মধুমঞ্জরী

বনবাণী — বনবাণী

প্রত্যাশী হয়ে ছিনু এতকাল ধরি,বসন্তে আজ দুয়ারে, আ মরি, মরি,ফুলমাধুরীর অঞ্জলি দিল ভরিমধুমঞ্জরীলতা।কতদিন আমি দেখিতে এসেছি প্রাতে-কচি ডালগুলি ভরি নিয়ে কচি পাতেআপন ভাষায় যেন আলোকের সাথেকহিতে চেয়েছে কথা।

কতদিন আমি দেখেছি গোধুলিকালে,সোনালি ছায়ার পরশ লেগেছে ডালে,সন্ধ্যাবায়ুর মৃদু-কাঁপনের তালেকী যেন ছন্দ শোনে।গহন নিশীথে ঝিল্লি যখন ডাকে,দেখেছি চাহিয়া, জড়িত ডালের ফাঁকে

কালপুরুষের ইঙ্গিত যেন কাকেদূর দিগন্তকোণে।

শ্রাবণে সঘন ধারা ঝরে ঝরঝর,পাতায় পাতায় কেঁপে ওঠে থরথর—মনে হয়, ওর হিয়া যেন ভরভরবিশ্বের বেদনাতে।কতবার ওর মর্মে গিয়েছি চলি,বুঝিতে পেরেছি কেন উঠে চঞ্চলিশরৎশিশিরে যখন সে ঝলমলিশিহরায় পাতে পাতে।

ভুবনে ভুবনে যে প্রাণ সীমানাহারাগগনে গগনে সিঞ্চিল গ্রহতারাপল্লবপুটে ধরি লয় তারি ধারা,মজ্জায় লহে ভরি।কী নিবিড় যোগ এই বাতাসের সনে,যেন সে পরশ পায় জননীর স্তনে,সে পুলকখানি কত-যে সে মোর মনেবুঝিব কেমন করি।

বাতাসে আকাশে আলোকের মাঝখানেঋতুর হাতের মায়ামন্ত্রের টানেকী-যে বাণী আছে প্রাণে প্রাণে ওই জানে,মন তা জানিবে কিসে।

যে ইন্দ্রজাল দ্যুলোকে ভূলোকে ছাওয়াবুকের ভিতর লাগে ওর তারি হাওয়া-বুঝিতে যে চাই কেমন সে ওর পাওয়া,চেয়ে থাকি অনিমিষে।

ফুলের গুচ্ছে আজি ও উচ্ছ্বসিত,নিখিলবাণীর রসের পরশামৃতগোপনে গোপনে পেয়েছে অপরিমিত,ধরিতে না পারে তারে।ছন্দে গন্ধে রূপ-আনন্দে ভরা,ধরণীর ধন গগনের-মন-হরা,শ্যামলের বীণা বাজিল মধুস্বরাঝংকারে ঝংকারে।

আমার দুয়ারে এসেছিল নাম ভুলিপাতা-ঝলমল অঙ্কুরখানি তুলি,মোর আঁখি-পানে চেয়েছিল দুলি দুলিকরুণপ্রশ্নরতা।তার পরে কবে দাঁড়ালো যে দিন ভোরেফুলে ফুলে তার পরিচয়লিপি ধরেনাম দিয়ে আমি নিলাম আপন ক’রে-মধুমঞ্জরীলতা।

তার পরে যবে চলে যাব অবশেষেসকল ঋতুর অতীত নীরব দেশে,

তখনো জাগাবে বসন্ত ফিরে এসেফুল-ফোটাবার ব্যথা।বরষে বরষে সেদিনও তো বারে বারেএমনি করিয়া শূন্যঘরের দ্বারেএই লতা মোর আনিবে কুসুমভারেফাগুনের আকুলতা।

তব পানে মোর ছিল যে প্রাণের প্রীতিওর কিশলয়ে রূপ নেবে সেই স্মৃতি,মধুর গন্ধে আভাসিবে নিতি নিতিসে মোর গোপন কথা।অনেক কাহিনী যাবে যে সেদিন ভুলে-স্মরণচিহ্ন কত যাবে উন্‌মূলে,মোর দেওয়া নাম লেখা থাক্ ওর ফুলে।মধুমঞ্জরীলতা।

Comments

Loading comments…