গান আরম্ভ
সন্ধ্যা সঙ্গীত
ডাকি তোরে, আয়রে হেথায়,সাধের কবিতা তুই আয়!চারি দিকে খেলিতেছে মেঘ,বায়ু আসি করিছে চুম্বন,সীমা-হারা নভস্থল, দুই বাহু পসারিয়াভাই বোলে, সখা বোলে,বুকেতে করিছে আলিঙ্গন।অনন্ত এ আকাশের কোলেটলমল মেঘের মাঝার,এই খানে বাঁধিয়াছি ঘরতোর তরে, কবিতা আমার।আহা এ কি নিভৃত নিলয়,আহা এ কি শান্তি নিকেতন!
অতি দূরে ছায়া-রেখা সমপৃথিবীর শ্যামল কানন।হেথা আমি আসিব যখনিতোরে আমি ডাকিব রমণী।মেঘেতে মেঘেতে মিলে মিলেহেলে দুলে বাতাসে বাতাসে,হাসি হাসি মুখখানি করিনামিয়া আসিবি মোর পাশে।বাতাসে উড়িবে তোর বাস,ছড়ায়ে পড়িবে কেশপাশ,ঈষৎ মেলিয়া আঁখি পাতামৃদু হাসি পড়িবে ফুটিয়া,হৃদয়ের মৃতুল কিরণঅধরেতে পড়িবে লুটিয়া।একখানি জোছনার মতবাতাসের পথ ছুঁয়ে ছুঁয়ে,হিল্লোল-আকুল কমলিনীবাতাসে পড়িবি নুয়ে নুয়ে।পৃথিবী হইতে অতি দূরেএই হেথা মেঘময় পুরে,
গলাটি জড়ায়ে ধরি মোরব’সে র’বি কোলের উপর।এলোথেলো কেশপাশ লোয়েবসে বসে খেলিব হেথায়,উষার অলক দুলাইয়াসমীরণ যেমন খেলায়!চুমিয়া চুমিয়া ফুটাইবআধফুটো হাসির কুসুম,মুখ লোয়ে বুকের মাঝারেগান গেয়ে পাড়াইব ঘুম!কৌতুকে করিয়া কোলাকুলিআসিবে মেঘের শিশুগুলি,ঘিরিয়া দাঁড়াবে তারা সবেঅবাক্ হইয়া চেয়ে রবে!তাই তোরে ডাকিতেছি আমিকবিতা রে, আয় এক বার,নিরিবিলি দুটিতে মিলিয়ার’ব’হেথা, বধুটি আমার!
মেঘ হোতে নেমে ধীরে ধীরে
আয়লো কবিতা মোর বামে।চম্পক অঙ্গুলি দুটি দিয়েমেঘরাশি ধীরে সরাইয়ে,উষাটী যেমন ক’রে নামে।বায়ু হোতে আয়লো কবিতা,আসিয়া বসিবি মোর পাশে,কে জানে বনের কোথা হোতেভেসে ভেসে সমীরণ স্রোতেসৌরভ যেমন কোরে আসে!হৃদয়ের অন্তঃপুর হোতেবধু মোর, ধীরে ধীরে আয়।ভীরু প্রেম যেমন করিয়াধীরে উঠে হৃদয় ধরিয়া,বঁধুর পায়ের কাছে গিয়েঅমনি মুরছি পড়ে যায়!পরের হৃদয় হোতে উঠেআয় তুই কবিতা আমার,গিরির আঁধার গুহা হোতেমৃদু মৃদু অতি ক্ষীণ স্রোতেযেমন করিয়া উথলায়
ছোট এক নির্ঝরের ধার।তেমনি করিয়া তুই আয়,আয় তুই কবিতা আমার!
চকিতে করিয়া ছিন্ন ঘন ঘোর মেঘরাশি,বিদ্যুৎ যেমন নেমে আসে,হে কবিতা, তেমন করিয়াএসো না এসে না মোর পাশে!দূর দূরান্তর হোতে প্রচণ্ড নিশ্বাস ফেলিঝটিকা যেমন ছুটে আসে,দশ দিশি থরহরি ত্রাসে!আত্মঘাতী পাগলের মতএলোথেলো মেঘ শত শতশত শত বিদ্যুতের ছুরিবার বার হানিতেছে বুকে,যন্ত্রণায় আর্ত্তনাদ করি,ছুটিতেছে ঝটিকার মুখে!এমন ঝটিকা রূপ ধরি,এলোমেলো উন্মাদিনী বেশে,এসো না, কবিতা, কভু তুমি
এ আমার বিজন প্রদেশে!ছিঁড়ে ফেলি লোহার শৃঙ্খল,ভেঙ্গে ফেলি হৃদি কারাগার,আঁখি ফেটে অনল নিকলে,ধ’রে অতি ভীষণ আকার,পলক না ফেলিতে ফেলিতেযেমন ছুটিয়া ক্রোধ আসে,হৃদয়ের অন্তঃপুর হোতেতেমন এসো না মোর পাশে!যা’ কিছু সম্মুখে পায়, গলাইয়া জ্বলাইয়াআগ্নেয়-গিরির প্রাণ হোতেউঠে যথা অগ্নির নির্ঝর,কবিতা, আগ্নেয় মুর্ত্তি ধরিপরের হৃদয় ভেদ করি,এসো না এ হৃদয়ের পর!এসে তুমি উষার মতনএসে তুমি সৌরভের প্রায়,প্রেম উঠে যেমন করিয়ানির্ঝর যেমন উথলায়!
অথবা শিথিল কলেবরেএস তুমি, বস’ মোর পাশে;শোয়াইয়া তুষার শয়নে,চুমি চুমি মুদিত নয়নে,মরণ যেমন করে আসে,শিশির যেমন করে ঝরে;পশ্চিমের আঁধার সাগরেতারাটি যেমন কোরে যায়;অতি ধীরে মৃদু হেসে, সীঁদুর সীমন্ত দেশেদিবা সে যেমন করে আসেমরিবারে স্বামীর চিতায়,পশ্চিমের জ্বলন্ত শিখায়।পরবাসী ক্ষীণ আয়ু, একটি মুমুর্ষু বায়ু,স্বদেশ কানন পানে ধায়শ্রান্ত পদ উঠিতে না চায়;যেমনি কাননে পশে, ফুল-বধূটির পাশে,শেষ কথা বলিতে বলিতেতখনি অমনি মরে যায়।তেমনি, তেমনি করে এস,কবিতা রে, বধূটি আমার,
ম্লান মুখে করুণা বসিয়া,চোখে ধীরে ঝরে অশ্রু ধার।দুটি শুধু পড়িবে নিশ্বাস,দুটি শুধু বাহিরিবে বাণী,বাহু দুটি হৃদয়ে জড়ায়েমরমে রাখিবি মুখখানি!
Comments
Loading comments…