শাল
বনবাণী — বনবাণী
বাহিরে যখন ক্ষুব্ধ দক্ষিণের মদির পবনঅরণ্যে বিস্তারে অধীরতা, যবে কিংশুকের বনউচ্ছৃঙ্খল রক্তরাগে স্পর্ধায় উদ্যত, দিশি দিশিশিমুল ছড়ায় ফাগ, কোকিলের গান অহর্নিশিজানে না সংযম, যবে বকুল অজস্র সর্বনাশেস্খলিত দলিত বনপথে, তখন তোমার পাশেআসি আমি হে তপস্বী শাল, যেথায় মহিমারাশিপুঞ্জিত করেছ অভ্রভেদী, যেথা রয়েছ বিকাশিদিগন্তে গম্ভীর শান্তি। অন্তরের নিগূঢ় গভীরেফুল ফুটাবার ধ্যানে নিবিষ্ট রয়েছ ঊর্ধ্ব শিরে;চৌদিকের চঞ্চলতা পশে না সেথায়। অন্ধকারেনিঃশব্দ সৃষ্টির মন্ত্র নাড়ী বেয়ে শাখায় সঞ্চারে;
সে অমৃত মন্ত্রতেজ নিলে ধরি সূর্যলোক হতেনিভৃত মর্মের মাঝে; স্নান করি আলোকের স্রোতেশুনি নিলে নীল আকাশের শান্তিবাণী; তার পরেআত্মসমাহিত তুমি, স্তব্ধ তুমি- বৎসরে বৎসরেবিশ্বের প্রকাশযজ্ঞে বারম্বার করিতেছ দাননিপুণ সুন্দর তব কমণ্ডলু হতে অফুরানপুণ্যগন্ধী প্রাণধারা; সে ধারা চলেছে ধীরে ধীরেদিগন্তে শ্যামল ঊর্মি উচ্ছ্বাসিয়া, দূর শতাব্দীরেশুনাতে মর্মর আশীর্বাণী। রাজার সাম্রাজ্য কতশতকালের বন্যায় ভাসে, ফেটে যায় বুদ্বুদের মতো,মানুষের ইতিবৃত্ত সুদুর্গম গৌরবের পথেকিছুদূর যায়, আর বারম্বার ভগ্নচূর্ণ রথেকীর্ণ করে ধূলি। তারি মাঝে উদার তোমার স্থিতি,ওগো মহাশাল, তুমি সুবিশাল কালের অতিথি;আকাশেরে দাও সঙ্গ বর্ণরঙ্গে শাখার ভঙ্গিতে,বাতাসেরে দাও মৈত্রী পল্লবের মর্মরসংগীতেমঞ্জরীর গন্ধের গণ্ডূষে। যুগে যুগে কত কালপথিক এসেছে তব ছায়াতলে, বসেছে রাখাল,শাখায় বেঁধেছে নীড় পাখি; যায় তারা পথ বাহিআসন্ন বিস্মৃতি-পানে, উদাসীন তুমি আছ চাহি।নিত্যের মালার সূত্রে অনিত্যের যত অক্ষগুটিঅস্তিত্বের আবর্তনে দ্রুতবেগে চলে তারা ছুটি;মর্তপ্রাণ তাহাদের ক্ষণেক পরশ করে যেইপায় তারা জপনাম, তার পরে আর তারা নেই,নেমে যায় অসংখ্যের তলে। সেই চলে-যাওয়া দল
রেখে দিয়ে গেছে যেন ক্ষণিকের কলকোলাহলদক্ষিণহাওয়ায় কাঁপা ওই তব পত্রের কল্লোলে,শাখার দোলায়। ওই ধ্বনি স্মরণে জাগায়ে তোলেকিশোর বন্ধুরে মোর। কতদিন এই পাতাঝরাবীথিকায়, পুষ্পগন্ধে বসন্তের-আগমনী-ভরাসায়াহ্নে দুজনে মোরা ছায়াতে-অঙ্কিত চন্দ্রালোকেফিরেছি গুঞ্জিত আলাপনে। তার সেই মুগ্ধ চোখেবিশ্ব দেখা দিয়েছিল নন্দনমন্দার-রঙে-রাঙা;যৌবন-তুফান-লাগা সে দিনের কত নিদ্রাভাঙাজ্যোৎস্নামুগ্ধ রজনীর সৌহার্দ্যের সুধারসধারাতোমার ছায়ার মাঝে দেখা দিল, হয়ে গেল সারা।গভীর আনন্দক্ষণ কতদিন তব মঞ্জরীতেএকান্ত মিশিয়াছিল একখানি অখণ্ড সংগীতেআলোকে আলাপে হাস্যে, বনের চঞ্চল আন্দোলনে,বাতাসের উদাস নিশ্বাসে।
প্রীতিমিলনের ক্ষণেসে দিনের প্রিয় সে কোথায়, বর্ষে বর্ষে দোলা দিতযাহার প্রাণের বেগ উৎসব করিয়া তরঙ্গিত।তোমার বীথিকাতলে তার মুক্ত জীবনপ্রবাহআনন্দচঞ্চগতি মিলায়েছে আপন উৎসাহপুষ্পিত উৎসাহে তব। হায়, আজি তব পত্রদোলেসেদিনের স্পর্শ নাই। তাই এই বসন্তকল্লোলে,পূর্ণিমার পূর্ণতায়, দেবতার অমৃতের দানেমর্তের বেদনা মেশে।
চাহি আজ দূর-পানেস্বপ্নচ্ছবি চোখে ভাসে- ভাবী কোন্ ফাল্গুনের রাতেদোলপূর্ণিমায় সাজাতে আসিছে কারা পদ্মপাতেপলাশ বকুল চাঁপা, আলিম্পনলেখা এঁকে দিতেতব ছায়াবেদিকায়, বসন্তের আবাহনগীতেপ্রসন্ন করিতে তব পুষ্পবরিষন। সে উৎসবেআজিকার এই দিন পথপ্রান্তে লুষ্ঠিত নীরবে।কোলে তার পড়ে আছে এ রাত্রির উৎসবের ডালা।আজিকার অর্ঘ্যে আছে যতগুলি সুরে গাঁথা মালাকিছু তার শুকায়েছে, কিছু তার আছে অমলিন;দুয়েকটি তুলে নিল যাত্রীদল; সে দিন এ দিনদোঁহে দোঁহা-মুখ চেয়ে বদল করিয়া নিল মালা-নূতনে ও পুরাতনে পূর্ণ হল বসন্তের পালা।
Comments
Loading comments…