হাসির পাথেয়

বনবাণী — বনবাণী

হিমালয়-গিরিপথে চলেছিনু কবে বাল্যকালে,মনে পড়ে। ধূর্জটির তাণ্ডবের ডম্বরুর তালেযেন গিরি-পিছে গিরি উঠিছে নামিছে বারে বারেতমোঘন অরণ্যের তল হতে মেঘের মাঝারেধরার ইঙ্গিত যেথা স্তব্ধ রহে শূন্যে অবলীন,তুষারনিরুদ্ধ বাণী, বর্ণহীন, বর্ণনাবিহীন।

সেদিন বৈশাখমাস, খণ্ড খণ্ড শস্যক্ষেত্রস্তরেরৌভ্রবর্ণ ফুল; মেঘের কোমল ছায়া তারি ’পরেযেন স্নিগ্ধ আকাশের ক্ষণে ক্ষণে নীচে নেমে এসেধরণীর কানে কানে প্রশংসার বাক্য ভালোবেসে।

সেইদিন দেখেছিনু নিবিড় বিস্ময়মুগ্ধ চোখেচঞ্চল নির্ঝরধারা গুহা হতে বাহিরি আলোকেআপনাতে আপনি চকিত, যেন কবি বাল্মীকিরউচ্ছ্বসিত অনুষ্টুভ। স্বর্গে যেন সুরসুন্দরীরপ্রথম যৌবনোল্লাস, নূপুরের প্রথম ঝংকার;আপনার পরিচয়ে নিঃসীম বিস্ময় আপনার,আপনারি রহস্যের পিছে পিছে উৎসুকচরণেঅশ্রান্ত সন্ধান। সেই ছবিখানি রহিল স্মরণেচিরদিন মনোমাঝে।

সেদিনের যাত্রাপথ হতেআসিয়াছি বহুদূরে; আজি ক্লান্ত জীবনের স্রোতেনেমেছে সন্ধ্যার নীরবতা। মনে উঠিতেছে ভাসি,শৈলশিখরের দূর নির্মল শুভ্রতা রাশি রাশিবিগলিত হয়ে আসে দেবতার আনন্দের মতোপ্রত্যাশী ধরণী যেথা প্রণামে ললাট অবনত।সেই নিরন্তর হাসি অবলীল গতিচ্ছন্দে বাজেকঠিন-বাধায়-কীর্ণ শঙ্কায়-সংকুল পথ-মাঝেদুর্গমেরে করি অবহেলা। সে হাসি দেখেছি বসিশস্যভরা তটচ্ছায়ে, কলস্বরে চলেছে উচ্ছ্বসিপূর্ণবেগে। দেখেছি অম্লান তারে তীব্র রৌদ্রদাহেশুষ্ক শীর্ণ দৈন্যদিনে বহি যায় অক্লান্তপ্রবাহেসৈকতিনী, রক্তচক্ষু বৈশাখেরে নিঃশঙ্ক কৌতুকেকটাক্ষিয়া- অফুরান হাস্যধারা মৃত্যুর সম্মুখে।

হে হিমাদ্রি, সুগম্ভীর, কঠিন তপস্যা তব গলিধরিত্রীরে করে দান যে অমৃতবাণীর অঞ্জলিএই সে হাসির মন্ত্র, গতিপথে নিঃশেষ পাথেয়,নিঃসীম সাহসবেগ, উল্লসিত, অশ্রান্ত, অজেয়।

Comments

Loading comments…