দ্বাদশ সর্গ

ভগ্নহৃদয়

সুরেশ।—যাইতে বলিছ বালা, কোথা যাব আর?দিগ্বিদিক হারাইয়া, ও রূপ-অনলে গিয়াএ পতঙ্গ পাখা দুটি পুড়ায়েছে তার!রূপসী, ক্ষমতা আর নাই উড়িবার!

নলিনী।—রূপ কিছু মোর না যদি থাকিতবড় হইতাম সুখী,দেখিতাম যত পতঙ্গ তোমরাআসিতে কি লোভ দেখি!রূপ—রূপ—রূপ—পোড়া রূপ ছাড়াআর কিছু মোর নাই?তোমাদের মত পতঙ্গের দলচারিদিকে ঘিরে করে কোলাহল,দিবস রজনী করে জ্বালাতন,ঝাঁপায়ে পড়ে গো না মানে বারণ;পোড়া রূপ থেকে এই যদি হোলহেন রূপ নাহি চাই!হেন কেহ নাই হায়—

শুধু ভালবাসে নলিনী বালারেআর কিছু নাহি চায়!(অশােকের প্রতি)এই যে অশোক! ওই দেখ সখা—দিবে কি আমারে দিবে কি তুলেবক্ষ হোতে মোর ফুল উড়ে গিয়েপোড়েছে তোমার চরণ-মূলে!যদি সখা ওটি রাখিতে চাওতোমারি কাছেতে রাখিয়া দাও;—দুদণ্ডেই ওটি যাইবে শুকায়েশুকায়ে গেলেই দিওগো ফেলে,যতখণ ওটি নাহি পড়ে ঝোরেততখণো যদি মনে রাখ মোরে,ততখনো যদি না থাক’ ভুলে,তা’হোলেও সখা বড় ভাগ্য মানিচিরকাল মনে সে কথা রবে;—যদি সখা নাহি লইতে চাওএখনি ভূতলে ফেলিয়া দাও,চরণে দলিয়া ফেল গো তবে!কত শত হেন অভাগা কুসুমআপনি পোড়েছে চরণে আসি,কত শত লোক চেয়েও দেখেনি,চরণে দলিয়া গিয়াছে হাসি,তবে আর কেন, ফেলগো দলিয়া

কিসের সরম আমার কাছে?যে কুসুম, সখা, শাখা হোতে ঝোরেচরণের নীচে পড়ে সাধ কোরে,কে না জানে বল তাহার কপালেচরণে দলিয়া মরণ আছে!(নীরদের প্রতি)এই যে নীরদ, এনেছ গাঁথিয়াগোলাপ ফুলের হার!ভূলে গেছ কেন বাছিয়া ফেলিতেকাঁটা গুলি, সখা, তার?তবে গো পরায়ে দাও—না হয় কাঁটায় ছিঁড়িবে হৃদয়,না হয় এ বুক হবে রক্তময়,এনেছ গাঁথিয়া গোলাপ যখনতবে গো পরায়ে দাও!কতই না কাঁটা বিঁধিয়াছে হেথারাখিতে গোলাপ বুকের কাছে,জ্বলুক হৃদয়—বহুক্ শোণিত,তা’ বোলে গোলাপ ফেলিতে আছে?(প্রমােদের প্রতি)চাইনে তোমার ফুল উপহার,যাও—হেথা হোতে যাও!দুটি ফুল দিয়ে, ফুল বিনিময়েহাসি কিনিবারে চাও!

নলিনি, নলিনি, কেনরে হলিনিপাষাণ-কঠিন মন?দুটো কথা শুনে—দুটো ফুল পেয়েভাঙ্গে কেন তোর পণ?পলকে পলকে ভাঙ্গিস্ গড়িস্,—ভেঙ্গে যায় মৃদু শ্বাসে,যার পরে তুই করিস্‌লো মানসেই মনে মনে হাসে!দেখি আজ তুই কেমন পারিস্থাকিবারে অভিমানে?কহিনে কথা-হাসিনে হাসি—চাহিনে তার পানে!বিনােদ।—একটি কথাও কহিল না মােরে,পাশ দিয়া গেল চলি!গর্ব্ব-ভার-গুরু প্রতি পদক্ষেপেমরমে মরমে দলি।কেন গো—কেন গো কি আমি কোরেছি—কিছুত না পড়ে মনে,কহেছে ত কথা প্রমোদের সাথেঅশোক—নীরদ সনে!গেল যে হৃদয়—কত দিন আররবে সে এমন করি।কখনো উঠিয়া আকাশের পরেকখনো পাতালে পড়ি!

অনিল।—(দূর হইতে দেখিয়া)না জানি কিসের জ্যোতি নয়নে আছে গো বালা!যেদিকে চাহিয়া দেখ সেদিক করিছ আলা।অন্ধকার-ভেদী এক হাসিময় তারা সম—প্রাণের ভিতর পানে চাহিয়া রোয়েছ মম!ফিরায়ে লইনু মুখ তবুও কেনগো দেখিচাহিছে হৃদয় পানে দুটি হাসিমাখা আঁখি!আঁখি মুদি, তবু কেন হেরিগো প্রাণের কাছেদুটি আঁখি চেয়ে আছে এক দৃষ্টে চেয়ে আছে!হেথা না পাইবি ঠাঁই—দূর হ’ তুইরে তারা—চন্দ্রমা জোছনা করি এ হৃদি রেখেছে ভরি,তুই তারা সে আলোকে হইবি আপনা-হারা!দূর হ’রে—দূর হ’রে-দূর হ’রে ক্ষুদ্র তারা!কিন্তু কি মধুর মুখ ভাব ভরে ঢল ঢল!কোমল কুসুম সম সমীরণে টল মল।দেখিনি এহেন মুখ সুমধুর ভাব ময়,কেন? ললিতার মুখ এ হোতে কি ভাল নয়?আহা সে মধুর বড় ললিতার মুখ খানি,আঁখি কত কথা কয়, মুখেতে নাইক বাণী;—বাহির হইতে চায় তার সেই মৃদু হাসি,অধরের চারিধারে কতবার উঁকি মারে,লজ্জায় মরিয়া যায় কেবল দুই পা আসি!তার মুখ পূর্ণ-রাকা সরমের মেঘে ঢাকা,মধুর মুখানি তার আমি বড় ভালবাসি!

ললিতার চেয়ে কি গো মুখ খানি ভাল এর?উভেরি মধুর মুখ-দুই ভাব দুজনের—ললিতা সে লাজময়ী মুখেতে নাইক কথামাটি পানে চেয়ে আছে যেন লজ্জাবতী লতা।নলিনী, নলিনী সম কেমন রোয়েছে ফুটি,বরষার নদী জল করিতেছে টলমলহেলি দুলি লহরীতে পড়িতেছে লুটি লুটি।—উভেরি মধুর মুখ ললিতার, নলিনীর,অধীর সৌন্দর্য্য-কারো, কারো বা প্রশান্ত স্থির!কিন্তু নলিনীর মুখ ভাবের খেলার গেহসেথা ভাব-শিশু গুলি করিতেছে কোলাকুলি,কেহবা অধরে হাসে, নয়নে নাচিছে কেহ,এই যে অধরে ছিল এই সে নয়নে গেছে,দুদণ্ড খেলায়ে কেহ ঘুমাইয়া পড়িয়াছে!কভুবা দু’তিন জনে নাচিতেছে এক সনে,পলক পড়িতে চোখ আরত তাহারা নাই;নলিনীর মুখখানি ভাবের খেলার ঠাই!নলিনীর মুখ পানে যতই চাহিয়া থাকিনূতন নূতন শোভা দেখিতে পায়যে আঁখি;কিন্তু ললিতার মুখ কখনো এমন নয়।এত সে কয়না কথা, এত ভাব নাই সেথা,নহেগো এমনতর অধীর মাধুর্য্য ময়!নাইবা এমন হোল তাহাতে কি আছে হানি।না হয় দেথিতে ভাল নলিনীর মুখখানি!

তবু ললিতারে মোর ভাল আমি বাসি ত রে!তবু ত সৌন্দর্য্য তার এ হৃদি রোয়েছে ভোরে!রূপেতে কি যায় আসে? রূপ কেবা ভাল বাসে?ললিতা নলিনী কাছে না হয় রূপেতে হারে—ভালবাসি—ভালবাসি—তবু আমি ললিতারে!নলিনী।—(বিনােদের কাছে পুনর্ব্বার ফিরিয়া আসিয়া)কেন হেন আহা মলিন আনন,আঁখি নত মাটি পানে!তোমারে বিনোদ পাইনি দেখিতেদাঁড়াইয়া এই খানে!শিথিল হইয়া পড়েছে ঝুলিয়াফুলের বলয় মোর,দাওনাগো সখা দাওনা তুলিয়াবাঁধগো আঁটিয়া ডোর!

(নলিনীর গান)

এস মন, এস, তোমাতে আমাতেমিটাই বিবাদ যত!আপনার হোয়ে কেন মোরা দোঁহেরহিগো পরের মত?আমি যাই এক দিকে, মন মোর!তুমি যাও আর দিকে,যার কাছ হোতে ফিরাই নয়নতুমি চাও তার'দিকে!

তার চেয়ে এস দুজনে মিলিয়েহাত ধোরে যাই এক পথ দিয়ে,আমারে ছাড়িয়ে অন্য কোন খানেযেওনা কখনো আর!পারিনা কি মোরা দুজনে থাকিতে,দোঁহে হেসে খেলে কাল কাটাইতে?তবে কেন তুই না শুনে বারণযাস্‌রে পরের দ্বার?তুমি আমি মোর থাকিতে দুজন,বল্ দেখি, হৃদি, কিবা প্রয়োজনঅন্য সহচরে আর?এত কেন সাধ বল্ দেখি, মন,পর ঘরে যেতে যখন তখন,সেথা কিরে তুই আদর পা’স?বল্‌ত কতনা সহিস্ যাতনা?দিবানিশি কত সহিস্ লাঞ্ছনা?তবু কিরে তোর মিটেনি আশ?আয়, ফিরে আয়—মন, ফিরে আয়—দোঁহে এক সাথে করিব বাস!অনাদর আর হবেনা সহিতে,দিবস রজনী পাষাণ বহিতে,মরমে দহিতে, মুখে না কহিতে,ফেলিতে দুখের শ্বাস!শুনিলিনে কথা? আসিলিনে হেথা?

ফিরিলিনে একবার?সখিলো, দুরন্ত হৃদয়ের সাথেপেরে উঠিনেত আর!“নয়রে সুখের খেলা ভালবাসা!”কত বুঝালেম তায়,—হেরিয়া চিকণ সোণার শিকলখেলাইতে যায় হৃদয় পাগল—খেলাতে খেলাতে না জেনে না শুনেজড়ায় নিজের পায়!বাহিরিতে চায় বাহিরিতে নারে,করে শেষে হায় হায়!শিকল ছিঁড়িয়ে এসেছে ক’বারআবার কেন রে যায়?চরণে শিকল বাঁধিয়া কঁদিতেনা জানি কি সুখ পায়!তিলেক রহেনা আমার কাছেতেযতই কাঁদিয়া মরি,এমন দুরন্ত হৃদয় লইয়াস্বজনি, বল্ কি করি?

অনিল।—ওঠ্ হেথা হােতে—চল্ চল্ যাই,কি কারণে হেথা আছিস্ আর!মুদিয়া আসিছে মনের নয়ন,

মনের চরণে পড়িছে ভার!ললিতা আমার! না থাকুক্ রূপনাইবা গাহিতে পারিলি গান,ভাল বাসি তোরে, ভাল বাসিব রেযত দিন দেহে রহিবে প্রাণ!(নলিনী ব্যতীত আর সকলের প্রস্থান)নলিনী।—পারিনে ত আর, বসি এই খানে,ওই যে এদিকে আসিছে কবি!কথা আজ মোরে কহিতে হইবে,র'বনা বসিয়া অচল ছবি!কি কথা বলব? ভাবিতেছি মনে,কিছুই ত ভেবে নাহিক পাই;বলিব কি তারে—“তোমরা কবিগো,তোমাদের ভাল বাসিতে নাই!বুঝিতে পারনা আপনার মন,দিবা নিশি বৃথা করগো শোক,ভাল বাসা তরে আকুল হৃদয়ভাল বাসিবার পাওনা লোক!মনে তোমাদের সৌন্দর্য্য জাগিছেধরায় তেমন পাওনা খুঁজে,তবুও ত'ভাল বাসিতেই হবেনহিলে কিছুতে মন না বুঝে!অবশেষে কারে পাও দেখিবারেনেশায় আপনা ভুলি,

সাজাইয়া দেয় কলপনা তারেনিজের গহনা খুলি।আসি কলপনা কুহকিনী বালানয়নে কি দেয় মায়া,কলপনা তারে ঢেকে রাখে নিজেদিয়ে নিজ জ্যোতি ছায়া।কল্পনা-কুহকে মায়া মুগ্ধ চোকেকি দেখিতে দেখ কিবা,অপরূপ সেই প্রতিমা তাহারপূজ মনে নিশি দিবা!যত যায় দিন, যত যায় দিন,যত পাও তারে পাশেদেবীর জ্যোতি সে হারায় তাহারমানুষ হইয়া আসে!ভাল বাসা যত দূরে চলি যায়হাহাকার কর মনে,কলপনা কাঁদে ব্যথিত হইয়াআপনার প্রতারণে!আমি গো অবলা-কবির প্রণয়অত নাহি করি আশা,আমি চাই নিজ মনের মানুষশাদাশিদে ভালবাসা!”এমনি করিয়ে বাতাসের পরেমিছে অভিমান বাঁধি

অকারণে তার করিব লাঞ্ছনাঅভিমানে কাঁদি কাঁদি।কিছুতে সান্ত্বনা না আমি মানিব,দূরেতে যাইব চোলেকাছেতে আসিতে করিব বারণকরুণ চোখের জলে।

শুধু ভালবাসে নলিনী বালারেআর কিছু নাহি চায়!(অশােকের প্রতি)এই যে অশোক! ওই দেখ সখা—দিবে কি আমারে দিবে কি তুলেবক্ষ হোতে মোর ফুল উড়ে গিয়েপোড়েছে তোমার চরণ-মূলে!যদি সখা ওটি রাখিতে চাওতোমারি কাছেতে রাখিয়া দাও;—দুদণ্ডেই ওটি যাইবে শুকায়েশুকায়ে গেলেই দিওগো ফেলে,যতখণ ওটি নাহি পড়ে ঝোরেততখণো যদি মনে রাখ মোরে,ততখনো যদি না থাক’ ভুলে,তা’হোলেও সখা বড় ভাগ্য মানিচিরকাল মনে সে কথা রবে;—যদি সখা নাহি লইতে চাওএখনি ভূতলে ফেলিয়া দাও,চরণে দলিয়া ফেল গো তবে!কত শত হেন অভাগা কুসুমআপনি পোড়েছে চরণে আসি,কত শত লোক চেয়েও দেখেনি,চরণে দলিয়া গিয়াছে হাসি,তবে আর কেন, ফেলগো দলিয়া

কিসের সরম আমার কাছে?যে কুসুম, সখা, শাখা হোতে ঝোরেচরণের নীচে পড়ে সাধ কোরে,কে না জানে বল তাহার কপালেচরণে দলিয়া মরণ আছে!(নীরদের প্রতি)এই যে নীরদ, এনেছ গাঁথিয়াগোলাপ ফুলের হার!ভূলে গেছ কেন বাছিয়া ফেলিতেকাঁটা গুলি, সখা, তার?তবে গো পরায়ে দাও—না হয় কাঁটায় ছিঁড়িবে হৃদয়,না হয় এ বুক হবে রক্তময়,এনেছ গাঁথিয়া গোলাপ যখনতবে গো পরায়ে দাও!কতই না কাঁটা বিঁধিয়াছে হেথারাখিতে গোলাপ বুকের কাছে,জ্বলুক হৃদয়—বহুক্ শোণিত,তা’ বোলে গোলাপ ফেলিতে আছে?(প্রমােদের প্রতি)চাইনে তোমার ফুল উপহার,যাও—হেথা হোতে যাও!দুটি ফুল দিয়ে, ফুল বিনিময়েহাসি কিনিবারে চাও!

নলিনি, নলিনি, কেনরে হলিনিপাষাণ-কঠিন মন?দুটো কথা শুনে—দুটো ফুল পেয়েভাঙ্গে কেন তোর পণ?পলকে পলকে ভাঙ্গিস্ গড়িস্,—ভেঙ্গে যায় মৃদু শ্বাসে,যার পরে তুই করিস্‌লো মানসেই মনে মনে হাসে!দেখি আজ তুই কেমন পারিস্থাকিবারে অভিমানে?কহিনে কথা-হাসিনে হাসি—চাহিনে তার পানে!বিনােদ।—একটি কথাও কহিল না মােরে,পাশ দিয়া গেল চলি!গর্ব্ব-ভার-গুরু প্রতি পদক্ষেপেমরমে মরমে দলি।কেন গো—কেন গো কি আমি কোরেছি—কিছুত না পড়ে মনে,কহেছে ত কথা প্রমোদের সাথেঅশোক—নীরদ সনে!গেল যে হৃদয়—কত দিন আররবে সে এমন করি।কখনো উঠিয়া আকাশের পরেকখনো পাতালে পড়ি!

অনিল।—(দূর হইতে দেখিয়া)না জানি কিসের জ্যোতি নয়নে আছে গো বালা!যেদিকে চাহিয়া দেখ সেদিক করিছ আলা।অন্ধকার-ভেদী এক হাসিময় তারা সম—প্রাণের ভিতর পানে চাহিয়া রোয়েছ মম!ফিরায়ে লইনু মুখ তবুও কেনগো দেখিচাহিছে হৃদয় পানে দুটি হাসিমাখা আঁখি!আঁখি মুদি, তবু কেন হেরিগো প্রাণের কাছেদুটি আঁখি চেয়ে আছে এক দৃষ্টে চেয়ে আছে!হেথা না পাইবি ঠাঁই—দূর হ’ তুইরে তারা—চন্দ্রমা জোছনা করি এ হৃদি রেখেছে ভরি,তুই তারা সে আলোকে হইবি আপনা-হারা!দূর হ’রে—দূর হ’রে-দূর হ’রে ক্ষুদ্র তারা!কিন্তু কি মধুর মুখ ভাব ভরে ঢল ঢল!কোমল কুসুম সম সমীরণে টল মল।দেখিনি এহেন মুখ সুমধুর ভাব ময়,কেন? ললিতার মুখ এ হোতে কি ভাল নয়?আহা সে মধুর বড় ললিতার মুখ খানি,আঁখি কত কথা কয়, মুখেতে নাইক বাণী;—বাহির হইতে চায় তার সেই মৃদু হাসি,অধরের চারিধারে কতবার উঁকি মারে,লজ্জায় মরিয়া যায় কেবল দুই পা আসি!তার মুখ পূর্ণ-রাকা সরমের মেঘে ঢাকা,মধুর মুখানি তার আমি বড় ভালবাসি!

ললিতার চেয়ে কি গো মুখ খানি ভাল এর?উভেরি মধুর মুখ-দুই ভাব দুজনের—ললিতা সে লাজময়ী মুখেতে নাইক কথামাটি পানে চেয়ে আছে যেন লজ্জাবতী লতা।নলিনী, নলিনী সম কেমন রোয়েছে ফুটি,বরষার নদী জল করিতেছে টলমলহেলি দুলি লহরীতে পড়িতেছে লুটি লুটি।—উভেরি মধুর মুখ ললিতার, নলিনীর,অধীর সৌন্দর্য্য-কারো, কারো বা প্রশান্ত স্থির!কিন্তু নলিনীর মুখ ভাবের খেলার গেহসেথা ভাব-শিশু গুলি করিতেছে কোলাকুলি,কেহবা অধরে হাসে, নয়নে নাচিছে কেহ,এই যে অধরে ছিল এই সে নয়নে গেছে,দুদণ্ড খেলায়ে কেহ ঘুমাইয়া পড়িয়াছে!কভুবা দু’তিন জনে নাচিতেছে এক সনে,পলক পড়িতে চোখ আরত তাহারা নাই;নলিনীর মুখখানি ভাবের খেলার ঠাই!নলিনীর মুখ পানে যতই চাহিয়া থাকিনূতন নূতন শোভা দেখিতে পায়যে আঁখি;কিন্তু ললিতার মুখ কখনো এমন নয়।এত সে কয়না কথা, এত ভাব নাই সেথা,নহেগো এমনতর অধীর মাধুর্য্য ময়!নাইবা এমন হোল তাহাতে কি আছে হানি।না হয় দেথিতে ভাল নলিনীর মুখখানি!

তবু ললিতারে মোর ভাল আমি বাসি ত রে!তবু ত সৌন্দর্য্য তার এ হৃদি রোয়েছে ভোরে!রূপেতে কি যায় আসে? রূপ কেবা ভাল বাসে?ললিতা নলিনী কাছে না হয় রূপেতে হারে—ভালবাসি—ভালবাসি—তবু আমি ললিতারে!নলিনী।—(বিনােদের কাছে পুনর্ব্বার ফিরিয়া আসিয়া)কেন হেন আহা মলিন আনন,আঁখি নত মাটি পানে!তোমারে বিনোদ পাইনি দেখিতেদাঁড়াইয়া এই খানে!শিথিল হইয়া পড়েছে ঝুলিয়াফুলের বলয় মোর,দাওনাগো সখা দাওনা তুলিয়াবাঁধগো আঁটিয়া ডোর!

(নলিনীর গান)

এস মন, এস, তোমাতে আমাতেমিটাই বিবাদ যত!আপনার হোয়ে কেন মোরা দোঁহেরহিগো পরের মত?আমি যাই এক দিকে, মন মোর!তুমি যাও আর দিকে,যার কাছ হোতে ফিরাই নয়নতুমি চাও তার'দিকে!

তার চেয়ে এস দুজনে মিলিয়েহাত ধোরে যাই এক পথ দিয়ে,আমারে ছাড়িয়ে অন্য কোন খানেযেওনা কখনো আর!পারিনা কি মোরা দুজনে থাকিতে,দোঁহে হেসে খেলে কাল কাটাইতে?তবে কেন তুই না শুনে বারণযাস্‌রে পরের দ্বার?তুমি আমি মোর থাকিতে দুজন,বল্ দেখি, হৃদি, কিবা প্রয়োজনঅন্য সহচরে আর?এত কেন সাধ বল্ দেখি, মন,পর ঘরে যেতে যখন তখন,সেথা কিরে তুই আদর পা’স?বল্‌ত কতনা সহিস্ যাতনা?দিবানিশি কত সহিস্ লাঞ্ছনা?তবু কিরে তোর মিটেনি আশ?আয়, ফিরে আয়—মন, ফিরে আয়—দোঁহে এক সাথে করিব বাস!অনাদর আর হবেনা সহিতে,দিবস রজনী পাষাণ বহিতে,মরমে দহিতে, মুখে না কহিতে,ফেলিতে দুখের শ্বাস!শুনিলিনে কথা? আসিলিনে হেথা?

ফিরিলিনে একবার?সখিলো, দুরন্ত হৃদয়ের সাথেপেরে উঠিনেত আর!“নয়রে সুখের খেলা ভালবাসা!”কত বুঝালেম তায়,—হেরিয়া চিকণ সোণার শিকলখেলাইতে যায় হৃদয় পাগল—খেলাতে খেলাতে না জেনে না শুনেজড়ায় নিজের পায়!বাহিরিতে চায় বাহিরিতে নারে,করে শেষে হায় হায়!শিকল ছিঁড়িয়ে এসেছে ক’বারআবার কেন রে যায়?চরণে শিকল বাঁধিয়া কঁদিতেনা জানি কি সুখ পায়!তিলেক রহেনা আমার কাছেতেযতই কাঁদিয়া মরি,এমন দুরন্ত হৃদয় লইয়াস্বজনি, বল্ কি করি?

অনিল।—ওঠ্ হেথা হােতে—চল্ চল্ যাই,কি কারণে হেথা আছিস্ আর!মুদিয়া আসিছে মনের নয়ন,

মনের চরণে পড়িছে ভার!ললিতা আমার! না থাকুক্ রূপনাইবা গাহিতে পারিলি গান,ভাল বাসি তোরে, ভাল বাসিব রেযত দিন দেহে রহিবে প্রাণ!(নলিনী ব্যতীত আর সকলের প্রস্থান)নলিনী।—পারিনে ত আর, বসি এই খানে,ওই যে এদিকে আসিছে কবি!কথা আজ মোরে কহিতে হইবে,র'বনা বসিয়া অচল ছবি!কি কথা বলব? ভাবিতেছি মনে,কিছুই ত ভেবে নাহিক পাই;বলিব কি তারে—“তোমরা কবিগো,তোমাদের ভাল বাসিতে নাই!বুঝিতে পারনা আপনার মন,দিবা নিশি বৃথা করগো শোক,ভাল বাসা তরে আকুল হৃদয়ভাল বাসিবার পাওনা লোক!মনে তোমাদের সৌন্দর্য্য জাগিছেধরায় তেমন পাওনা খুঁজে,তবুও ত'ভাল বাসিতেই হবেনহিলে কিছুতে মন না বুঝে!অবশেষে কারে পাও দেখিবারেনেশায় আপনা ভুলি,

সাজাইয়া দেয় কলপনা তারেনিজের গহনা খুলি।আসি কলপনা কুহকিনী বালানয়নে কি দেয় মায়া,কলপনা তারে ঢেকে রাখে নিজেদিয়ে নিজ জ্যোতি ছায়া।কল্পনা-কুহকে মায়া মুগ্ধ চোকেকি দেখিতে দেখ কিবা,অপরূপ সেই প্রতিমা তাহারপূজ মনে নিশি দিবা!যত যায় দিন, যত যায় দিন,যত পাও তারে পাশেদেবীর জ্যোতি সে হারায় তাহারমানুষ হইয়া আসে!ভাল বাসা যত দূরে চলি যায়হাহাকার কর মনে,কলপনা কাঁদে ব্যথিত হইয়াআপনার প্রতারণে!আমি গো অবলা-কবির প্রণয়অত নাহি করি আশা,আমি চাই নিজ মনের মানুষশাদাশিদে ভালবাসা!”এমনি করিয়ে বাতাসের পরেমিছে অভিমান বাঁধি

অকারণে তার করিব লাঞ্ছনাঅভিমানে কাঁদি কাঁদি।কিছুতে সান্ত্বনা না আমি মানিব,দূরেতে যাইব চোলেকাছেতে আসিতে করিব বারণকরুণ চোখের জলে।

Comments

Loading comments…