প্রথম সর্গ

বন-ফুল

চাইনা জেয়ান, চাইনা জানিতেসংসার, মানুষ কাহারে বলেবনের কুসুম ফুটিতাম বনেশুকায়ে যেতাম বনের কোলে!

নিশার আঁধার রাশি করিয়া নিরাসরজত সুষমাময়, প্রদীপ্ত তুষার চয়হিমাদ্রি-শিখর-দেশে পাইছে প্রকাশঅসংখ্য শিখর মালা বিশাল মহান্;ঝর্ঝরে নির্ঝর ছুটে, শৃঙ্গ হ’তে শৃঙ্গ উঠেদিগন্ত সীমায় গিয়া যেন অবসান।শিরোপরি চন্দ্র সূর্য্য, পদে লুটে পৃথ্বীরাজ্যমস্তকে স্বর্গের ভার করিছে বহন;

তুষারে আবরি শির, ছেলেখেলা পৃথিবীরভুরুক্ষেপে যেন সব করিছে লোকনকত নদী কত নদ, কত নির্ঝরিণী হ্রদপদতলে পড়ি ভার করে আস্ফালন!মানুষ বিস্ময়ে ভয়ে, দেখে রয় স্তব্ধ হয়েঅবাক্‌ হইয়া যায় সীমাবদ্ধ মন!

চৌদিকে পৃথিবী ধরা নিদ্রায় মগন,তীব্র শীত-সমীরণে, দুলায়ে পাদপগণেবহিছে নির্ঝর-বারি করিয়া চুম্বন,হিমাদ্রি শিখর শৈল করি আবরিতগভীর জলদরাশি, তুষার বিভায় নাশিস্থির ভাবে হেথা সেথা রহেছে নিদ্রিত।পর্ব্বতের পদতলে, ধীরে ধীরে নদী চলেউপল রাশির বাধা করি অপগত,নদীর তরঙ্গকুল, সিক্ত করি বৃক্ষ-মূলনাচিছে পাষাণ-তট করিয়া প্রহত!চারি দিকে কতশত, কলকলে অবিরতপড়ে উপত্যকা মাঝে নির্ঝরের ধারা।

আজি নিশীথিনী কাঁদে, আঁধারে হারায়ে চাঁদেমেঘ ঘোমটায় ঢাকি কবরীর তারা।

কল্পনে! কুটীর কার তটিনীর তীরেতরুপত্র ছায়ে ছায়ে, পাদপের গায়ে গায়েডুবায়ে চরণ-দেশ স্রোতস্বিনী নীরে?চৌদিকে মানব-বাস নাহিক কোথায়নাহি জন-কোলাহল, গভীর বিজন-স্থলশান্তির ছায়ায় যেন নীরবে ঘুমায়।কুসুম-ভূষিত-বেশে, কুটীরের শিরোদেশেশোভিছে লতিকা-মালা প্রসারিয়া কর,কুসুমস্তবক রাশি, দুয়ার উপরে আসিউঁকি মারিতেছে যেন কুটীর ভিতর!কুটীরের একপাশে, শাখা-দীপ ধূমশ্বাসেস্তমিত আলোক শিখা করিছে বিস্তার।অস্পষ্ট আলোক তায় আঁধার মিশিয়া যায়মান ভাব ধরিয়াছে গৃহ-ঘর দ্বার!

গভীর নীরব ঘর, শিহরে যে কলেবর।হৃদয়ে রুধিরোচ্ছ্বাস স্তব্ধ হয়ে বয়—বিষাদের অন্ধকারে, গভীর শোকের ভারেগভীর নীরব গৃহ অন্ধকার ময়!কেওগো নবীনা বালা, উজলি পরশ-শালাবসিয়া মলিন ভাবে তৃণের আসনে?কোলে তার সঁপি শির, কে শুয়ে হইয়া স্থির,থেক্যে থেকে দীর্ঘশ্বাস টনিয়া সঘনে,সুদীর্ঘ ধবল কেশ, ব্যাপিয়া কপোল দেশশ্বেতশ্মশ্রু ঢাকিয়াছে বক্ষের বসন,অবশ জ্ঞেয়ান হারা, স্তিমিত লোচনতারাপলক নাহিক পড়ে নিস্পন্দ নয়ন।বালিকা মলিন মুখে, বিশীর্ণা বিষাদ দুখেশোকে, ভয়ে অবশ সে সুকোমল হিয়াআনত করিয়া শির, বালিকা হইয়া স্থিরপিতার বদন পানে রয়েছে চাহিয়া;এলোথেলো বেশবাস, এলোথেলো কেশপাশঅবিচল আঁখি পার্শ্ব করেছে আবৃত!নয়ন পলক স্থির, হৃদয় পরাণ ধীরশিরায় শিরায় রহে স্তবধ শোনিত

হৃদয়ে নাহিক জ্ঞান, পরাণে নাহিক প্রাণচিন্তার নাহিক রেখা হৃদয়ের পটে!নয়নে কিছুনা, দেখে, শ্রবণে স্বর না ঠেকেশোকের উচ্ছ্বাস নাহি লাগে চিত্ততটে,সুদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলি, সুধীরে নয়ন মেলিক্রমে ক্রমে পিতা তাঁর পাইলেন জ্ঞান,সহসা সভয় প্রাণে, দেখি চারিদিক পানেআবার ফেলিল শ্বাস ব্যাকুল পরাণকি যেন হারিয়ে গেছে, কি যেন আছেনা আছেশোকে ভয়ে ধীরে ধীরে মুদিল নয়নসভয়ে অস্ফুট স্বরে সরিল বচন“কোথা মা কমলা মোর কোথা মা জননী?”চমকি উঠিল যেন নীরব রজনী!চমকি উঠিল যেন নীরব অবনী!উর্ম্মিহীন নদী যথা ঘুমায় নীরবেসহসা করণ ক্ষেপে সহসা উঠেরে কেঁপেসহসা জাগিয়া উঠে চল উর্ম্মি সবে!কমলার চিত্তবাপী সহসা উঠিল কাঁপিপরাণে পরাণ এলে হৃদয়ে হৃদয়।স্তবধ শোণিত রাশি, আস্ফালিল হৃদে আসি

আবার হইল চিন্তা হৃদয়ে উদয়!শোকের আঘাত লাগি, পরাণ উঠিল জাগিআবার সকল কথা হইল স্মরণ।বিষাদে ব্যাকুল হৃদে নয়ন যুগল মুদেআছেন জনক তাঁর, হেরিল নয়ন;স্থির নয়নের পাতে পড়িল পলক,শুনিল কাতর স্বরে ডাকিছে জনক“কোথা মা কমলা মোর কোথা মা জননী।”বিষাদে যোড়শী বালা চমকি অমনি(নেত্রে অশ্রুধারা ঝরে) কহিল কাতর স্বরেপিতার নয়ন পরে রাখিয়া নয়ন!“কেন পিতা! কেন পিতা! এই যে রয়েছি হেতা”বিষাদে নাহিক আর সরি বচন!বিষাদে মেলিয়া আঁখি, বালার বদনে রাখিএক দৃষ্টে স্থিরনেত্রে রহিল চাহিয়া।নেত্রপ্রান্তে দর দরে, শোক অশ্রুবারি ঝরেবিষাদে সন্তাপে শোকে আলোড়িত হিয়া!গভীর নিশ্বাসক্ষেপে হৃদয় উঠিল কেঁপেফাটিয়া বা যায় যেন শোণিত-আধার!ওষ্ঠ প্রান্ত থর থরে কাঁপিছে বিষাদ ভরে।

নয়ন পলক পত্র কাঁপে বার বারশোকের স্নেহের অশ্রু করিয়া মোচনকমলার পানে চাহি কহি তখন।“আজি রজনীতে মাগো! পৃথিবীর কাছেবিদায় মাগিতে হবে, এই শেষ দেখা ভবেজানিনা তোমার শেষে অদৃষ্টে কি আছে;পৃথিবীর ভালবাসা পৃথিবীর সুখ আশা,পৃথিবীর স্নেহ প্রেম ভক্তি সমুদায়দিনকর, নিশাকর, গ্রহ তারা চরাচরসকলের কাছে আজি লইব বিদায়;গিরিরাজ হিমালয়, ধবল তুষারচয়অয়িগো কাঞ্চন শৃঙ্গ মেঘ-আবরণ!অয়ি নিঝরিণীমালা, স্রোতস্বিনী শৈলবালাঅয়ি উপত্যকে! অয়ি হিমশৈল-বন!আজি তোমাদের কাছে মুমুর্ষু বিদায় যাচেআজি তোমাদের কাছে অন্তিম বিদায়।কুটীর পরণ-শলা, সহিয়া বিষাদ জ্বালাআশ্রয় লইয়াছিনু বাহার ছায়ায়স্তিমিতদীপের প্রায়, এতদিন যেথা হায়অন্তিম জীবন রশ্মি করেছি ক্ষেপণ;

আজিকে তোমার কাছে মুমুর্ষু বিদায় যাচেতোমারি কোলের পরে সঁপিব জীবন!নেত্রে অশ্রুবারি ঝরে নহে তোমাদের তরেতোমাদের তরে চিত্ত ফেলিছেনা শ্বাস,আজি জীবনের ব্রত উদযাপন করিবতবাতাসে মিশাবে আজি অন্তিমনিশ্বাস!কাঁদিনা তাহার তরে হৃদয় শোকের ভরেহতেছেনা উৎপীড়িত তাহারো কারণআহাহা! দুখিনী বালা সহিবে বিষাদ জ্বালাআজিকার নিশিভোর হইবে যখন?কালি প্রাতে একাকিনী, অসহায়া, অনাথিনী,সংসার সমুদ্র মাঝে ঝাঁপ দিতে হবে!সংসারযাতনাজ্বালা কিছুনা জানিস্ বালাআজিও!—আজিও তুই চিনিস্ বিভবে!ভাবিতে হৃদয় জ্বলে, মানুষ কারে যে বলেজানিস‍্নে কারে বলে মানুষের মন।কারদ্বারে কালপ্রাতে, দাঁড়াইবি শূন্য-হাতেকালিকে কাহার দ্বারে করিবি রোদন!অভাগা পিতার তোর—জীবনের নিশা ভোরবিষাদ নিশার শেষে উঠিবেক রবি

আজ রাত্রি ভোর হ’লে—কারে আর পিতা বলেডাকিবি, কাহার কোলে হাসিবি, খেলিবি?জীবধাত্রী বসুন্ধরে!—তোমার কোলের পরেঅনাথা বালিকা মোর করিনু অর্পণ।দিনকর। নিশাকর! আহা এ বালার পরতোমাদের স্নেহদৃষ্টি করিও বর্ষণ!শুন সব দিক‍্বালা! বালিকা না পায় জ্বালাতোমরা জননীস্নেহে করিও পালন!শৈলবালা! বিশ্বমাতা! জগতের স্রষ্টা পাতা!শত শত নেত্রবারি সঁপি পদতলেবালিকা অনাথা বোলে, স্থান দিও তব কোলেআবৃত করিও এরে মেহের আঁচিলে!মুছ মাগো অশ্রুজল! আর কি কহিব বল!অভাগা পিতারে ভোল জম্মের মতন।আটকি আসিছে স্বর!—অবসন্ন কলেবরক্রমশঃ মুদিয়া মাগো! আসিছে নয়ন!মুষ্টিবদ্ধ করতল,—শোনিত হইছে জল,শরীর হইয়া আসে শীতল পাষাণ।এই—এই শেষবার—কুটারের চারিধারদেখে লই! দেখে লই মেলিয়া নয়ান!

শেষবার নেত্রভোরে—এই দেখে লই তোরেচিরকাল তরে আঁখি হইবে মুদ্রিত!সুখে থেকো চিরকাল।—সুখে থেকো চিরকাল!শান্তির কোলেতে বালা থাকিও নিদ্রিত!”স্তবধ হৃদয়োচ্ছ্বাস! স্তবধ হইল শ্বাস!স্তবধ লোচন তারা! স্তবধ শরীর!বিষম শোকের জ্বালা—মূর্চ্ছিয়া পড়িল বালাকোলের উপরে আছে জনকের শির!গাইল নির্ঝর বারি বিষাদের গানশাখার প্রদীপ ধীরে হইল নির্বাণ!

Comments

Loading comments…