বিষ ও সুধা

সন্ধ্যা সঙ্গীত

অস্ত গেল দিনমণি। সন্ধ্যা আসি ধীরেদিবসের অন্ধকার সমাধির পরেতারকার ফুলরাশি দিল ছড়াইয়া।সাবধানে অতি ধীরে নায়ক যেমনঘুমন্ত প্রিয়ার মুখ করয়ে চুম্বনদিন-পরিশ্রমে ক্লান্ত পৃথিবীর দেহঅতি ধীরে পরশিল সায়াহ্নের বায়ু।দুরন্ত তরঙ্গ গুলি যমুনার কোলেসারাদিন খেলা করি পড়েছে ঘুমায়ে।ভগ্ন দেবালয় খানি যমুনার ধারে,শিকড়ে শিকড়ে তার ছায়ি জীর্ণ দেহবট অশত্থের গাছ জড়াজড়ি করিআঁধারিয়া রাখিয়াছে ভগন হৃদয়,দুয়েকটি বায়ুচ্ছ্বাস পথ ভূলি গিয়াআঁধার আলয়ে তার হয়েছে আটক,অধীর হইয়া তারা হেথায় হোথায়হু হু করি বেড়াইছে পথ খুঁজি খুঁজি।শুন সন্ধ্যে! আবার এসেছি আমি হেথা,

নীরব আঁধারে তব বসিয়া বসিয়াতটিনীর কলধ্বনি শুনিতে এয়েছি।হে তটিনী, ওকি গান গাইতেছ তুমি!দিন নাই, রাত্রি নাই এক তানে শুধুএক সুরে এক গান গাইছ সতত-এত মৃদুস্বরে ধীরে, যেন ভয় করিসন্ধ্যার প্রশান্ত স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় পাছে!এ নীরব সন্ধ্যাকালে তব মৃদু গানএকতান ধ্বনি তব শুনে মনে হয়এ হৃদি-গানেরি যেন শুনি প্রতিধ্বনি!মনে হয় যেন তুমি আমারি মতনকি এক প্রাণের ধন ফেলেছ হারায়ে।এস স্মৃতি, এস তুমি এ ভগ্ন হৃদয়ে,—সায়াহ্ন-রবির মৃদু শেষ রশ্মি-রেখাযেমন পড়েছে ওই অন্ধকার মেঘেতেমনি ঢাল এ হৃদে অতীত-স্বপন।কাঁদিতে হয়েছে সাধ বিরলে বসিয়া,কাঁদি একবার, দাও সে ক্ষমতা মোরে!

যাহা কিছু মনে পড়ে ছেলেবেলাকার

সমস্ত মালতীময়-মালতী কেবলশৈশবকালের মোর স্মৃতির প্রতিমা!দুই ভাই বোনে মোরা আছিনু কেমন!আমি ছিনু ধীর শান্ত গম্ভীর-প্রকৃতি,মালতী প্রফুল্ল অতি সদা হাসি হাসি!ছিল না সে উচ্ছ্বাসিনী নির্ঝরিণী সমশৈশব-তরঙ্গবেগে চঞ্চলা সুন্দরী,ছিল না সে লজ্জাবতী লতাটির মতসরম-সৌন্দর্যভরে ম্রিয়মাণ পারা।আছিল সে প্রভাতের ফুলের মতন,প্রশান্ত হরষে সদা মাখানো মুখানি;সে হাসি গাহিত শুধু উষার সঙ্গীত-সকলি নবীন আর সকলি বিমল!মালতীর শান্ত সেই হাসিটির সাথেহৃদয়ে জাগিত যেন প্রভাত পবন,নূতন জীবন যেন সঞ্চরিত মনে।ছেলেবেলাকার যত কবিতা আমারসে হাসির কিরণেতে উঠেছিল ফুটি!মালতী ছুঁইত মোর হৃদয়ের তার,তাইতে শৈশব-গান উঠিত বাজিয়া।

এমনি আসিত সন্ধ্যা, শ্রান্ত জগতেরেস্নেহময় কোলে তার ঘুম পাড়াইতে।সুবর্ণ-সলিল-সিক্ত সায়াহ্ন-অম্বরেগোধূলির অন্ধকার নিঃশব্দ চরণেছোট ছোট তারা গুলি দিত ফুটাইয়া,নন্দন বনের যেন চাঁপা ফুল দিয়েফুলশয্যা সাজাইত সুরবালাদের!মালতীরে লয়ে পাশে আসিতাম হেথাসন্ধ্যার সঙ্গীতম্বরে মিলাইয়া স্বরমৃদুস্বরে শুনাতেম শৈশব-কবিতা!হর্ষময় গর্ব্বে তার আঁখি উজলিত-অবাক্ ভক্তির ভাবে ধরি মোর হাতএকদৃষ্টে মুখপানে রহিত চাহিয়া।তার সে হরষ হেরি আমারো হৃদয়েকেমন মধুর গর্ব উঠিত উথলি!ক্ষুদ্র এক কুটীর অছিল আমাদের,নিস্তব্ধ-মধ্যাহ্নে আর নীরব সন্ধ্যায়দূর হতে তটিনীর কলস্বর আসিশান্ত কুটীরের প্রাণে প্রবেশিয়া ধীরেকরিত সে কুটীরের স্বপন রচনা।

দুই জনে ছিনু মোরা কল্পনার শিশু-বনে ভ্রমিতাম যবে, সুদুর নির্ঝরেবনশ্রীর পদধ্বনি পেতাম শুনিতে!যাহা কিছু দেখিতাম সকলেরি মাঝেজীবন্ত প্রতিমা যেন পেতেম দেখিতে!কত জোছনার রাত্রে মিলি দুই জনেভ্রমিতাম যমুনার পুলিনে পুলিনে,মনে হত এ রজনী পোহাতে চাবে না,সহসা কোকিল রব শুনিয়া উষায়,সহসা যখনি শ্যামা গাহিয়া উঠিত,চমকিয়া উঠিতাম, কহিতাম মোরা“এ কি হল! এরি মধ্যে পোহাল রজনী।”দেখিতাম পূর্বদিকে উঠেছে ফুটিয়াশুকতারা, রজনীর বিদায়ের পথে,প্রভাতের বায়ু ধীরে উঠিছে জাগিয়াআসিছে মলিন হয়ে আঁধারের মুখ।তখন আলয়ে দোঁহে আসিতাম ফিরি,আসিতে আসিতে পথে শুনিতাম মোরাগাইছে বিজন-কুঞ্জে বউ-কথা-কও।ক্রমশঃ বালক কাল হল অবসান,

নীরদের প্রেম-দৃষ্টে পড়িল মালতী,নীরদের সাথে তার হইল বিবাহ।মাঝে মাঝে যাইতাম তাদের আলয়ে;দেখিতাম, মালতীর শান্ত সে হাসিতেকুটীরেতে রাখিয়াছে প্রভাত ফুটায়ে।

সঙ্গীহারা হয়ে আমি ভ্রমিতাম একা,নিরাশ্রয় এ হৃদয় অশান্ত হইয়াকাঁদিয়া উঠিত যেন অধীর-উচ্ছ্বাসে!কোথাও পেতনা যেন আরাম বিশ্রাম!অনমনে আছি যবে, হৃদয় আমারসহসা স্বপন ভাঙ্গি উঠিত চমকি!সহসা পেতনা ভেবে, পেতনা খুঁজিয়াআগে কি ছিলরে যেন এখন তা নাই!প্রকৃতির কি-যেন-কি গিয়াছে হারায়েমনে তাহা পড়িছে না! ছেলেবেলা হতেপ্রকৃতির যেই ছন্দ এসেছি শুনিয়াসেই ছন্দোভঙ্গ যেন হয়েছে তাহার,সেই ছন্দে কি কথার পড়েছে অভাব-কানেতে সহসা তাই উঠিত বাজিয়া,

হৃদয় সহসা তাই উঠিত চমকি!জানিনা কিসের তরে, কি মনের দুখেদুয়েকটি দীর্ঘশ্বাস উঠিত উচ্ছ্বসি!শিখর হতে শিখরে, বন হতে বনে,অন্যমনে একেলাই বেড়াতাম ভ্রমি-সহসা চেতন পেয়ে উঠিয়া চমকিসবিস্ময়ে ভাবিতাম কেন ভ্রমিতেছি,কেন ভ্রমিতেছি তাহা পেতেম না ভাবি।

একদিন নবীন বসন্ত সমীরণেবউ-কথা-কও যবে খুলেছে হৃদয়,বিষাদে সুখেতে মাখা প্রশান্ত কি ভাবপ্রাণের ভিতরে যবে রয়েছে ঘুমায়ে,দেখিনু বালিকা এক, নির্ঝরের ধারেবন ফুল তুলিতেছে আঁচল ভরিয়া!দুপাশে কুন্তল-জাল পড়েছে এলায়ে,মুখেতে পড়েছে তার উষার কিরণ।কাছেতে গেলাম তার কাঁটা বাছি ফেলিকানন-গোলাপ তারে দিলাম তুলিয়া।প্রতিদিন সেইখানে আসিত দামিনী,

তুলিয়া দিতাম ফুল, শুনাতেম গান,কহিতাম বালিকারে কতকি কাহিনী,শুনি সে হাসিত কভু, শুনিতনা কভু,আমি ফুল তুলে দিলে ফেলিত ছিঁড়িয়া।ভৎসনার অভিনয়ে কহিত কতকি।কভুবা ভ্রূকুটি করি রহিত বসিয়া,হাসিতে হাসিতে কভু যাইত পলায়ে,অলীক সরমে কভু হইত অধীর।কিন্তু তার ভ্রূকুটিতে, সরমে, সঙ্কোচে,লুকানো প্রেমেরি কথা করিত প্রকাশ!এইরূপে প্রতি উষা যাইত কাটিয়া।এক দিন সে বালিকা না আসিত যদিহৃদয় কেমন যেন হইত বিকল—প্রভাত কেমন যেন যেতনা কাটিয়া-দিন যেত অতি ধীরে নিরাশ-চরণে!বর্ষচক্র আর বার আসিল ফিরিয়া,নূতন বসন্তে পুনঃ হাসিল ধরণী,প্রভাতে অলস ভাবে, বসি তরুতলে,দামিনীরে শুধালেম কথায় কথায়“দামিনী, তুমি কি মোরে ভালবাস বালা?”

অলীক-সরম-রোষে ভ্রূকুটি করিয়াছুটে সে পলায়ে গেল দূর বনান্তরে-জানি না কি ভাবি পুনঃ ছুটিয়া আসিয়া“ভালবাসি- ভালবাসি-”কহিয়া অমনিসরমে-মাখানো মুখ লুকালো এ বুকে!এইরূপে দিন যেত স্বপ্ন-খেলা খেলি।কত ক্ষুদ্র অভিমানে কাঁদিত বালিকাকত ক্ষুদ্র কথা লয়ে হাসিত হরষে-কিন্তু জানিতাম কি রে এই ভালবাসাদুদিনের ছেলেখেলা আর কিছু নয়?কে জানিত প্রভাতের নবীন কিরণেএমন শতেক ফুল উঠেরে ফুটিয়াপ্রভাতের বায়ু সনে খেলা সাঙ্গ হলে,আপনি শুকায়ে শেষে ঝরে পড়ে যায়-ওই ফুলে থুয়েছিনু হৃদয়ের আশা,ওই কুসুমের সাথে খসে পড়ে গেল!আর কিছু কাল পরে এই দামিনীরেযে কথা বলিয়াছিনু আজো মনে আছে।“দামিনী, মনে কি পড়ে সে দিনের কথা?বল দেখি কত দিন ওই মুখ খানি

দেখিনি তোমার? তাই দেখিতে এয়েছি!জোছনার রাত্রে যবে বসেছি কাননে,দুয়েকটি তারা কভু পড়িছে খসিয়া,হতবুদ্ধি দুয়েকটি পথহারা মেঘঅনন্ত আকাশ-রাজ্যে ভ্রমিছে কেবল,সে নিস্তব্ধ রজনীতে হৃদয়ে যেমনএকে একে সব কথা উঠেগো জাগিয়া,তেমনি দেখিনু যেই ওই মুখখানিস্মৃতি-জাগরণ-কারী রাগিণীর মতওই মুখখানি তব দেখিনু যেমনিএকে একে পুরাতন সব স্মৃতিগুলিজীবন্ত হইয়া যেন জাগিল হৃদয়ে।মনে আছে সেই সখি আর একদিনএমনি গম্ভীর সন্ধ্যা, এই নদীতীর,এই খানে এই হাত ধরিয়া তোমারকাতরে কহেছি আমি নয়নের জলে,“বিদায় দাওগো এবে চলিনু বিদেশে,দেখো সখি এত দিন বাসিয়াছ ভালদুদিন না দেখে যেন যেওনা ভুলিয়া!সংসারের কর্ম্ম হতে অবসর লয়ে

আবার ফিরিয়া যবে আসিব দামিনি,নব-অতিথির মত ভেবোনা আমারেসম্ভ্রমের অভিনয় কোরোনা বালিকা!”কিছুই উত্তর তার দিলে না তখন,শুধু মুখপানে চেয়ে কাতর নয়নেভৎসনার অশ্রুজল করিলে বর্ষণ!যেন এই নিদারুণ সন্দেহের মোরঅশ্রুজল ছাড়া আর নাইক উত্তর!আবার কহিনু আমি ওই মুখ চেয়ে“কে জানে মনের মধ্যে কি হয়েছে মোরআশঙ্কা হতেছে যেন হৃদয়ে আমারওই স্নেহ-সুধা-মাখা মুখখানি তোরএজনমে আর বুঝি পাবনা দেখিতে।”নীরক গম্ভীর সেই সন্ধ্যার আঁধারেসমস্ত জগৎ যেন দিল প্রতিধ্বনি“এজনমে আর বুঝি পাবনা দেখিতে।’গভীর নিশীথে যথা আধ ঘুম ঘোরেসুদুর শ্মশান হতে মরণের রবশুনিলে হৃদয় উঠে কাঁপিয়া কেমন,তেমনি বিজন সেই তটিনীর তীরে

একাকী আঁধারে যেন শুনিনু কি কথাসমস্ত হৃদয় যেন উঠিল শিহরি!আরবার কহিলাম “বিদায়—ভুলোনা।”তখন কি জানিতাম এই নদীতীরেএই সন্ধ্যাকালে আর তোমারি সমুখে।এমনি মনের দুখে হইবে কাঁদিতে?তখনো আমার এই বাল্য জীবনেরপ্রভাত-নীরদ হতে নব-রক্ত-রাগযায়নি মিলায়ে সখি, তখনো হৃদয়মরীচিকা দেখিতেছিল দুর শূন্য-পটে!নামিনু সংসার-ক্ষেত্রে যুঝিনু একাকী,যাহা কিছু চাহিলাম পাইনু সকলি!তখন ভাবিনু যাই প্রেমের ছায়ায়এতদিনকার শ্রান্তি যাবে দূর হয়ে।সন্ধ্যাকালে মরুভূমে পথিক যেমননিরখিয়া দেখে যবে সম্মুখে পশ্চাতেসুদূরে দেখিতে পায় প্রান্ত দিগন্তেরসুবর্ণ জলদ জালে মণ্ডিত কেমন,সে দিকে তারকাগুলি চুম্বিছে প্রান্তর,সায়াহ্ন-বালার সেথা পূর্ণতম শোভা,

কিন্তু পদতলে তার অসীম বালুকাসারাদিন জ্বলি জ্বলি তপন কিরণেফেলিছে সায়হ্নকালে জ্বলন্ত নিশ্বাস।তেমনি এ সংসারের পথিক যাহারাভবিষ্যত অতীতের দিগন্তের পানে,চাহি দেখে স্বর্গ সেথা হাসিছে কেবলপদতলে বর্ত্তমান মরুভূমি সম!স্মৃতি আর আশা ছাড়া সত্যকার সুখমানুষের ভাগ্যে সখি ঘটেনাক বুঝি!বিদেশ হইতে যবে আইসে ফিরিয়াঅতি হতভাগা যেও সেও ভাবে মনেযারে যারে ভালবাসে সকলেই বুঝিরহিয়াছে তার তরে আকুল-হৃদয়ে!তেমনি কতই সখি করেছিনু আশা,মনে মনে ভেবেছিনু কত না হরষেদামিনী আমার বুঝি তৃষিত-নয়নেপথ পানে চেয়ে আছে আমারি আশায়।আমি গিয়ে কব তারে হরষে কাঁদিয়া“মুছ অশ্রুজল সখি, বহু দিন পরেএসেছে বিদেশ হতে ললিত তোমার”

অমনি দামিনী বুঝি আহ্লাদে উথলিনীরব অশ্রুর জলে কবে কত কথা!ফিরিয়া আসিনু যবে-একি হল জ্বালা!কিছুতে নয়ন জল নারি সামালিতে।ফের’ ফের’ চাহিও না এ আঁখির পানে,প্রাণে বাজে অশ্রুজল দেখাতে তোমায়!জেনো গো রমণি, জেনো, এত দিন পরেকাঁদিয়া প্রণয় ভিক্ষা করিতে আসিনি,এ অশ্রু দুঃখের অশ্রু-এ নহে ভিক্ষার!কখনো কখনো সখি অন্য মনে যবেসুবিজন বাতায়নে রয়েছ বসিয়াসম্মুখে যেতেছে দেখা বিজন প্রান্তরহেথা হোথা দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন কুটীর-হুহু করি বহিতেছে যমুনার বায়ু-তখন কি সে দিনের দুয়েকটি কথাসহসা মনের মধ্যে উঠে না জাগিয়া?কখন যে জাগি উঠে পার না জানিতে!দূরতম রাখালের বাঁশিস্বর সমকভু কভু দুয়েকটি ভাঙ্গা ভাঙ্গা সুরঅতি মৃদু পশিতেছে শ্রবণ বিবরে;

আধ জেগে আধ ঘুমে স্বপ্ন আধ-ভোলা-তেমনি কি সে দিনের দুয়েকটি কথাসহসা মনের মধ্যে উঠে না জাগিয়া?স্মৃতির নির্ঝর হতে অলক্ষ্যে গোপনে;পথহারা দুয়েকটি অশ্রুবারিধারাসহসা পড়ে না ঝরি নেত্র প্রান্ত হতে,পড়িছে কি না পড়িছে পার না জানিতে।একাকী বিজনে কভু অন্য মনে যবেবসে থাকি, কত কি যে আইসে ভাবনা,সহসা মুহূর্ত্ত পরে লভিয়া চেতনকি কথা ভাবিতে ছিনু নাহি পড়ে মনেঅথচ মনের মধ্যে বিষন্ন কি ভাবকেমন আঁধার করি রহে যেন চাপি,হৃদয়ের সেই ভাবে কখন কি সখিসে দিনের কোন ছায়া পড়ে না স্মরণে?ছেলেবেলাকার কোন বন্ধুর মরণস্মরিলে যেমন লাগে হৃদয়ে আঘাত,তেমনি কি সখি কভু মনে নাহি হয়সে সকল দিন কেন গেল গো চলিয়াযে দিন এ জন্মে আর আসিবে না ফিরি!

পুরাতন বন্ধু তারা, কত কাল আহাখেলা করিয়াছি মোরা তাহাদের সাথে,কত সুখে হাসিয়াছি দুঃখে কাঁদিয়াছিসে সকল, সুখ দুঃখ হাসি কান্না লয়েমিশাইয়া গেল তার আঁধার অতীতে!* * *চলিনু দামিনী পুনঃ চলিনু বিদেশে-ভাবিলাম একবার দেখিব মুখানিএকবার শুনাইব মরমের ব্যথা,তাই আসিয়াছি সখি, এ জনমে আরআসিব না দিতে তব শান্তিতে ব্যাঘাত,এ জন্মের তরে সখি কহ একবারএকটি স্নেহের বাণী অভাগার পরেভ্রমিয়া বেড়াব যবে সুদূর বিদেশেসে কথার প্রতিধ্বনি বাজিবে হৃদয়ে!”

থাম স্মৃতি-থাম তুমি, থাম এইখানেসম্মুখে তোমার ওকি দৃশ্য মর্ম্মভেদী?মালতী আমার সেই প্রাণের ভগিনী,শৈশব কালের মোর খেলার সাথী,

যৌবন কালের মোর আশ্রয়ের ছায়া,প্রতি দুঃখ প্রতি সুখ প্রতি মনোভাবযার কাছে না বলিলে বুক যেত ফেটে,সেই সে মালতী মোর হয়েছে বিধবা!আপনার দুঃখে মগ্ন স্বার্থপর আমিভাল করে পারি না করিতে সান্ত্বনা!নিজের চোখের জলে অন্ধ এ নয়নেপরের চোখের জল পেনুনা দেখিতে!ছেলেবেলাকার সেই পুরাণো কুটীরেহাসিতে হাসিতে এল মালতী আমারসে হাসির চেয়ে ভাল তীব্র অশ্রুজল!কে জানিত সে হাসির অন্তরে অন্তরেকাল-রাত্রি অন্ধকার রয়েছে লুকায়ে!একদিন বলেনি সে কোন দুঃখ কথা,একদিনো কাঁদেনি সে সমুখে আমার!জানি জানি মালতী সে স্বর্গের দেবতা!নিজের প্রাণের বহি করিয়া গোপন,পরের চোখের জল দিত সে মুছায়ে।ছেলেবেলাকার সেই হাসিটি তাহারসমস্ত আনন তার রাখিত উজ্জলি

কত না করিত যত্ন করিত সান্ত্বনা।হাসিতে হাসিতে কত করিত আদর!কিন্তু হা শ্মশানে যথা চাঁদের জোছনাশ্মশানের ভীষণতা বাড়ায় দ্বিগুণ-মালতীর সেই হাসি দেখিয়া তেমনিনিজের এ হৃদয়ের ভগ্ন-অবশেষদ্বিগুণ পড়িত যেন নয়নে আমার!তাহার আদর পেয়ে ভুলিনু যাতনা,কিন্তু হায় দেখি নাই, বিজন-শয্যায়কত দিন কাঁদিয়াছে মালতী গোপনে!সে যখন দেখিত, তাহার বাল্যসখাদিনে দিনে অবসাদে হইছে মলিন,দিনে দিনে মন তার যেতেছে ভাঙ্গিয়া,তখন আকুলা ‘বালা রাত্রে একাকিনীকাঁদিয়া দেবতা কাছে করেছে প্রার্থনা-বালিকার অশ্রুময় সে প্রার্থনা গুলিআর কেহ শুনে নাই অন্তর্যামী ছাড়া!দেখি নাই কত রাত্রি একাকিনী গিয়াযমুনার তীরে বসি কাঁদিত বিরলে!একাকিনী কেঁদে কেঁদে হইত প্রভাত,

এলোথেলো কেশপাশে পড়িত শিশির,চাহিয়া রহিত উষা ম্লান মুখ পানে!

বিষময়, বহ্নিময়, বজ্রময় প্রেম,এ স্নেহের কাছে তুই ঢাক মুখ ঢাক!তুই মরণের কীট, জীবনের রাহু,সৌন্দর্য-কুসুম-বনে তুই দাবানল,হৃদয়ের রোগ তুই, প্রাণের মাঝারেসতত রাখিস্‌ তুই পিপাসা পুষিয়া,ভুজঙ্গ বাহুর পাকে মর্ম্ম জড়াইয়াকেবলি ফেলিস তুই বিষাক্ত নিশ্বাস,আগ্নেয় নিশ্বাসে তোর জ্বলিয়া জ্বলিয়াহৃদয়ে ফুটিতে থাকে তপ্ত রক্তস্রোত!জরস্তর কলেবর, আবেশে অসাড়,শিথিল শিরার গ্রন্থি, অচেতন প্রাণ,স্খলিত জড়িত বাণী, অবশ নয়ন,আশা ও নিরাশা পাকে ঘুরিছে হৃদয়,ঘুরিছে চোখের পরে জগত সংসার।এই প্রেম, এই বিষ, বজ্র-হুতাশনকবে রে পৃথিবী হতে যাবে দূর হয়ে!

আয় স্নেহ, আয় তোর স্নিগ্ধ-সুধা ঢালিএ জ্বলন্ত বহিরাশি দে রে নিবাইয়া!অগ্নিময় বৃশ্চিকের আলিঙ্গন হতে,সুধাসিক্ত কোলে-তোর তুলেনে তুলেনে!প্রেম-ধূমকেতু ওই উঠেছে আকাশে,ঝুলসি দিতেছে হায় যৌবনের আঁখি,কোথা তুমি ধ্রুবতারা ওঠ একবার,ঢাল এ জ্বলন্ত নেত্রে স্নিগ্ধ-মৃদু-জ্যোতি!তুমি সুধা, তুমি ছায়া, তুমি জ্যোৎস্নাধারা,তুমি স্রোতস্বিনী, তুমি উষার বাতাস,তুমি হাসি, তুমি আশা, মৃদুঅশ্রুজল,এস তুমি এ প্রেমেরে দাও নিভাইয়া!একটি মালতী যার আছে এ সংসারেসহস্র দামিনী তার ধূলিমুষ্টি নয়!

ক্রমশঃ হৃদয় মোর এল শান্ত হয়েযন্ত্রণা বিষাদে আসি হ’ল পরিণত।নিস্তরঙ্গ সরসীর প্রশান্ত হৃদয়েনিশীথের শান্ত বায়ু ভ্রমেগো যখন,এত শান্ত এত মৃদু পদক্ষেপ তার

একটি চরণচিহ্ন পড়েনা সরসে,তেমনি প্রশান্ত হৃদে প্রশান্ত বিষাদফেলিতে লাগিল ধীরে মৃদুল নিঃশ্বাস!নিরখিয়া নিদারুণ ঝটিকার মাঝেহাসিময় শান্ত সেই মালতী কুসুমেক্রমশঃ হৃদয় মোর এল শান্ত হয়ে।কিন্তু হায় কে জানিত সেই হাসিময়সুকুমার ফুলটির মর্ম্মের মাঝারেমরণের কীট পশি করিতেছে ক্ষয়!হইল প্রফুল্লতর মুখখানি তার,হইল প্রশান্ততর হাসিটি তাহার;দিবা যবে যায় যায়, হাসিময় মেঘেদূর আঁধারের মুখ করয়ে উজ্জল-এ হাসি তেমনি হাসি কে জানিত তাহা!একদা পূর্ণিমারাত্রে নিস্তব্ধ গভীরমুখ পানে চেয়ে বালা, হাত ধরি মোরকহিল মৃদুলস্বরে—যাই তবে ভাই!-কোথা গেলি-কোথা গেলি মালতী আমারঅভাগা ভ্রাতারে তোর রাখিয়া হেথায়!দুঃখের কণ্টকময় সংসারের পথে

মালতী, কে লয়ে যাবে হাত ধরি মোর?সংসারের ধ্রুবতারা ডুবিল আমার।তেমন পূর্ণিমা রাত্রি দেখিনি কখনো,পৃথিবী ঘুমাইতেছে শান্ত জোছনায়;কহিনু পাগল হয়ে রাক্ষসী-পৃথিবীএত রূপ তোরে কভু সাজেনা সাজেনা!

মালতী শুকায়ে গেল, সুবাস তাহারএখনো রয়েছে কিন্তু ভরিয়া কুটীর।তাহার মনের ছায়া এখনো যেনরেসে কুটীরে শান্তিরসে রেখেছে ডুবায়ে!সে শান্ত প্রতিমা মম মনের মন্দিররেখেছে পবিত্র করি রেখেছে উজ্বলি!

Comments

Loading comments…