূর্ণ করি লীলানৃত্যে করেছে বর্ষণযৌবন-অমৃতরস, তুমি তাই নিলে ভরি ভরিআপনার পত্রপুষ্পপুটে, অনন্তযৌবনা করিসাজাইলে বসুন্ধরা।

হে নিস্তব্ধ, হে মহাগম্ভীর,বীর্যেরে বাঁধিয়া ধৈর্যে শান্তিরূপ দেখালে শক্তির;তাই আসি তোমার আশ্রয়ে শান্তিদীক্ষা লভিবারে,শুনিতে মৌনের মহাবাণী; দুশ্চিন্তার গুরুভারেনতশীর্ষ বিলুষ্ঠিতে শ্যামসৌম্যচ্ছায়াতলে তব-প্রাণের উদার রূপ, রসরূপ নিত্য নব নব,বিশ্বজয়ী বীররূপ ধরণীর, বাণীরূপ তারলভিতে আপন প্রাণে। ধ্যানবলে তোমার মাঝারগেছি আমি, জেনেছি, সূর্যের বক্ষে জ্বলে বহ্নিরূপেসৃষ্টিযজ্ঞে যেই হোম, তোমার সত্তায় চুপে চুপেধরে তাই শ্যামস্নিগ্ধরূপ; ওগো সূর্যরশ্মিপায়ী,শত শত শতাব্দীর দিনধেনু দুহিয়া সদাইযে তেজে ভরিলে মজ্জা, মানবেরে তাই করি দানকরেছ জগৎজয়ী; দিলে তারে পরম সম্মান;হয়েছে সে দেবতার প্রতিস্পর্ধী— সে অগ্নিচ্ছটায়প্রদীপ্ত তাহার শক্তি বিশ্বতলে বিস্ময় ঘটায়ভেদিয়া দুঃসাধ্য বিঘ্নবাধা। তব প্রাণে প্রাণবান,তব স্নেহচ্ছায়ায় শীতল, তব তেজে তেজীয়ান,সজ্জিত তোমার মাল্যে যে মানব, তারি দূত হয়েওগো মানবের বন্ধু, আজি এই কাব্য-অর্ঘ্য লয়েশ্যামের বাঁশির তানে মুগ্ধ কবি আমিঅর্পিলাম তোমায় প্রণামী।

Comments

Loading comments…